ক্যান্সার কেন বহু বছর পরেও ফিরে আসে

ক্যান্সার জয় করার আনন্দ কি ক্ষণস্থায়ী? কেন বহু বছর পর আবারও ফিরে আসে সেই মরণব্যাধি? কীভাবে জেগে ওঠে এই কোষগুলো? এদের চিরতরে ধ্বংস করার উপায়ই বা কী?

ছবি: মিডজার্নির সাহায্যে তৈরি

গবেষকেরা বর্তমানে শরীরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত টিউমার কোষ নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করছেন। সফল চিকিৎসার বহু বছর পরেও কেন ক্যান্সার আবার ফিরে আসে—এই জটিল প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে হলে এই সুপ্ত কোষগুলো সম্পর্কে জানা সবচেয়ে জরুরি।

যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ার বাসিন্দা লিসা ডাটন একজন অবসরপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনা পরামর্শক। ২০১৭ সালে ডাক্তাররা তাঁকে সুখবর দিলেন, তিনি স্তন ক্যানসারমুক্ত! খবরটি জেনে তিনি পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে নিজের রোগমুক্তি উদযাপন করলেন।

তবে মনের গভীরে তিনি জানতেন, ক্যান্সারের সঙ্গে তাঁর লড়াই হয়তো এখানেই শেষ নয়। কারণ পরিসংখ্যান বলছে, যাদের স্তনের টিউমার সেরে যায়, তাদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের ক্ষেত্রে ক্যান্সার আবার ফিরে আসে। কখনো কখনো অনেক বছর পরেও এমনটি ঘটে। শুধু স্তন ক্যান্সারই নয়, আরও অনেক ধরনের ক্যান্সার আছে, যেগুলো প্রথম চিকিৎসার কয়েক বছর পর আবার দেখা দিতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এই ফিরে আসার হার আরও বেশি।

ক্যান্সার ফিরে আসার এই আশঙ্কা সম্পর্কে লিসা ডাটন বলেন, ‘বিষয়টি সারাক্ষণই মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকে। এতে প্রচণ্ড মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়।’ এই ভয় থেকেই ডাটন তাঁর চিকিৎসার অংশ হিসেবে SURMOUNT নামে একটি ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় অংশ নেন। এই পরীক্ষায় মূলত তাঁর শরীরে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত ক্যান্সার কোষ আছে কি না, তা নজরদারি করা হতো।

আরও পড়ুন
পরিসংখ্যান বলছে, যাদের স্তনের টিউমার সেরে যায়, তাদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের ক্ষেত্রে ক্যান্সার আবার ফিরে আসে। কখনো কখনো অনেক বছর পরেও এমনটি ঘটে।

বর্তমানে অনেক গবেষক মনে করেন, ক্যান্সার আবার ফিরে আসার অন্যতম কারণ হতে পারে এই সুপ্ত ক্যান্সার কোষ। এই কোষগুলো প্রাথমিক চিকিৎসা এড়িয়ে শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে। তবে সাধারণ মেটাস্ট্যাটিক ক্যান্সারের মতো এরা সঙ্গে সঙ্গে টিউমার তৈরি করে না। এরা দীর্ঘদিন ঘুমিয়ে থাকে, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার চোখ এড়িয়ে যায় এবং বিভাজিতও হয় না। কিন্তু পরে আবার জেগে উঠে নতুন টিউমার তৈরি করতে পারে।

মেটাস্ট্যাটিক ক্যান্সার সঙ্গে সঙ্গে টিউমার তৈরি করে না
ছবি: এনএফসিআর

ডাটন জানতেন যে তাঁর চিকিৎসায় হয়তো সব ক্যান্সার কোষ দূর হয়নি। তবুও ২০২০ সালে প্রথমবার তাঁর অস্থিমজ্জায় সুপ্ত ক্যান্সার কোষ পাওয়া গেলে তিনি ভীষণ হতবাক হন।

গবেষকেরা এখন স্তন, প্রোস্টেট, ফুসফুস, কোলনসহ আরও নানা ধরনের ক্যান্সারের ক্ষেত্রে এই সুপ্ত টিউমার কোষ খুঁজে পাচ্ছেন। এগুলোকে বলা হয় ডিসেমিনেটেড ক্যান্সার সেল। এসব কোষকে অনেক ক্ষেত্রে মেটাস্ট্যাটিক ক্যান্সারের সঙ্গে জড়িত বলে মনে করা হচ্ছে। ধারণা করা হয়, সফলভাবে ক্যান্সারের চিকিৎসা শেষ করা প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষের শরীরে এমন কোষ লুকিয়ে থাকতে পারে। কিছু অপ্রকাশিত গবেষণা বলছে, এই হার আরও বেশি হতে পারে।

