রানি ভ্রমর কীভাবে পানির নিচে বেঁচে থাকে
২০২৪ সালের এক আবিষ্কার সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। জানা যায়, কিছু কিছু রানি ভ্রমর পানির নিচে এক সপ্তাহ পর্যন্ত অনায়াসেই বেঁচে থাকতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্রমেই প্রতিকূল হয়ে ওঠা পরিবেশে তাদের টিকে থাকার ক্ষেত্রে এই আবিষ্কার এক নতুন আশার সঞ্চার করে। তবে সম্প্রতি জানা গেছে, কীভাবে রানি ভ্রমররা এই অসাধারণ কাজটি করে। কানাডার অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরবিজ্ঞানী চার্লস দারভো এই গবেষণায় নেতৃত্ব দেন।
গবেষক দলটি দেখেন, এই ভ্রমররা সরাসরি পানি থেকেই অক্সিজেন আহরণ করতে পারে। অন্তত সাময়িক সময়ের জন্য হলেও এরা পানির নিচেই শ্বাস নিতে সক্ষম। ফলে এদের ঘরবাড়ি বা গর্ত বন্যার পানিতে তলিয়ে গেলেও এরা প্রজাতি ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে যায় এবং পানি নেমে গেলে নতুন করে নিজেদের বংশ বৃদ্ধি করতে পারে। এর মাধ্যমে আরও প্রমাণিত হয়, প্রাণিকুলের কারও কারও মধ্যে চরম বৈরী আবহাওয়ায়ও নিজেকে টিকিয়ে রাখার মতো অসাধারণ জৈবিক রসদ লুকিয়ে আছে।
সাপ বা ব্যাঙের মতো কিছু কিছু পোকাও শীতনিদ্রায় চলে যেতে পারে। এ সময় এদের শারীরিক বৃদ্ধি ও বিপাকক্রিয়া প্রায় থেমে যায়। বৈরী পরিবেশে এভাবে বেঁচে থাকার প্রক্রিয়ার নাম ডায়াপজ। এ সময়েই রানি ভ্রমররা নিরাপদ ও উষ্ণ গর্ত খুঁজে দীর্ঘ নিদ্রায় গা এলিয়ে দেয়। কিন্তু সেই নিরাপদ আশ্রয় তো চিরকাল নিরাপদ থাকে না। বিশেষ করে ভূগর্ভস্থ এসব গর্ত বন্যায় সহজেই প্লাবিত হতে পারে। ডায়াপজ অবস্থায় থাকায় জরুরি মুহূর্তে নিজেকে বাঁচিয়ে পালানোর সুযোগও তারা পায় না। ফলে বন্যা ছাড়াও অতিরিক্ত বৃষ্টি বা তুষারগলা পানি সহজেই তাদের সমূলে ধ্বংস করে ফেলতে পারত, যদি না তাদের এই বিশেষ বাঁচার ক্ষমতাটি থাকত।
সাপ বা ব্যাঙের মতো কিছু কিছু পোকাও শীতনিদ্রায় চলে যেতে পারে। এ সময় এদের শারীরিক বৃদ্ধি ও বিপাকক্রিয়া প্রায় থেমে যায়। বৈরী পরিবেশে এভাবে বেঁচে থাকার প্রক্রিয়ার নাম ডায়াপজ।
প্রকৃতির এই প্রতিকূলতা অন্তত একটি ভ্রমর প্রজাতির কাছে এসে হার মেনে যায়। উত্তর আমেরিকার এই পোকাটির বৈজ্ঞানিক নাম বোম্বাস ইমপ্যাটিয়েন্স (Bombus impatiens)। ২০২৪ সালের গবেষণায় দেখা যায়, এই প্রজাতির রানিদের প্রায় ৯০ শতাংশই এক সপ্তাহ পর্যন্ত পানির নিচে ডুবে দিব্যি বেঁচে থাকতে পারে। আর সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, এরা দারুণ এই কাজটি করে বেশ কিছু শারীরিক প্রক্রিয়ার সমন্বয়ের মাধ্যমে।
প্রথমত, এরা পানির নিচেই শ্বাস নিতে পারে। দ্বিতীয়ত, এরা অবাত শ্বসন বা অক্সিজেনহীন প্রক্রিয়ায় বিপাকক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারে। তৃতীয়ত, এরা বিপাকের চরম অবনমন ঘটায়, যার মাধ্যমে এদের বিপাকক্রিয়ার হার একেবারে তলানিতে নামিয়ে আনে।
