জলহস্তী মানুষের জন্য কতটা বিপজ্জনক
আপনি যদি ইন্টারনেটে আফ্রিকার সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রাণীদের তালিকা খোঁজেন, তবে জলহস্তীর নাম ওপরের দিকেই পাবেন। বিভিন্ন জায়গায় দাবি করা হয়, জলহস্তীর আক্রমণে বছরে গড়ে ৫০০ থেকে ৩ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। এমনকি বিবিসি ডিসকভার ওয়াইল্ডলাইফ কিংবা ব্রিটানিকার মতো বিশ্বকোষেও এই সংখ্যার উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, ৫০০ বা ৩ হাজার সংখ্যাগুলো ঠিক কোথা থেকে এসেছে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট সূত্র বা প্রমাণ সহজে পাওয়া যায় না।
বিজ্ঞানী ও গবেষকেরা বিষয়টি নিয়ে বেশ দ্বিধায় আছেন। কারণ, বন্য প্রাণীর আক্রমণে কতজন মানুষের মৃত্যু হলো, তা ধারাবাহিকভাবে লিখে রাখার মতো কোনো কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা বা ডেটাবেইস নেই। তাই সঠিক সংখ্যাটি জানতে হলে গবেষকদের প্রতিটি দেশের আলাদা বন্য প্রাণী সংঘাতের তথ্য ও বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্রগুলো যাচাই করে দেখতে হয়।
সহজভাবে বললে, জলহস্তী অবশ্যই একটি বিপজ্জনক প্রাণী; তবে এদের হাতে ঠিক কতজন মানুষের মৃত্যু হয়, তা নিয়ে প্রচলিত সংখ্যাগুলো মূলত অনুমাননির্ভর।
পুরুষ জলহস্তীরা নিজেদের এলাকা চিহ্নিত করার জন্য লেজ দিয়ে মল ছিটিয়ে দেয়। এরা নিজেদের মুখ প্রায় ১৫০ থেকে ১৮০ ডিগ্রি পর্যন্ত বড় করে খুলতে পারে! যেখানে মানুষ পারে মাত্র ২৬ ডিগ্রি।
জলহস্তীর শারীরিক গঠন ও বৈশিষ্ট্য
হাতি ও গন্ডারের পরেই জলহস্তী পৃথিবীর সবচেয়ে বড় স্থলচর স্তন্যপায়ী প্রাণী। একটি পূর্ণবয়স্ক পুরুষ জলহস্তীর ওজন সাধারণত প্রায় ১ হাজার ৫০০ কেজি হয়। তবে কোনো কোনোটি ২ হাজার ৬০০ কেজি পর্যন্তও হতে পারে। এরা মূলত তৃণভোজী এবং দিনের বেশির ভাগ সময় পানিতে কাটায়।
দিনের বেলা সূর্যের কড়া তাপ থেকে নিজেদের সংবেদনশীল ত্বক বাঁচাতে এরা পানিতে থাকে। এদের শরীর থেকে একধরনের লালচে তৈলাক্ত ঘাম বের হয়, যা প্রাকৃতিক সানস্ক্রিন হিসেবে কাজ করে। জলহস্তীরা সাঁতার কাটতে বা পানিতে ভাসতে পারে না। এরা অগভীর পানিতে পা দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এমনকি এরা পানির নিচে ঘুমাতেও পারে। ঘুমানোর সময় এদের মস্তিষ্কের একটি বিশেষ ক্ষমতা কাজ করে। ফলে প্রতি তিন থেকে পাঁচ মিনিট পরপর শ্বাস নেওয়ার জন্য এরা নিজে থেকেই পানির ওপরে উঠে আসে, অথচ এদের ঘুমও ভাঙে না!