আরও পড়ুন
ডাটন জানতেন যে তাঁর চিকিৎসায় হয়তো সব ক্যান্সার কোষ দূর হয়নি। তবুও ২০২০ সালে প্রথমবার তাঁর অস্থিমজ্জায় সুপ্ত ক্যান্সার কোষ পাওয়া গেলে তিনি ভীষণ হতবাক হন।

সুপ্ত টিউমার কোষের ধারণার জন্ম

সুপ্ত টিউমার কোষের ধারণাটি কিন্তু নতুন নয়, এটি প্রথম উঠে আসে ১৯৩০-এর দশকে। তখন অস্ট্রেলিয়ান প্যাথলজিস্ট রুপার্ট উইলিস ধারণা দেন, দ্বিতীয়বার দেখা কিছু ক্যান্সার এই ধরনের কোষের কারণেই হয়। ক্যান্সারের চিকিৎসার পর মানুষ যখন বেশি দিন বাঁচতে শুরু করল, তখন তিনি ও অন্য গবেষকেরা লক্ষ্য করেন, অনেক ক্ষেত্রে বহু বছর পর ক্যান্সার আবার ফিরে আসে এবং তা আগের চেয়েও বেশি আক্রমণাত্মক হয়। দীর্ঘদিন ধরে সুপ্ত অবস্থার ধারণাটি তেমন গুরুত্ব পায়নি।

ফিলাডেলফিয়ার ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার চিকিৎসক ও গবেষক লুইস চোডশ বলেন, ‘২০ বছরেরও বেশি আগে যখন তিনি সহকর্মীদের সঙ্গে এই ধারণা নিয়ে কথা বলা শুরু করেন, তখন তিনি অনেক বাধার মুখে পড়েছিলেন। কেউই বিশ্বাস করতে চাইত না যে ক্যান্সার ধ্বংসকারী ওষুধগুলো শরীরে কিছু ক্যান্সার কোষ রেখে যেতে পারে।

তাছাড়া ওষুধ প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলোরও তেমন আগ্রহ ছিল না। কারণ, রোগীদের তখন সুস্থ বলেই মনে করা হতো। সে সময় অনেক বিজ্ঞানীর ধারণা ছিল, ক্যান্সার যদি আবার ফিরে আসে, তাহলে সেটা নতুন করে হওয়া ক্যানসার। আগের রোগের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। চোডশ বলেন, ‘যখন পর্যাপ্ত প্রমাণ জমতে থাকে, তখনই এই পুরোনো চিন্তাধারা থেকে মানুষ বেরিয়ে আসে।’

তিনি ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার পারেলম্যান স্কুল অব মেডিসিনের মেডিক্যাল অনকোলজিস্ট অ্যাঞ্জেলা ডি-মিশেলের সঙ্গে একসঙ্গে SURMOUNT ও CLEVER গবেষণার সহ-গবেষক হিসেবে কাজ করছেন।

আরও পড়ুন
চোডশ বলেন, ‘যখন পর্যাপ্ত প্রমাণ জমতে থাকে, তখনই এই পুরোনো চিন্তাধারা থেকে মানুষ বেরিয়ে আসে।’

আধুনিক প্রযুক্তিতে সুপ্ত কোষ শনাক্তের অগ্রগতি

এখন গবেষকেরা কিছু নির্দিষ্ট সেলুলার মার্কার ব্যবহার করে শরীরের নানা জায়গায় সুপ্ত টিউমার কোষ শনাক্ত করতে পারছেন। এসব মার্কারের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা জানতে পারেন, কোষগুলো বাড়ছে বা বিভাজিত হচ্ছে কি না। কোষগুলোর উৎস এবং সেগুলো কোন ক্যান্সারের সঙ্গে জড়িত, সে সম্পর্কেও জানা যায়। তবে এই পদ্ধতিগুলো এখনো পুরোপুরি নিখুঁত নয়। কিছু কোষের সুপ্ত থাকার প্রবণতা কেন বেশি, এই ব্যাপারে এখনও গবেষণা বাকি।