বিষয়টি ভালোভাবে বোঝার জন্য বিজ্ঞানীরা কয়েক ডজন রানি ভোমরা নিয়ে কাজ করেন। পরীক্ষাগারে তাঁরা এদের শীতকালীন ডায়াপজ পর্যবেক্ষণ করেন এবং এদের ঠান্ডা পানিতে ডুবিয়ে দেন। এরপর গবেষকেরা এদের বিপাক ও গ্যাস বিনিময়ের হার খেয়াল করেন নিবিড়ভাবে।
ভ্রমরগুলোকে ডুবিয়ে রাখা পানিতে গ্যাস বিনিময়ের মাত্রা মাপা হয়। একই সঙ্গে পানির ওপরে থাকা প্রকোষ্ঠেও তা মাপা হয়। বিশেষ করে খেয়াল রাখা হয় কার্বন ডাই-অক্সাইড ও অক্সিজেনের মাত্রা। এতে দেখা যায়, পানিতে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা কিছুটা বেড়েছে, আর কমেছে অক্সিজেনের মাত্রা। অর্থাৎ, ভ্রমরগুলো ডুবন্ত অবস্থায়ও পানি থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করছে এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড ছেড়ে দিচ্ছে।
দেখা যায়, পানিতে ডোবানোর আগে ডায়াপজ অবস্থায় থাকা ভ্রমর প্রতি ঘণ্টায় দেহের প্রতি গ্রাম ওজনের বিপরীতে ১৫.৪২ মাইক্রোলিটার কার্বন ডাই-অক্সাইড তৈরি করে।
অন্যদিকে, ডুবন্ত ভ্রমরদের দেহে ল্যাকটেট নামে একটি উপাদান ক্রমেই জমা হয়ে বেড়ে যাচ্ছিল। দেহ যখন অক্সিজেনের যথেষ্ট জোগান পায় না, তখন এটি অক্সিজেন ছাড়াই শক্তি উৎপাদনের কৌশল বেছে নেয়। এমন অক্সিজেনবিহীন বিপাক প্রক্রিয়ার সময়ই উপজাত হিসেবে তৈরি হয় ল্যাকটেট।
ডায়াপজের সময় এমনিতেই ভ্রমরের বিপাক ৯৫ শতাংশেরও বেশি কমে যায়। ডুবন্ত অবস্থায় তা কমে যায় আরও অনেক বেশি! দেখা যায়, পানিতে ডোবানোর আগে ডায়াপজ অবস্থায় থাকা ভ্রমর প্রতি ঘণ্টায় দেহের প্রতি গ্রাম ওজনের বিপরীতে ১৫.৪২ মাইক্রোলিটার কার্বন ডাই-অক্সাইড তৈরি করে। আর আট দিন পানির নিচে থাকলে এই হার কমে গিয়ে দাঁড়ায় মাত্র ২.৩৫ মাইক্রোলিটারে। মানে, আগের প্রায় ছয় ভাগের এক ভাগ!
এই সবকটি প্রক্রিয়ার সমন্বয়ে রানি ভ্রমর পানির নিচেও নিজের চারপাশ থেকে অক্সিজেন সংগ্রহ করতে পারে, আবার শরীরের শক্তির চাহিদাকেও একদম ন্যূনতম অবস্থায় ধরে রাখে। বিজ্ঞানীরা অবশ্য এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নন যে ডুবন্ত অবস্থায় এরা ঠিক কোন পদ্ধতিতে পানি থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করে। তবে তাঁদের দৃঢ় বিশ্বাস, ভ্রমররা এ ক্ষেত্রে ফিজিক্যাল গিল পদ্ধতি কাজে লাগায়। ফিজিক্যাল গিল কিন্তু মাছের ফুলকার মতো কোনো শারীরিক অঙ্গ নয়; এটি মূলত পোকার শরীরের চারপাশের রোমে আটকে থাকা পাতলা বাতাসের একটি স্তর। আবদ্ধ বাতাসের এই স্তরটিই পানির সঙ্গে গ্যাস বিনিময় সম্পন্ন করে এবং অনেকটা ফুলকার মতোই কাজ করে। তবে বিষয়টি আরও বিস্তারিত বুঝতে ভবিষ্যতের গবেষণাই আমাদের ভরসা।