রাতে ঘাস খাওয়ার জন্য জলহস্তীরা পানি থেকে ডাঙায় উঠে আসে এবং প্রতি রাতে প্রায় ৩৬ কেজি পর্যন্ত ঘাস খায়। এদের শরীর অনেক ভারী হলেও স্থলে ঘণ্টায় প্রায় ৫০ কিলোমিটার গতিতে দৌড়াতে পারে।
পুরুষ জলহস্তীরা নিজেদের এলাকা চিহ্নিত করার জন্য লেজ দিয়ে মল ছিটিয়ে দেয়। এরা নিজেদের মুখ প্রায় ১৫০ থেকে ১৮০ ডিগ্রি পর্যন্ত বড় করে খুলতে পারে! যেখানে মানুষ পারে মাত্র ২৬ ডিগ্রি। এদের মুখের ভেতর বিশাল সব দাঁত থাকে, যা ২০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। জলহস্তীর কামড়ের জোর ১ হাজার ৮০০ পিএসআই, যা একটি সিংহের কামড়ের চেয়েও প্রায় দ্বিগুণ। মূলত পানিতে ডুবিয়ে দেওয়া, শরীরের চাপে পিষ্ট করা অথবা দাঁতের মারাত্মক কামড়ের কারণেই জলহস্তীর হাতে মানুষের মৃত্যু হয়।
রাতে ঘাস খাওয়ার জন্য জলহস্তীরা পানি থেকে ডাঙায় উঠে আসে এবং প্রতি রাতে প্রায় ৩৬ কেজি পর্যন্ত ঘাস খায়। এদের শরীর অনেক ভারী হলেও স্থলে ঘণ্টায় প্রায় ৫০ কিলোমিটার গতিতে দৌড়াতে পারে।
আক্রমণ কতটা ভয়ংকর
২০২২ সালে সুইজারল্যান্ডের ফ্রন্টিয়ার্স ইন কনজারভেশন সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে মানুষ ও জলহস্তীর সংঘাত নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা প্রকাশ করা হয়। সেখানে গবেষকেরা চমকপ্রদ একটি তথ্য দিয়েছেন। আমরা প্রায়ই শুনি যে আফ্রিকায় জলহস্তীর আক্রমণেই সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যায়, কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, এই দাবির সপক্ষে তেমন কোনো শক্ত প্রমাণ নেই। প্রকৃতপক্ষে বন্য প্রাণীর আক্রমণে মৃত্যুর হিসাব করলে দেখা যায়, জলহস্তীর চেয়ে বুনো হাতির আঘাতেই বেশি মানুষ মারা যায়।
২০১২ সালে জাম্বিয়াতে করা একটি গবেষণা অনুযায়ী, ২০০২ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সেখানে জলহস্তীর আক্রমণে ৬৫ জন মারা গেছেন। অর্থাৎ বছরে গড়ে প্রায় ১০ জন। পুরো বিশ্বে যত জলহস্তী আছে, তার প্রায় ৩৫ শতাংশই বাস করে জাম্বিয়াতে। সেই হিসাব ধরে আমরা যদি পুরো বিশ্বের কথা চিন্তা করি, তবে জলহস্তীর কারণে বছরে বড়জোর ৩৮ থেকে ৫০ জন মানুষের মৃত্যু হতে পারে। এই সংখ্যাটি প্রচলিত ৫০০ বা ৩ হাজার মৃত্যুর দাবির চেয়ে অনেক কম।
জলহস্তী হয়তো শুধু সংখ্যার দিক থেকে আফ্রিকার সবচেয়ে ঘাতক প্রাণী নয়, কিন্তু এদের আক্রমণের ধরন অত্যন্ত ভয়ংকর। গবেষক ভ্যান হাউডট ও ট্রেইল জানিয়েছেন, জলহস্তীর আক্রমণের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ৮৭ শতাংশই মারা যান। অর্থাৎ অন্য প্রাণীর চেয়ে এরা হয়তো কম মানুষকে আক্রমণ করে, কিন্তু একবার আক্রমণ করলে সেখান থেকে বেঁচে ফেরার সম্ভাবনা খুব কম থাকে। যাঁরা বেঁচে যান, তাঁদেরও প্রায়ই শরীরের কোনো অঙ্গ হারাতে হয় বা চিরস্থায়ী পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়। সুতরাং জলহস্তী আফ্রিকার সবচেয়ে ঘাতক প্রাণী না হলেও এটি নিঃসন্দেহে অন্যতম বিপজ্জনক একটি প্রাণী।
২০১২ সালে জাম্বিয়াতে করা একটি গবেষণা অনুযায়ী, ২০০২ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সেখানে জলহস্তীর আক্রমণে ৬৫ জন মারা গেছেন। অর্থাৎ বছরে গড়ে প্রায় ১০ জন।
শুধু আক্রমণ নয়, রোগজীবাণুও বিপজ্জনক