সিয়াটলের ফ্রেড হাচিনসন ক্যান্সার সেন্টারের ক্যান্সার বায়োলজিস্ট সাইরাস ঘাজার ও অন্যান্য গবেষকেরা দেখেছেন, ক্যান্সার হওয়ার একেবারে শুরুর দিকেই সুপ্ত কোষগুলো মূল টিউমার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অনেক সময় রোগ ধরা পড়ার আগেই এমনটি ঘটে। কীভাবে এবং কেন তারা আলাদা হয়, তা এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।

তবে রক্তস্রোতে মাত্র কয়েক মিনিট ভেসে থাকার পরই তারা রক্তনালি ছেড়ে বেরিয়ে যায় এবং শরীরের কিছু নির্দিষ্ট জায়গায়, যেমন অস্থিমজ্জা ও লিম্ফ নোডে জমা হয়। এমন জায়গাতেও এই সুপ্ত কোষগুলো খুবই বিরল। লাখ লাখ সুস্থ কোষের ভিড়ে হয়তো মাত্র কয়েকটি এই নিষ্ক্রিয় অবস্থাই তাদের কেমোথেরাপির মতো প্রচলিত চিকিৎসা থেকে রক্ষা করে। কারণ, এসব চিকিৎসা দ্রুত বিভাজিত হওয়া কোষকে নির্মূল করে।

সুইজারল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব জেনেভার মেডিক্যাল অনকোলজিস্ট পেট্রোস সান্তুলিস বলেন, ‘সুপ্ত অবস্থা অন্য পরিচিত অবস্থার মতো নয়। এমন একটি অবস্থা হলো সেনেসেন্স। এই অবস্থায় বুড়িয়ে যাওয়া কোষ বিভাজন বন্ধ করে মৃত্যুর দিকে এগোয়। কিন্তু সুপ্ত কোষগুলো সঠিক পরিবেশ পেলে আবার নতুন করে বিভাজন শুরু করতে পারে। একবার জেগে উঠলে এসব কোষ এমন টিউমার তৈরি করে, যা মূল টিউমারের পুরো বৈশিষ্ট্যই বহন করে। এ কারণে কিছু গবেষক মনে করছেন, এই সুপ্ত টিউমার কোষগুলো হয়তো ক্যান্সার স্টেম সেল। এমন কোষ যেগুলো নিজেকে পুনর্গঠন ও ভিন্ন ধরনের কোষে রূপ নেওয়ার মাধ্যমে সম্পূর্ণ টিউমার তৈরি করতে পারে।

আরও পড়ুন
সুইজারল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব জেনেভার মেডিক্যাল অনকোলজিস্ট পেট্রোস সান্তুলিস বলেন, ‘সুপ্ত অবস্থা অন্য পরিচিত অবস্থার মতো নয়। এমন একটি অবস্থা হলো সেনেসেন্স।'

সুপ্ত টিউমার কোষগুলোর মধ্যে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য দেখা যায়, যা সাধারণত স্টেম সেলের সঙ্গে যুক্ত। যেমন কিছু নির্দিষ্ট জিনের অতিরিক্ত প্রকাশ। নিউইয়র্ক সিটির স্লোন কেটারিং ইনস্টিটিউটের পরিচালক ও ক্যান্সার বিজ্ঞানী জোয়ান মাসাগুয়ে বলেন, স্টেম সেল সাধারণত বেশিরভাগ সময় সুপ্ত অবস্থায়ই থাকে। আঘাত বা অসুস্থতার পরই জেগে ওঠে। তাই স্বাভাবিকভাবেই এগুলোকে সম্ভাব্য ক্যান্সার সৃষ্টিকারী হিসেবে ধরা হয়। তবে ক্যান্সার স্টেম সেলের অস্তিত্ব নিয়ে এখনো বিজ্ঞানীদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

গবেষকেরা মনে করছেন, এসব অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর হয়তো খুব শিগগিরই পাওয়া যাবে। উন্নত ল্যাবরেটরি প্রযুক্তির কারণে এখন একক কোষকে খুব কাছ থেকে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হচ্ছে। এর ফলে সুপ্ত টিউমার কোষ শনাক্ত করা, আলাদা করা এবং গবেষণার জন্য সেগুলোর সংখ্যা বাড়ানো এখন আগের চেয়ে অনেক সহজ। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, চোডশ ও ডি-মিশেলের দল সুপ্ত কোষ শনাক্ত করার জন্য একটি নতুন পরীক্ষা পদ্ধতি তৈরি করছেন। চোডশের মতে, এটি বর্তমান পদ্ধতিগুলোর তুলনায় অনেক বেশি সংবেদনশীল। ভবিষ্যতে কতজন মানুষের শরীরে এমন সুপ্ত কোষ আছে, তার আরও নির্ভুলভাবে হিসাব করতে এই পদ্ধতি সাহায্য করবে।

