গাছের শিকড় কীভাবে শক্ত মাটি ভেদ করে গভীরে চলে যায়
গাছের শিকড়গুলো দেখতে কেমন নরম ও নাজুক, তাই না? অথচ এই শিকড়ই কী অবলীলায় শক্ত মাটি, এমনকি ইট-পাথর ভেদ করে মাটির গভীরে চলে যায়। কিন্তু কীভাবে?
কৃষিকাজের জন্য এটা একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ। সারা বিশ্বেই এখন মাটির ঘনত্ব বেড়ে যাচ্ছে। এটা একটা বড় সমস্যা। আধুনিক কৃষিতে ভারী ভারী ট্রাক্টর আর যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ফলে ক্ষেতের মাটি চ্যাপ্টা হয়ে পাথরের মতো শক্ত হয়ে যায়। তার ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খরা তো আছেই। মাটি শুকিয়ে গেলে তা আরও কঠিন হয়ে যায়। তখন ফসলের শিকড় আর মাটি ভেদ করে বেশি গভীরে যেতে পারে না। ফলে ফসলও ভালো হয় না।
কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, উদ্ভিদের নিজস্ব একটা দারুণ টেকনিক আছে এই সমস্যার সমাধান করার। আর আমরা যদি একটু সাহায্য করি, তবে উদ্ভিদ এই কাজটা আরও ভালো করতে পারে। মাটি খুব শক্ত হয়ে গেলে উদ্ভিদ নিজের শিকড় মোটা করে ফেলে। কিন্তু ঠিক কীভাবে উদ্ভিদ কাজটা করে, তা এত দিন জানা ছিল না। শুধু জানা ছিল, ইথিলিন নামে একটি উদ্ভিদ হরমোন এতে কলকাঠি নাড়ে।
সম্প্রতি নেচার জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা এই রহস্যের জট খুলেছেন। কোপেনহেগেন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক স্টাফান পারসন এবং নটিংহাম ইউনিভার্সিটির বিপিন পান্ডে এই বিষয়টির ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
মাটি খুব শক্ত হয়ে গেলে উদ্ভিদ নিজের শিকড় মোটা করে ফেলে। কিন্তু কীভাবে উদ্ভিদ কাজটা করে, তা এত দিন জানা ছিল না। শুধু জানা ছিল, ইথিলিন নামে একটি উদ্ভিদ হরমোন এতে কলকাঠি নাড়ে।
বিপিন পান্ডে ব্যাপারটা খুব সহজ করে বুঝিয়েছেন। ধরুন, আপনি একটি পাইপকে মাটির নিচে ঢোকাতে চান। পাইপটা যদি সরু হয়, তবে চাপ দিলে সেটা বেঁকে যাবে। কিন্তু পাইপটা যদি মোটা হয় এবং এর বাইরের দেয়ালটা যদি পুরু ও শক্ত হয়, তবে সেটা না বেঁকে সোজা মাটির ভেতরে ঢুকে যাবে।
গাছের শিকড় ঠিক এই বুদ্ধিটাই কাজে লাগায়। যখনই শিকড় টের পায় সামনের মাটি শক্ত, তখন উদ্ভিদ শিকড় ফুলিয়ে মোটা করে ফেলে এবং বাইরের কোষপ্রাচীর শক্ত করে তোলে। ফলে শিকড়টি তখন ওপর থেকে চাপ দিয়ে শক্ত মাটির বুক চিরে নিচে নেমে যায়।
গবেষকরা এমন এক জিনের খোঁজ পেয়েছেন যা এই প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে। গবেষকেরা দেখেছেন, উদ্ভিদে এই বিশেষ প্রোটিনের মাত্রা বাড়িয়ে দিলে শিকড় আরও সহজে শক্ত মাটি ভেদ করতে পারে। মূলত ধান গাছের ওপর এই পরীক্ষা চালানো হলেও বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত, সব ধরনের গাছের ক্ষেত্রেই এই নিয়ম খাটে। কারণ, ধান ও সরিষা গোত্রের এক আগাছার মধ্যেই এই মেকানিজম দেখা গেছে।
এই আবিষ্কার কৃষির জন্য আশীর্বাদ হতে পারে। ভবিষ্যতে খরা বা ভারী যন্ত্রপাতির কারণে মাটি শক্ত হয়ে গেলেও আমরা এমন ফসল ফলাতে পারব, যার শিকড় অনায়াসেই সেই মাটি ভেদ করে পানি আর পুষ্টি সংগ্রহ করতে পারবে।
তা ছাড়া, কোষের দেয়াল বা সেলুলোজ তৈরির এই জিনগুলো নিয়ে গবেষণা করে বিজ্ঞানীরা ভবিষ্যতে হয়তো ইচ্ছেমতো বিভিন্ন আকৃতির গাছ তৈরি করতে পারবেন!