জলহস্তীর কামড় বা আক্রমণ ছাড়াও মানুষের জন্য আরেকটি বড় বিপদের কারণ হতে পারে অ্যানথ্রাক্স নামে রোগ। গবেষকেরা দেখেছেন, খরা বা খাবারের অভাব দেখা দিলে জলহস্তীরা মাটির খুব কাছ থেকে ছোট ঘাস খায়। এই মাটির ভেতরেই লুকিয়ে থাকে অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু। এ ছাড়া সংক্রমিত পানি পান করা বা অন্য মৃত জলহস্তীর মাংস খাওয়ার মাধ্যমেই এই রোগ এদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
আফ্রিকা মহাদেশের জাম্বিয়া, উগান্ডা ও নামিবিয়ার মতো দেশগুলোতে বিভিন্ন সময়ে অ্যানথ্রাক্সের প্রভাবে শত শত জলহস্তীর মৃত্যু হয়েছে। এমনকি ২০২৫ সালের এপ্রিলে কঙ্গোর ভিরুঙ্গা ন্যাশনাল পার্কেও ৫০টি জলহস্তী এই রোগে মারা গেছে। জলহস্তী থেকে অ্যানথ্রাক্স মানুষের মাঝেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। ২০১১ সালে জাম্বিয়ায় মৃত জলহস্তীর এলাকার আশপাশে থাকা ৫১১ জন মানুষ অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হন এবং ৫ জন মারা যান।
২০২৫ সালের এপ্রিলে কঙ্গোর ভিরুঙ্গা ন্যাশনাল পার্কেও ৫০টি জলহস্তী এই রোগে মারা গেছে। জলহস্তী থেকে অ্যানথ্রাক্স মানুষের মাঝেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
জলহস্তীর আক্রমণ থেকে বাঁচার উপায়
জলহস্তীর আক্রমণ থেকে বাঁচতে হলে জানতে হবে এদের এড়িয়ে চলার উপায়। জলহস্তী অত্যন্ত শক্তিশালী প্রাণী, তাই এদের এড়িয়ে চলাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। সাধারণত মাছ ধরা, নৌকা চালানো বা সাঁতার কাটার সময় মানুষ জলহস্তীর আক্রমণের শিকার হয়। এ ছাড়া ভোর বা সন্ধ্যায় যখন এরা ঘাস খাওয়ার জন্য ডাঙায় উঠে আসে, তখন এদের খুব কাছে চলে যাওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক।
সাফারিতে যাওয়ার সময় আফ্রিকার জলাশয়গুলোতে জলহস্তী দেখতে শান্ত মনে হলেও এরা আসলে বেশ আক্রমণাত্মক। তাই এদের এলাকায় ঘোরার সময় কিছু সতর্কতা মানা জরুরি। সব সময় অভিজ্ঞ গাইডের নির্দেশ মেনে চলতে হবে।
জলহস্তীদের নিয়মিত যাতায়াতের পথে হাঁটা মোটেই ঠিক নয় এবং সব সময় দলের সঙ্গে থাকা জরুরি। ভোরে বা সন্ধ্যায়, যখন এরা বেশি সক্রিয় থাকে, তখন এদের এলাকায় না যাওয়াই ভালো। কোনোভাবেই জলহস্তীর পেছন দিক থেকে কাছে যাওয়ার চেষ্টা করবেন না। বরং কাছাকাছি থাকলে হালকা শব্দ করে নিজের উপস্থিতি জানান দিন।
সাফারিতে যাওয়ার সময় আফ্রিকার জলাশয়গুলোতে জলহস্তী দেখতে শান্ত মনে হলেও এরা আসলে বেশ আক্রমণাত্মক। তাই এদের এলাকায় ঘোরার সময় কিছু সতর্কতা মানা জরুরি।
জলহস্তী রেগে গেলে বড় করে মুখ খুলে হাই তোলার মতো ভঙ্গি করে কিংবা মাথা হেলিয়ে গোঙানির মতো শব্দ করে সতর্কবার্তা দেয়। এমন পরিস্থিতিতে এরা তাড়া করলে দ্রুত কোনো গাছে উঠে পড়ুন অথবা নিজের ও জলহস্তীর মাঝে পাথর বা ঢিবির মতো শক্ত কোনো বাধা রাখার চেষ্টা করুন। কখনো জলহস্তী ও পানির উৎসের মাঝখানে দাঁড়াবেন না। কারণ, ভয় পেলে এরা পানির দিকেই অন্ধের মতো দৌড় দেয়।
নৌকায় থাকার সময় আশপাশে বড় ঢেউ দেখলে বুঝতে হবে সেখানে জলহস্তী আছে। তখন নৌকার গায়ে বা পানিতে জোরে আঘাত করলে এরা অনেক সময় ভয় পেয়ে দূরে সরে যায়। যদি নৌকা থেকে পানিতে পড়ে যান, তবে দ্রুত নৌকা থেকে দূরে সরুন; কারণ, এরা বড় বস্তুকে আগে আক্রমণ করে। মনে রাখবেন, জলহস্তী আপনাকে শিকার করতে হামলা করে না, বরং নিজের এলাকা থেকে তাড়িয়ে দিতে চায়।