অন্যদিকে সাইরাস ঘাজার এই কোষগুলোকে একটু ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখেন। তিনি বলেন, ‘স্তন ক্যান্সারের কোনো সুপ্ত কোষ যদি অস্থিমজ্জায় গিয়ে থাকে, তাহলে স্বাভাবিকভাবে ধরে নেওয়া হয় যে সেটি স্তন ক্যান্সার কোষের অনেক বৈশিষ্ট্যই ধরে রাখবে, যাতে তাকে সহজে চেনা যায়। কিন্তু আমরা দেখছি, বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়।

একবার ক্যান্সার কোষ ছড়িয়ে পড়লে সেটি প্রায়ই তার আকৃতি, আকার ও আচরণ বদলে ফেলে। তাই আমাদের কেবল বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে সংজ্ঞা দেওয়ার ধারণা ছাড়তে হবে। বরং এই কোষগুলোর জিনগত পরিবর্তনকে মূল টিউমারের জিনগত পরিবর্তনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে। অর্থাৎ, একটি ছড়িয়ে পড়া কোষকে আমরা যেমনটা ভাবি তেমন দেখতে হওয়ার কারণে নয়, বরং তার জিনোম কী বলছে সেটার ভিত্তিতে চিহ্নিত করতে হবে।’

আরও পড়ুন
নিউইয়র্ক সিটির স্লোন কেটারিং ইনস্টিটিউটের পরিচালক ও ক্যান্সার বিজ্ঞানী জোয়ান মাসাগুয়ে বলেন, স্টেম সেল সাধারণত বেশিরভাগ সময় সুপ্ত অবস্থায়ই থাকে। আঘাত বা অসুস্থতার পরই জেগে ওঠে।

ক্যান্সার কোষ ঘুমিয়ে পড়ে কীভাবে এবং কেন

এখন প্রশ্ন হলো, কীভাবে ও কেন কোষগুলো ঘুমিয়ে পড়ে? কী ধরনের সংকেত পেলে তারা আবার জেগে ওঠে? বোস্টনের ডানা-ফারবার ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের ইমিউনোলজিস্ট জুডিথ আগুদোর মতে, ‘কোষগুলো মূলত নিজেদের সুরক্ষার জন্যই সুপ্ত অবস্থায় যায়। টিউমারের ভেতরে থাকলে একটি কোষ রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার আক্রমণ থেকে কিছুটা নিরাপদ থাকে। কিন্তু একা হয়ে গেলে নিজেকে আড়াল করার ব্যবস্থা না নিলে খুব সহজেই রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা তাদের ধ্বংস করে ফেলতে পারে। শরীরের ভেতর নতুন কোনো জায়গায় পৌঁছানোর যাত্রাটাও খুব কঠিন। এই যাত্রায় আলাদা হয়ে যাওয়া বেশিরভাগ কোষই মারা যায়। এমন কঠিন পরিবেশে টিকে থাকার একটি উপায় হলো সুপ্ত হয়ে যাওয়া।’

গবেষণায় দেখা গেছে, কোষগুলো সুপ্ত অবস্থায় থাকলেও তাদের চারপাশের ক্ষুদ্র পরিবেশের সঙ্গে যোগাযোগ চালিয়ে যায়। সক্রিয়ভাবে নিজেদের এমনভাবে বদলায়, যাতে সুপ্ত অবস্থাটা বজায় থাকে। সুপ্ত কোষগুলো নিজেদের বেঁচে থাকার জন্য দায়ী জিনগুলোর কাজের ধরন বদলায়। এর মধ্যে রয়েছে mTOR pathway, যা কোষের বিপাক ও বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা। পাশাপাশি, এসব কোষ অটোফ্যাজি নামে এক ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করে। সহজ ভাষায় এটি হলো, নিজেকে খেয়ে বাঁচা। এতে কোষগুলো ভেতরের উপাদান নতুনভাবে ব্যবহার করে বাইরের পরিবেশ থেকে খুব কম সহায়তা নিয়েই টিকে থাকতে পারে।

আরও পড়ুন
সুপ্ত কোষগুলো নিজেদের বেঁচে থাকার জন্য দায়ী জিনগুলোর কাজের ধরন বদলায়। এর মধ্যে রয়েছে mTOR pathway, যা কোষের বিপাক ও বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা।

