বাতাসের ধূলিকণা ও ১০০ বছরের রহস্যের সমাধান
বুক ভরে শ্বাস নিলে কী শান্তি, তাই না? অবশ্য বাংলাদেশের শহরগুলোতে আর বুক ভরে শ্বাস নেওয়া যায় কোথায়। বিশেষ করে ঢাকা তো বিশ্বের অন্যতম বায়ুদূষণের শহর। শহরের মানুষ প্রতিবার শ্বাসের সঙ্গে শরীরের ভেতর টেনে নেয় লাখ লাখ অদৃশ্য কণা?
ধুলোবালি, ধোঁয়া, ভাইরাসের কণা, এমনকি প্লাস্টিকের অতি ক্ষুদ্র টুকরো মিশে আছে বাতাসে। এদের মধ্যে কিছু কণা এতই ছোট যে, সেগুলো সোজা আমাদের ফুসফুসের গভীরে, এমনকি রক্তেও ঢুকে পড়তে পারে। আর এখান থেকেই শুরু হয় হার্টের অসুখ, স্ট্রোক কিংবা ক্যানসারের মতো ভয়ানক সব সমস্যা।
বিজ্ঞানীরা অনেক দিন ধরেই বাতাসের এই খুদে কণাদের গতিবিধি বোঝার চেষ্টা করছেন। কিন্তু একটা জায়গায় এসে তাঁরা বারবার আটকে যাচ্ছিলেন। প্রায় ১০০ বছর ধরে চলা সেই সমস্যার সমাধান অবশেষে মিলেছে! যুক্তরাজ্যের ওয়ারউইক ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা বাতাসের এই ১০০ বছরের পুরোনো রহস্য ভেদ করেছেন।
ধুলোবালি, ধোঁয়া, ভাইরাসের কণা, এমনকি প্লাস্টিকের অতি ক্ষুদ্র টুকরো মিশে আছে বাতাসে। এদের মধ্যে কিছু কণা এতই ছোট যে, সেগুলো সোজা আমাদের ফুসফুসের গভীরে ঢুকে পড়তে পারে।
সমস্যাটা কি ছিল
বাতাসে ভাসা এই কণাগুলো কিন্তু দেখতে মোটেও সুন্দর গোলগাল নয়। কোনোটা চ্যাপ্টা, কোনোটা লম্বাটে, আবার কোনোটা ভাঙা ইটের মতো এবড়োখেবড়ো। কিন্তু গত ১০০ বছর ধরে বিজ্ঞানীরা যখনই এই কণাগুলোর গতিবিধি নিয়ে অঙ্ক কষতেন, তাঁরা ধরে নিতেন কণাগুলো একদম নিখুঁত গোলকের মতো।
কেন এমনটা ধরে নিতেন? কারণ, গোল জিনিসের অঙ্ক কষা সহজ! কিন্তু বাস্তবে তো ধুলো বা ধোঁয়া গোল হয় না। ফলে বিজ্ঞানীদের ভবিষ্যদ্বাণী বা মডেলগুলো কখনোই শতভাগ সঠিক হতো না। এই ভুল ধারণার কারণেই আমরা এত দিন ঠিকঠাক বুঝতে পারিনি, বিষাক্ত কণাগুলো আসলে বাতাসের মাধ্যমে কীভাবে আমাদের নাকে এসে পৌঁছায়।
গোল জিনিসের অঙ্ক কষা সহজ! কিন্তু বাস্তবে তো ধুলো বা ধোঁয়া গোল হয় না। ফলে বিজ্ঞানীদের ভবিষ্যদ্বাণী বা মডেলগুলো কখনোই শতভাগ সঠিক হতো না।
১০০ বছরের পুরোনো ভুল!
যুক্তরাজ্যের ওয়ারউইক ইউনিভার্সিটির গবেষক অধ্যাপক ডানকান লকারবি এবং তাঁর দল এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন। মজার ব্যাপার হলো, তাঁরা নতুন কিছু আবিষ্কার করেননি, বরং ১৯১০ সালের একটি পুরোনো সূত্রকে নতুন করে ঝালিয়ে নিয়েছেন।
ব্রিটিশ বিজ্ঞানী কানিংহাম ১৯১০ সালে বাতাসের কণার গতি নিয়ে একটি সূত্র দিয়েছিলেন। পরে ১৯২০-এর দশকে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী রবার্ট মিলিকান সেই সূত্রটি একটু ঘষামাজা করেন। কিন্তু সমস্যা হলো, মিলিকান এবং পরবর্তী বিজ্ঞানীরা সহজ করার জন্য শুধু গোলাকার বস্তুর ওপরই জোর দিয়েছিলেন। ফলে আসল কণাগুলো হিসাবের বাইরেই থেকে গিয়েছিল।
অধ্যাপক লকারবি সেই ১৯১০ সালের মূল আইডিয়াতে ফিরে গেলেন। তিনি কারেকশন টেনসর নামে একটি গাণিতিক টুল ব্যবহার করে দেখালেন, কণাটি গোল, চ্যাপ্টা বা যেমনই হোক না কেন, তার গতি এখন নির্ভুলভাবে মাপা সম্ভব!
এই আবিষ্কারের ফলে এখন বিজ্ঞানীরা আরও ভালোভাবে বুঝতে পারবেন, শহরের ধোঁয়া বা কলকারখানার বিষাক্ত কণা কীভাবে বাতাসে ছড়ায়। হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ভাইরাস কীভাবে ছড়ায়, তা আরও নিখুঁতভাবে জানা যাবে। ন্যানো-টেকনোলজি ব্যবহার করে তৈরি ওষুধ কীভাবে ফুসফুসের সঠিক জায়গায় পৌঁছাবে, তা-ও ডিজাইন করা সহজ হবে।