শীতকালে মানুষ বেশি অসুস্থ হয় কেন

শীতকাল মানেই কি সর্দি-কাশির অবধারিত আক্রমণ? কেন এই ঋতুতে জীবাণুরা এতটা শক্তিশালী হয়ে ওঠে? আমাদের নাক কীভাবে এই আক্রমণ থেকে বাঁচতে পারে? বিস্তারিত জানতে পড়ুন…

শীতকালে অসুস্থতার হার অন্যান্য সময়ের তুলনায় বেশি থাকেছবি: সেব্রা / অ্যাডোবি স্টক

শীতকাল অনেকের প্রিয় ঋতু হলেও এই সময়েই মানুষ সবচেয়ে বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ে। শীত এলেই সর্দি, জ্বর, কাশি, গলাব্যথা বা ফ্লুর মতো রোগগুলোর যেন হিড়িক পড়ে যায়। হাসপাতালগুলোতেও রোগীর ভিড় বাড়ে। কিন্তু কেন শীতকালেই এসব রোগের সংক্রমণ বেড়ে যায়? চলুন, এর পেছনের বিজ্ঞান জেনে নেওয়া যাক।

ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়াজনিত অসুস্থতা বছরের যেকোনো সময়ই দেখা দিতে পারে। কিন্তু শীতকালে এরা যেন একটু বেশিই বেপরোয়া হয়ে ওঠে। আমরা প্রায়ই ভাবি, শীতকালে মানুষ ঘরের ভেতর বেশি সময় কাটায় বলেই সর্দি–কাশি বা ফ্লু বেশি ছড়ায়। কারণ মানুষ একে অন্যের কাছাকাছি থাকে, এতে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। কথাটা মিথ্যা নয়। তবে এর পেছনে আরও কিছু কারণ আছে।

ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস
ছবি: উইকিপিডিয়া

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথের তথ্য অনুযায়ী, ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের চারপাশে থাকা লিপিড বা চর্বিজাতীয় আবরণ উষ্ণ তাপমাত্রায় তরল হয়ে যায়। এতে ভাইরাসটি কম স্থিতিশীল হয় এবং ছড়ানোর ক্ষমতাও কমে। কিন্তু ঠান্ডা আবহাওয়ায় এই লিপিড আবরণটি শক্ত ও অক্ষত থাকে। ফলে ভাইরাসটি বেশি স্থিতিশীল হয় এবং দীর্ঘ সময় সক্রিয় থাকতে পারে। এই ভাইরাস যখন মানুষের শ্বাসনালির সংস্পর্শে আসে, তখন এই লিপিড আবরণ ভেঙে যায় এবং ভাইরাস সংক্রমণ ঘটাতে শুরু করে।

আরও পড়ুন
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথের তথ্য অনুযায়ী, ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের চারপাশে থাকা লিপিড বা চর্বিজাতীয় আবরণ উষ্ণ তাপমাত্রায় তরল হয়ে যায়। এতে ভাইরাসটি কম স্থিতিশীল হয়।

শীতকালে বাতাসে আর্দ্রতা কমে যায়। বাতাসে জলীয় বাষ্প কম থাকলে ভাইরাস সহজেই অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে। দীর্ঘ সময় ভেসে থাকতে পারে বাতাসে। আবার শীতে সাধারণত মানুষ ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ রাখে, ফলে বাতাস চলাচল কমে যায়। এতে ঘরের ভেতরের বাতাস স্থির হয়ে যায়। সেই পরিবেশে জীবাণু দীর্ঘ সময় টিকে থেকে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে।

এতক্ষণ দেখলাম শীতে আবহাওয়া কীভাবে জীবাণু ছড়াতে সাহায্য করে। এবার দেখা যাক, আমাদের শরীর কেন শীতে এত দ্রুত সংক্রমিত হয়। মানুষের নাকের ভেতরের তাপমাত্রা যদি মাত্র ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমে যায়, তাহলে নাকের ভেতরে থাকা বিলিয়ন বিলিয়ন উপকারী জীবাণুনাশক কোষ ও ভাইরাস প্রতিরোধকারী কণার প্রায় ৫০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়। অর্থাৎ, সামান্য তাপমাত্রা কমলেই আমাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার অর্ধেকই অকেজো হয়ে পড়ে।

শীতকালে অসুস্থতার হার অন্যান্য সময়ের তুলনায় বেশি থাকে
ছবি: মিডজার্নির সাহায্যে তৈরি