বাইরের পরিবেশের সঙ্গে এই কোষগুলোর সম্পর্কও বেশ জটিল। বিশেষ করে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার সঙ্গে। নিউইয়র্ক সিটির মন্টেফিওরে আইনস্টাইন কমপ্রিহেনসিভ ক্যান্সার সেন্টারের ক্যান্সার ডরম্যান্স ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক জুলিও আগুইরে-ঘিসো বলেন, ‘রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার ভূমিকা শুধু কোষকে সুপ্ত অবস্থায় পাঠানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি সুপ্তাবস্থা বজায় রাখতে এবং ভাঙাতেও ভূমিকা রাখে। তিনি ও তাঁর দল দেখিয়েছেন, ফুসফুসের ম্যাক্রোফেজ নামে এক ধরনের রোগপ্রতিরোধী কোষ একটি বিশেষ প্রোটিন তৈরি করে। এটি স্তন ক্যান্সারের সুপ্ত কোষের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তাদের সুপ্তাবস্থাকে আরও দৃঢ় করে। অন্য গবেষণায় দেখা গেছে, সুপ্ত কোষগুলো কীভাবে টি-সেল ও ন্যাচারাল কিলার সেল–এর মতো রোগপ্রতিরোধী কোষের নজর এড়িয়ে চলতে পারে।

সব মিলিয়ে গবেষণা বলছে, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার ভারসাম্যে কোনো বড় পরিবর্তন না আসলে বেশিরভাগ সময় কোষগুলো সুপ্তই থাকে। বড় পরিবর্তন কোষগুলোর জন্য নিরাপদভাবে আবার জেগে ওঠার সুযোগ তৈরি করে। এমন পরিবর্তনের কারণ হতে পারে আঘাত বা অসুস্থতা। সাম্প্রতিক কয়েক বছরের গবেষণায় কোষের ক্ষতি, কোভিড-১৯ এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা সংক্রমণের সঙ্গে সুপ্তাবস্থা ভেঙে যাওয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এ ছাড়া বয়স বাড়া, ফাইব্রোসিস, দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ বা জীবনযাপনের ধরনও সুপ্ত কোষ জেগে ওঠার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।

আরও পড়ুন
ফুসফুসের ম্যাক্রোফেজ নামে এক ধরনের রোগপ্রতিরোধী কোষ একটি বিশেষ প্রোটিন তৈরি করে। এটি স্তন ক্যান্সারের সুপ্ত কোষের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তাদের সুপ্তাবস্থাকে আরও দৃঢ় করে।

নতুন চিকিৎসা ও ভবিষ্যৎ

২০১৮ সালে সুপ্ত ক্যান্সার কোষের চিকিৎসা খোঁজার প্রচেষ্টা বড় ধরনের স্বীকৃতি পায়। সে বছর যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ক্যান্সার চিকিৎসার সংজ্ঞা বিস্তৃত করে। এখন চিকিৎসা বলতে শুধু টিউমার ছোট করা নয়, বরং দ্বিতীয়বার টিউমার সৃষ্টি ঠেকানো বা বিলম্বিত করাকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ডরম্যান্স নিয়ে কাজ করা বেশিরভাগ গবেষক দলই ক্যান্সার ফিরে আসা রোধ করতে চান। সুপ্ত কোষগুলো যেখানে লুকিয়ে আছে, সেখানেই সেগুলো ধ্বংস করা গবেষকদের লক্ষ্য।

একটি উপায় হলো এই সুপ্ত কোষগুলোকে রোগপ্রতিরোধী কোষের সামনে দৃশ্যমান করে তোলা। ঘাজারের মতে, সুপ্ত কোষগুলো লুকিয়ে থাকে কারণ সেখানে যথেষ্ট টি-সেল পৌঁছায় না। CAR-T সেল চিকিৎসায় মানুষের ইমিউন সেল জেনেটিক্যালি পরিবর্তন করা হয়। এই পদ্ধতি ব্যবহার করলে রোগপ্রতিরোধী কোষগুলোর সঙ্গে সুপ্ত টিউমার কোষের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ানো যায় কি না, সেই বিষয়ে ঘাজার ও তাঁর দল গবেষণা করছেন।

