নখ কামড়ানোর অভ্যাস কতটা ক্ষতিকর

দাঁত দিয়ে নখ কাটার এই অভ্যাস আমাদের শরীরের জন্য আসলে কতটা ক্ষতিকর?ছবি: গেটি ইমেজ

কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে গভীর চিন্তা করছেন, আর অজান্তেই মুখে চলে গেছে হাত। মনোযোগ দিয়ে ভাবার সঙ্গে শুরু হয়ে গেল দাঁত দিয়ে নখ কাটা। যাঁরা এমনটা করেন, তাঁদের কাছে এটি খুব পরিচিত ঘটনা।

আমরা অনেকেই কোনো কিছু ভাবতে ভাবতে, একঘেয়েমি কাটাতে কিংবা মানসিক চাপের সময় অজান্তেই নখ কামড়াতে শুরু করি। প্রথম দেখায় এটি খুব সাধারণ ও নির্দোষ একটি অভ্যাস মনে হতে পারে। কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে ছোট এই অভ্যাসের পেছনে রয়েছে নানাবিধ শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি। দাঁত দিয়ে নখ কাটার এই অভ্যাসটি আমাদের শরীরের জন্য আসলে কতটা ক্ষতিকর এবং আমরা কেন এমনটা করি?

যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষায়িত চিকিৎসা ও গবেষণা কেন্দ্র ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক একটি জরিপ চালায়। সেখানে তারা দেখে, প্রতি ১০ জন মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে ২ থেকে ৩ জনই দাঁত দিয়ে নখ কাটে। বাংলাদেশে এ ধরনের কোনো গবেষণা কথা শোনা যায়নি। তাই এ ব্যাপারে সঠিক পরিসংখ্যানও নেই। তবে মার্কিন গবেষকরা বলছেন, অনেক মানুষ এমনটা করে মূলত নিজেকে শান্ত রাখার জন্য। এই বদভ্যাস অনেকের ক্ষেত্রে মনের ভেতরের অস্থিরতা দূর করতে সাহায্য করে। এ ছাড়া একঘেয়েমি কাটাতে কিংবা অতিরিক্ত মানসিক চাপের মধ্যেও কেউ কেউ অজান্তেই নখ কামড়াতে শুরু করেন।

আরও পড়ুন
যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষায়িত চিকিৎসা ও গবেষণা কেন্দ্র ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক একটি জরিপ চালায়। সেখানে তারা দেখে, প্রতি ১০ জন আমেরিকানের মধ্যে ২ থেকে ৩ জনই দাঁত দিয়ে নখ কাটে।

হাতের চেয়েও নোংরা নখের নিচটা

আমরা ছোটবেলা থেকে মেনে চলি, যেকোনো কিছু খাওয়ার আগে হাত ধোয়া জরুরি। কারণ, হাত দিয়ে আমরা সারা দিন নানা জিনিস স্পর্শ করি। ফলে হাত নোংরা হয়ে যায়। তবে হাত না ধুয়ে খাওয়ার চেয়েও ক্ষতিকর হলো দাঁত দিয়ে নখ কামড়ানো। কারণ, নখ কামড়ানোর সময় আঙুল সরাসরি মুখের ভেতরে ঢুকে যায়।

আসল কথা হলো, নখ নিজেই এক অদ্ভুত নোংরা জায়গা।যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা ১৯৮৮ সালে জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল মাইক্রোবায়োলজিতে একটি গবেষণা প্রকাশ করেন।

হাত না ধুয়ে খাওয়ার চেয়েও ক্ষতিকর হলো দাঁত দিয়ে নখ কামড়ানো
ছবি: গেটি ইমেজ

সেখানে দেখা যায়, হাতের অন্যান্য অংশের চেয়ে নখের নিচে সবচেয়ে বেশি ব্যাকটেরিয়া থাকে। নখের নিচে ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি ছিল গড়ে প্রায় ২ লাখ ৪৫ হাজার। যেখানে হাতের অন্য অংশগুলোতে এই মান ছিল মাত্র ৩৫৫-এর কাছাকাছি। বোঝাই যাচ্ছে, নখের নিচে কতটা বিপজ্জনক পরিমাণে ব্যাকটেরিয়া জমে থাকে!

আরও পড়ুন
নখের নিচে জমে থাকে অগণিত ব্যাকটেরিয়া, ধূলিকণা আর ছত্রাক। আর নখ কামড়ানো মানে এসব ক্ষতিকর উপাদান সোজা নিজের মুখে নেওয়া। বোঝাই যাচ্ছে, অভ্যাসটা কতটা নোংরা ও ক্ষতিকর।

নখ কামড়ালে যে মুখের ভেতরে ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ বাড়ে, তা বেশ কয়েকটি গবেষণায় প্রমাণিত। ২০০৭ সালে তুরস্কের আতাতুর্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরাও ওরাল মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড ইমিউনোলজি জার্নালে একটি গবেষণা প্রকাশ করেন। ২৫ জন নখ কামড়ানো ব্যক্তি ও ৩৪ জন নখ না কামড়ানো ব্যক্তির লালা পরীক্ষা করে দেখা হয়। নখ কামড়ানো ৭৬ শতাংশ মানুষের মুখে এন্টারোব্যাকটেরিয়াসি নামের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যায় সেখানে। অথচ নখ না কামড়ানো মানুষদের মাত্র ২৬ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে এটি ছিল।