নাক হলো আমাদের শরীরে জীবাণু প্রবেশের প্রধান রাস্তা। কোনো ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া নাক দিয়ে ঢুকে পড়লে নাকের সামনের অংশই সবার আগে টের পায় এবং প্রতিরোধ গড়ে তোলে। জীবাণু প্রবেশের পরপরই নাকের ভেতরের আবরণী কোষগুলো নিজেদের অসংখ্য অনুলিপি তৈরি করে। একে বলে এক্সট্রাসেলুলার ভেসিকল বা ইভি। এই ইভিগুলো সাধারণ কোষের মতো বিভাজিত হতে পারে না, কিন্তু এদের কাজই হলো জীবাণু ধ্বংস করা। এগুলো একধরনের ফাঁদের মতো কাজ করে।

আরও পড়ুন
মানুষের নাকের ভেতরের তাপমাত্রা যদি মাত্র ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমে যায়, তাহলে নাকের ভেতরে থাকা উপকারী জীবাণুনাশক কোষ ও ভাইরাস প্রতিরোধকারী কণার প্রায় ৫০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়।

আপনি যখন শ্বাসের সঙ্গে কোনো ভাইরাস টেনে নেন, তখন সেটি সরাসরি কোষে না লেগে এই ইভি নামক ফাঁদগুলোর গায়ে আটকে যায়। নাক পরে শ্লেষ্মার মাধ্যমে এগুলোকে বের করে দেয়।

বিষয়টি বোঝার জন্য বোলতার চাকের উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। বোলতার চাকে ঢিল মারলে যেমন সব বোলতা একসঙ্গে বেরিয়ে এসে আক্রমণ করে, ঠিক তেমনি জীবাণু প্রবেশ করলে নাকের এই কোষগুলো দল বেঁধে আক্রমণ করে জীবাণুকে শুরুতেই শেষ করে দেয়।

জীবাণুর আক্রমণের মুখে পড়লে নাক এই ইভি তৈরির হার প্রায় ১৬০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়। শুধু তাই নয়, ইভির পৃষ্ঠে মূল কোষের তুলনায় অনেক বেশি রিসেপ্টর থাকে, যা জীবাণুকে আটকে ফেলার ক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে।

নাকে শ্বাসের সঙ্গে ঢোকা ভাইরাসকে ইভি আঁকড়ে ধরে
ছবি: এআইয়ের সাহায্যে তৈরি

নাকের ভেতরে থাকা এই রিসেপ্টরগুলোকে হাতের সঙ্গে তুলনা করা যায়। এরা শ্বাসের সঙ্গে ঢোকা ভাইরাসকে আঁকড়ে ধরে। প্রতিটি এক্সট্রাসেলুলার ভেসিকলের গায়ে স্বাভাবিক কোষের তুলনায় প্রায় ২০ গুণ বেশি রিসেপ্টর থাকে। ফলে এগুলো প্রচুর আঠালো হয়। এ ছাড়া এক্সট্রাসেলুলার ভেসিকলের ভেতরে সাধারণ কোষের তুলনায় ১৩ গুণ বেশি মাইক্রো আরএনএ থাকে। এগুলোই ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করার শক্তিশালী অস্ত্র।

আরও পড়ুন
ইভির পৃষ্ঠে মূল কোষের তুলনায় অনেক বেশি রিসেপ্টর থাকে, যা জীবাণুকে আটকে ফেলার ক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে।

সমস্যা হলো, শীতের তীব্র ঠান্ডায় নাকের ভেতরের তাপমাত্রা কমে গেলে এই পুরো ব্যবস্থার বারোটা বেজে যায়। তাপমাত্রা ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমলেই প্রায় ৪২ শতাংশ এক্সট্রাসেলুলার ভেসিকল নষ্ট হয়ে যায়। একই সঙ্গে ইভির ভেতরে থাকা মাইক্রো আরএনএর পরিমাণও অর্ধেক হয়ে যায় এবং রিসেপ্টরের সংখ্যা ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।

ফলে রিসেপ্টরগুলো আর আগের মতো আঠালো থাকে না এবং জীবাণুকে আটকাতে পারে না। এ কারণেই শীতকালে সর্দি বা ফ্লুর মতো শ্বাসতন্ত্রের রোগগুলোর বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই করার ক্ষমতা কমে যায়।

শীতকালে মাস্ক ব্যবহার করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ
ছবি: সিবিসি

এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে শীতকালে মাস্ক ব্যবহার করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মাস্ক বাইরের ধুলাবালি ও জীবাণু থেকে যেমন রক্ষা করে, তেমনি নাকের ভেতরটা গরম রাখতেও সাহায্য করে। শীতকালে নাকের ভেতরটা যত বেশি গরম রাখা যাবে, শ্বাসতন্ত্রের রোগজীবাণু থেকেও তত বেশি সুরক্ষা মিলবে।

 

লেখক: শিক্ষার্থী, কৃষিবিজ্ঞান বিভাগ, হেলথ অ্যান্ড লাইফ সায়েন্স অনুষদ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

সূত্র: মেন্টাল ফ্লস, সায়েন্টিফিক আমেরিকান ও দ্য কনভারসেশন

আরও পড়ুন