CAR-T সেল
ছবি: শাটারস্টোক ডটকম

অন্য গবেষকেরা ক্যান্সার কোষ বেঁচে থাকার জন্য যে সংকেত ও বিপাকীয় পথ ব্যবহার করে, সেগুলোকে লক্ষ্য করছেন। এমন কিছু চিকিৎসা আছে, যা কোষ বিভাজনের ওপর নির্ভর না করে সক্রিয় ক্যান্সার কোষকে আক্রমণ করে। গবেষকদের ধারণা, এই ধরনের চিকিৎসা সুপ্ত টিউমার কোষের বিরুদ্ধেও কার্যকর হতে পারে।

প্রি-ক্লিনিক্যাল গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এই ইনহিবিটর ওষুধটিকে দ্রুত অনুমোদনের পথে আনে। এটি পাকস্থলীর ক্যান্সার ও অন্যান্য কঠিন টিউমারের চিকিৎসার জন্য বিবেচিত হয়। গবেষক দল ২০২৩ সালে এর ফেজ–১ ট্রায়াল শেষ করে। সেই পরীক্ষায় সাধারণভাবে ক্যান্সার কোষের ওপরই নজর দেওয়া হয়েছিল।

আরও পড়ুন
ঘাজারের মতে, সুপ্ত কোষগুলো লুকিয়ে থাকে কারণ সেখানে যথেষ্ট টি-সেল পৌঁছায় না। CAR-T সেল চিকিৎসায় মানুষের ইমিউন সেল জেনেটিক্যালি পরিবর্তন করা হয়।

তবে সবচেয়ে বড় অগ্রগতিগুলোর কিছু এসেছে অটোফ্যাজি বন্ধ করার চেষ্টা থেকে। এতে সুপ্ত কোষগুলোর নিজেদের পুনর্ব্যবহার করে বেঁচে থাকার ক্ষমতা কমে যায়। অস্ট্রেলিয়ার হাইডেলবার্গে অবস্থিত অলিভিয়া নিউটন-জন ক্যান্সার রিসার্চ ইনস্টিটিউটের স্তন ক্যান্সার গবেষক রবিন অ্যান্ডারসন বলেন, ‘এই কোষগুলো টিকে থাকার জন্য খুব সামান্যই চায়। তাই সেখান থেকেও একটু কেড়ে নিলে তারা সহজেই ধ্বংসের দিকে চলে যেতে পারে।’

ডাটন যে CLEVER ফেজ–২ ট্রায়ালে অংশ নিচ্ছেন, তার মূল লক্ষ্যই ছিল অটোফ্যাজি ব্যাহত করা। একই সঙ্গে ডি-মিশেল ও চোডশের তত্ত্বাবধানে আরও দুটি গবেষণাও এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে চলছে। এই তিনটি গবেষণায় হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন নামে একটি অটোফ্যাজি-রোধকারী ওষুধ একা বা অন্য চিকিৎসার সঙ্গে মিলিয়ে কতটা কার্যকর, তা পরীক্ষা করা হচ্ছে। এসব চিকিৎসার মধ্যে আছে mTOR সংকেত ব্যাহতকারী ওষুধ, কোষ বিভাজন বন্ধকারী উপাদান এবং এমন ইমিউনথেরাপি, যা টিউমার কোষকে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার সামনে দৃশ্যমান করে তোলে।

CLEVER ট্রায়ালে প্রায় ৫০ জন স্তন ক্যান্সার রোগীকে হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন দেওয়া হয়। কেউ শুধু এই ওষুধ, কেউ আবার এর সঙ্গে mTOR ব্যাহতকারী ওষুধ এভেরোলিমাস নেন। যারা শুধু একটি ওষুধ পেয়েছিলেন, তাদের শরীরেও সুপ্ত টিউমার কোষ কমে যায়। তবে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায় যাদের দুইটি ওষুধ একসঙ্গে দেওয়া হয়েছিল। ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে এই যৌথ চিকিৎসায় অংশ নেওয়া ৮৭ শতাংশ রোগীর শরীর থেকে সুপ্ত টিউমার কোষ সম্পূর্ণভাবে দূর হয়ে যায়।

SURMOUNT পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণার অর্থায়নের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। ডাটনের বয়স এখন ষাটের কোঠায়। তিনি আগামী ২০ বছর এই পর্যবেক্ষণে থাকতে রাজি হয়েছেন। তাঁর মতে, এতে গবেষকেরা সুপ্ত কোষ সম্পর্কে আরও ভালোভাবে জানতে পারবেন। পাশাপাশি তিনিও মানসিক শান্তি পাবেন।

লেখক: প্রদায়ক, বিজ্ঞানচিন্তা

সূত্র: নেচার ডট কম

আরও পড়ুন