শীতে কাঁপি কেন

অনেক ক্ষেত্রে কাঁপুনিতে শরীরের তাপমাত্রা ঘণ্টায় ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যেতে পারেছবি: রিয়াল পিপল গ্রুপ/গেটি ইমেজ

ঠান্ডা মোকাবিলা করতে আপনি অনেক কিছু করতে পারেন। একাধিক কাপড় পরতে পারেন, কিছু সময় পরপর ব্যায়াম করতে পারেন। দুই হাত ঘষার পাশাপাশি মুখ দিয়ে বাতাস বের করে দিতে পারেন হাঁ করে। কিন্তু কাঁপুনি আসলে আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এ সময় শরীর স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু সেই কাঁপুনি অনুভব করার সময় কী ঘটে? অতিরিক্ত ঠান্ডায় দাঁতে দাঁত লেগে যায়। নিজের ইচ্ছায় কি দাঁতে দাঁত লাগা বন্ধ করা যায়?

আসলে শরীরের খিঁচুনি হয় পেশির কারণে। সাধারণত হাত-পা এবং যে পেশিগুলো চোয়ালের সঙ্গে যুক্ত থাকে, সেগুলো অল্প সময়ের মধ্যে দ্রুত সংকুচিত ও প্রসারিত হয়। এ পরিস্থিতিতে বুঝতে হবে, আপনার তাপমাত্রা অত্যধিক কমে গেছে। বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে পড়ার আগে ব্যবস্থা নিতে হবে।

আমাদের মস্তিষ্ক সব সময় শরীরকে পর্যবেক্ষণ করে। শরীরে ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসের আক্রমণ হলে কিংবা রক্তে শর্করার হার কমে গেলে মস্তিষ্ক তা টের পায়। এ রকম ঠান্ডায় যদি শরীরে কাঁপুনি না হয়, তাহলে শেষ পর্যন্ত হাইপোথার্মিয়া হতে পারে। হাইপোথার্মিয়া হলে শরীরে যতটুকু তাপ উৎপাদিত হয়, তার চেয়ে বেশি তাপ হারায়। সাধারণত আমাদের শরীরের তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকে। তাপমাত্রা কমে ৩৫ ডিগ্রিতে নামলেই বুঝতে হবে হাইপোথার্মিয়া। সুতরাং কাঁপুনি হলো জীবন রক্ষাকারী প্রাকৃতিক প্রতিক্রিয়া। তবে এটা কোনো তাৎক্ষণিক সমাধান নয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কাঁপুনির কারণে শরীরের তাপমাত্রা ঘণ্টায় ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যায়।

ঠান্ডা লাগলে আমাদের শরীর কাঁপুনির সাহায্যে তাপ উৎপন্ন করে
ছবি: ইমগোর্থ্যান্ড/গেটি ইমেজ

ঠান্ডার মুখোমুখি হলে আমাদের ত্বকের নিচের রক্তনালিগুলো সংকুচিত হয়ে পড়ে, যাতে ত্বক থেকে বেশি তাপ হারাতে না পারে। ফলে রক্তসংবহনতন্ত্রে একটা পরিবর্তন আসে। দেহের জলীয় অংশ (ফ্লুইড ভলিউম) হঠাৎ খানিকটা বেড়ে যায়। সেটা বের করে দেওয়ার জন্য বারবার প্রস্রাবের বেগ চাপে। এ জন্য শীতকালে আমাদের বারবার বাথরুমে যেতে হয়। এ ছাড়া ত্বকের নিচের রক্তনালি সংকুচিত হওয়ার কারণে ত্বক প্রথমে লালচে, তারপর সাদা, সবশেষে নীল দেখাতে পারে। এরপরেই শুরু হয় কাঁপুনি।

আরও পড়ুন
হাইপোথার্মিয়া হলে শরীর তাপ উৎপাদনের চেয়ে বেশি তাপ হারায়। সাধারণত আমাদের শরীরের তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকে। তাপমাত্রা কমে ৩৫ ডিগ্রিতে নামলেই বুঝতে হবে হাইপোথার্মিয়া।