পরবর্তীতে ২০১৭ সালে অ্যানালস অব ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল রিসার্চ জার্নালে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় ২০০টি লালার নমুনা পরীক্ষা করা হয়। যার মধ্যে ১০০টি ছিল নখ কামড়ানো ব্যক্তিদের আর ১০০টি নখ না কামড়ানো ব্যক্তিদের। এতে দেখা যায়, নিয়মিত নখ কামড়ান এমন ৫৮ শতাংশ মানুষের মুখেই এই ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া রয়েছে। যেখানে নখ না কামড়ানো মানুষদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল মাত্র ১৬ শতাংশ।

সহজ কথায়, নখের নিচে জমে থাকে অগণিত ব্যাকটেরিয়া, ধূলিকণা আর ছত্রাক। আর নখ কামড়ানো মানে এসব ক্ষতিকর উপাদান সোজা নিজের মুখে নেওয়া। বোঝাই যাচ্ছে, অভ্যাসটা কতটা নোংরা ও ক্ষতিকর।

আরও পড়ুন
নখ কামড়ানো ৭৬ শতাংশ মানুষের মুখে এন্টারোব্যাকটেরিয়াসি নামের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যায় সেখানে। অথচ নখ না কামড়ানো মানুষদের মাত্র ২৬ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে এটি ছিল।

আঙুল ও দাঁতের মারাত্মক ক্ষতি

নখ কামড়ানোর অভ্যাস শুধু যে মুখে জীবাণু ছড়ায়, তা কিন্তু নয়। এটি অন্যান্য দিক থেকেও বেশ ক্ষতিকর। ২০২২ সালে ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ অ্যান্ড পাবলিক হেলথ প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে নখ কামড়ানোর একাধিক ক্ষতির কথা বলা হয়।

প্রথমত, এতে আঙুল ও নখের সরাসরি ক্ষতি হয়।ওই গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা নিয়মিত নখ কামড়ান, তাঁদের নখ অস্বাভাবিক ছোট ও এবড়োখেবড়ো হয়ে যায়।নখের গোড়ার চামড়া বা কিউটিকল নষ্ট হয়ে যায়।নখের চারপাশে ঘা তৈরি হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা নিয়মিত নখ কামড়ান, তাঁদের নখের গোড়ার চামড়া বা কিউটিকল নষ্ট হয়ে যায়। নখের চারপাশে ঘা তৈরি হয়
ছবি: গেটি ইমেজ

এ ছাড়া নখের আশপাশে সূক্ষ্ম রক্তক্ষরণ, নখ কালো হয়ে যাওয়া, নখ ভঙ্গুর হয়ে যাওয়া, নখের সাদা অংশ বড় হয়ে যাওয়া এবং নখের গোড়ায় ক্ষতের দাগ তৈরি হয়। অর্থাৎ নখ কামড়ালে নখের মারাত্মক ক্ষতি হয়, যা যে কারও চোখেই সহজে ধরা পড়ে। দ্বিতীয়ত, এই ক্ষতির প্রভাব শুধু হাতেই থাকে না। অনবরত নখ কামড়ানোর ফলে দাঁত ক্ষয়ে যায় এবং মাড়ির টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আরও পড়ুন
গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা নিয়মিত নখ কামড়ান, তাঁদের নখ অস্বাভাবিক ছোট ও এবড়োখেবড়ো হয়ে যায়। নখের গোড়ার চামড়া বা কিউটিকল নষ্ট হয়ে যায়। নখের চারপাশে ঘা তৈরি হয়।

সঠিক পদ্ধতি মেনে এই অভ্যাস বন্ধ করা সম্ভব

নখ কামড়ানোর এসব বিপদ জানার পর দুশ্চিন্তা হলে সঠিক পদ্ধতি মেনে এই অভ্যাস একেবারেই বন্ধ করা সম্ভব। তবে চাইলেই হুট করে এই অভ্যাস ছাড়ানো কঠিন। কারণ, এর সঙ্গে মানসিক চাপ জড়িয়ে থাকে। তাই বিশেষজ্ঞরা মন শান্ত রাখা ও আচরণগত থেরাপি নেওয়ার পরামর্শ দেন। আর কেউ চাইলে আমেরিকান একাডেমি অব ডার্মাটোলজির কিছু সহজ উপায় মেনে চলতে পারেন:

● নখ সব সময় ছোট করে কেটে রাখা।

● নখ সুন্দর রাখতে নেইলপলিশ ব্যবহার করা।

● বাজারে পাওয়া তেতো স্বাদের বিশেষ নেইলপলিশ লাগানো।

● সব সময় নখের ভেতরের ময়লা পরিষ্কার রাখা।

● নখ কামড়ানোর ইচ্ছা জাগলে গাম চাবানো।

লেখক: প্রদায়ক, বিজ্ঞানচিন্তা

সূত্র: পপুলার সায়েন্স

আরও পড়ুন