ঠান্ডা নাকি ভয়

নার্ভাস হলে অনেকের কাঁপুনি ধরে। অসুস্থতা বা ঠান্ডা না লাগলেও তা হতে পারে। শরীরে অ্যাড্রেনালিনের পরিমাণ বেড়ে গেলে কাঁপুনি হয়। সাধারণত উদ্বিগ্ন কিংবা ভয় পেলে মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা থেকে অ্যাড্রেনালিন নিঃসৃত হয়। এটি শারীরিক লড়াই বা বিপদ থেকে দূরে সরে যাওয়ার জন্য পেশিতে শক্তি বাড়িয়ে দেয়। অ্যাড্রেনালিনের মাত্রার কারণে অনেকের পেশি কাঁপতে পারে। এর কারণে পেশিগুলোর অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োজন হয় না।

শরীর কাঁপানো কীভাবে বন্ধ করবেন

কাঁপুনি বন্ধ করার সবচেয়ে সেরা উপায়টি জানতে হলে আপনাকে প্রথমে কাঁপুনির কারণ জানতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, আপনার শরীর যদি প্রচণ্ড গরম থাকে, তাহলে ভেজা কাপড় দিয়ে কিছুক্ষণ পরপর ঠান্ডা করতে হবে। কপালে ভেজা কাপড় দিয়ে রাখতে পারেন। আপনি যদি জ্বরে ভোগেন এবং অসুস্থ বোধ করেন, তাহলে বিশ্রাম নিতে হবে। এতে আপনার শরীর স্বাভাবিকভাবেই জ্বরের সঙ্গে লড়াই করতে পারবে। কাঁপুনির কারণে আপনার শরীরে ঠান্ডা লাগতে পারে।

কাঁপুনি হলে বড় করে শ্বাস নিন এবং শান্ত থাকার চেষ্টা করুন
ছবি: পোলারম্যাক্স

কিন্তু রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য ইতিমধ্যে আপনার শরীরের ভেতরটা গরম হয়েছে। তবে অনেক বেশি কাপড় পরলে শরীর অতিরিক্ত গরম হয়ে যেতে পারে। যাঁদের রক্তে শর্করা কম, তাঁরা কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবার বেশি খেতে পারেন। এতে কাঁপুনি কম হবে। তবে ভয় পেয়ে কাঁপুনি হলে বড় করে শ্বাস নিন এবং শান্ত থাকার চেষ্টা করুন, কাঁপুনি বন্ধ হয়ে যাবে।আপনার শরীর সামান্য ভেজা থাকলে ধীরে ধীরে তাপ কমবে এবং কাঁপুনি বন্ধ হবে।

আরও পড়ুন
শরীরে অ্যাড্রেনালিনের পরিমাণ বেড়ে গেলে কাঁপুনি হয়। সাধারণত উদ্বিগ্ন কিংবা ভয় পেলে মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা থেকে অ্যাড্রেনালিন নিঃসৃত হয়।

মস্তিষ্ক যেভাবে কাঁপুনি বুঝতে পারে

১. তাপমাত্রা কমে

আপনার রক্ত বা ত্বক কম তাপমাত্রা অনুভব করবে।

২. মস্তিষ্কের সংকেত

হাইপোথ্যালামাস নামে মস্তিষ্কের একটি অংশ পেশিতে স্নায়ু সংকেত পাঠিয়ে তাপমাত্রা হ্রাসের প্রতিক্রিয়া জানায়।

৩. ত্বকের প্রতিক্রিয়া

ত্বকের পৃষ্ঠের কাছাকাছি থাকা রক্তনালিগুলো সংকুচিত থাকে, যাতে রক্ত থেকে কম তাপমাত্রা নষ্ট হয়।

৪. পেশির কার্যকলাপ

স্নায়ু সংকেত পাওয়ার পর পেশির হাড়গুলো ক্রমাগত শক্ত ও আলগা হতে থাকে।

ছবি: সিকে-টোয়েলভ

৫. তাপমাত্রা বাড়ে

পেশি নড়াচড়ার কারণে তাপ উৎপন্ন হয়। ফলে শরীরের তাপ আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।

সূত্র: হাউ ইট ওয়ার্কস

*লেখাটি ২০২৪ সালে বিজ্ঞানচিন্তার জানুয়ারী সংখ্যায় প্রকাশিত

আরও পড়ুন