মাত্র ১৫ মিনিটের রক্তপরীক্ষায় জানা যাবে শিশুর জ্বরের আসল কারণ কী
নবজাতকের জ্বর এলেই চিকিৎসকেরা বাধ্য হয়ে কড়া অ্যান্টিবায়োটিক দেন, অথচ ৮৫ শতাংশ ক্ষেত্রেই এর কোনো দরকারই থাকে না! এই অপ্রয়োজনীয় ওষুধের প্রভাবে আপনার শিশুর শরীরে যদি ভবিষ্যতে আর কোনো ওষুধই কাজ না করে, তবে কী হবে? বিজ্ঞানীদের নতুন আবিষ্কৃত মাত্র ১৫ মিনিটের একটি ছোট্ট রক্তপরীক্ষা কীভাবে এই ভয়ংকর ভবিষ্যতের হাত থেকে শিশুদের বাঁচাবে?
বাড়িতে ছোট শিশু থাকলে আপনার নিশ্চয়ই জানা আছে, নবজাতকের গায়ে সামান্য জ্বর এলেই বাবা-মায়ের বুকের ভেতরটা কেমন কেঁপে ওঠে। তড়িঘড়ি করে শিশুকে নিয়ে ছুটতে হয় হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে। চিকিৎসকেরাও নবজাতকদের ক্ষেত্রে কোনো ঝুঁকি নিতে চান না। ইতালির জিয়ান্নিনা গ্যাসিলিনি ইনস্টিটিউটের গবেষক তোমাসো বেলিনির ভাষায়, ‘জ্বর নিয়ে আসা শিশুদের প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত সব সময়ই চরম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ধরা হয়।’ এই ঝুঁকির কথা ভেবেই চিকিৎসকরা বেশিরভাগ সময় কালবিলম্ব না করে কড়া সব অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া শুরু করেন।
কিন্তু এখানেই লুকিয়ে আছে একটা বড় বিপদ। জ্বরের কারণ তো অনেক কিছুই হতে পারে। হতে পারে সেটা খুব সাধারণ কোনো ভাইরাল ইনফেকশন, যা কয়েকদিনের বিশ্রাম ও সাধারণ ওষুধেই সেরে যায়। আবার হতে পারে ভয়ংকর কোনো ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ, যার জন্য কড়া ওষুধের প্রয়োজন। মুশকিল হলো, বর্তমানে জ্বরের আসল কারণ বের করার যেসব গতানুগতিক প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা রয়েছে, সেগুলোর রিপোর্ট আসতে কয়েক ঘণ্টা থেকে শুরু করে বেশ কয়েক দিন পর্যন্ত সময় লেগে যায়। একজন চিকিৎসকের পক্ষে রোগীর সুরক্ষার কথা ভেবে এই দীর্ঘ সময় হাত গুটিয়ে বসে থাকা সম্ভব নয়। তাই আগাম সতর্কতা হিসেবে অ্যান্টিবায়োটিক চালিয়ে যাওয়া হয়।
মুশকিল হলো, বর্তমানে জ্বরের আসল কারণ বের করার যেসব গতানুগতিক প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা রয়েছে, সেগুলোর রিপোর্ট আসতে কয়েক ঘণ্টা থেকে শুরু করে বেশ কয়েক দিন পর্যন্ত সময় লেগে যায়।
অথচ পরিসংখ্যান বলছে, জ্বর নিয়ে হাসপাতালে আসা শিশুদের মধ্যে মাত্র ১৫ শতাংশের শরীরে গুরুতর ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন থাকে। অর্থাৎ, বাকি ৮৫ শতাংশ শিশুই কোনো প্রয়োজন ছাড়াই কড়া অ্যান্টিবায়োটিকের ধকল সহ্য করে। আর এই অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহারই সারা বিশ্বে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বা জীবাণুর ওষুধ-প্রতিরোধী হয়ে ওঠার পেছনের সবচেয়ে বড় কারণ। ভবিষ্যতে সত্যিই যখন অ্যান্টিবায়োটিকের দরকার পড়বে, তখন জীবাণু এতই শক্তিশালী হয়ে উঠবে যে হয়তো আর কোনো ওষুধই কাজ করবে না!
চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই বিশাল সংকটেরই এক জাদুকরী সমাধান নিয়ে হাজির হয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁরা এমন একটি রক্তপরীক্ষা আবিষ্কার করেছেন, যা মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যেই নিখুঁতভাবে বলে দেবে শিশুর জ্বরটা আসলে ব্যাকটেরিয়ার কারণে এসেছে, নাকি নিছকই কোনো ভাইরাসের আক্রমণ।
এই যুগান্তকারী পরীক্ষার মূলে রয়েছে রক্তের শ্বেতকণিকার দুটি বিশেষ প্রোটিন CD64 এবং CD169। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, যখন কোনো ব্যাকটেরিয়া শরীরে হামলা চালায়, তখন নিউট্রোফিল নামে শ্বেতকণিকার গায়ে CD64 প্রোটিনের মাত্রা হু হু করে বেড়ে যায়। অন্যদিকে, শরীর যখন কোনো ভাইরাসের সঙ্গে লড়াই করে, তখন মনোসাইট নামের আরেক ধরনের শ্বেতকণিকার বাইরের আবরণে CD64 এর বদলে CD169 প্রোটিনের পরিমাণ বাড়তে থাকে।
বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, যখন কোনো ব্যাকটেরিয়া শরীরে হামলা চালায়, তখন নিউট্রোফিল নামে শ্বেতকণিকার গায়ে CD64 প্রোটিনের মাত্রা হু হু করে বেড়ে যায়।
তোমাসো বেলিনি এবং তাঁর দল এই দুটি প্রোটিনের মাত্রার তারতম্য মেপেই আসল জাদুটা দেখিয়েছেন। তাঁরা ৯০ দিনের কম বয়সী ৮৫ জন নবজাতকের ওপর এই পরীক্ষাটি চালান। এই শিশুরা এর আগে সম্পূর্ণ সুস্থ ছিল, কিন্তু হঠাৎ জ্বর নিয়ে তাদের জরুরি বিভাগে আনা হয়। মাত্র ১৫ মিনিটের ওই পরীক্ষায় বিজ্ঞানীরা একদম নিখুঁতভাবে ১৫ জন শিশুর শরীরে ব্যাকটেরিয়া এবং ৪৪ জনের শরীরে ভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত করেন। বাকি ২৬ জনের শরীরে কোনো সংক্রমণই পাওয়া যায়নি! সম্প্রতি ফ্রান্সের প্যারিসে অনুষ্ঠিত ইউরোপিয়ান ইমার্জেন্সি মেডিসিন কংগ্রেসে এই অভাবনীয় ফলাফল তুলে ধরা হয়।
তবে এই সাফল্য রাতারাতি আসেনি। ফ্রান্সের মার্সেই শহরের বেকম্যান কুল্টার লাইফ সায়েন্সেসের গবেষক ফ্যাব্রিস ম্যালেরগু গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এই নির্দিষ্ট প্রোটিন টেস্ট নিয়ে ল্যাবরেটরিতে কাজ করছেন। ২০২১ সালে তাঁর দল বয়স্ক রোগীদের ওপর এই পরীক্ষা চালিয়ে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছিল। কিন্তু শিশুদের ওপর, বিশেষ করে নবজাতকদের ওপর এটি ঠিকমতো কাজ করবে কি না, তা নিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মধ্যে যথেষ্ট সন্দেহ ছিল। কারণ, নবজাতকদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা তখনো পুরোপুরি গঠিত হয় না। তাই তাদের শরীর আদৌ এই প্রোটিনগুলো ঠিকমতো তৈরি করে সিগন্যাল দিতে পারবে কি না, সেটাই ছিল সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। কিন্তু সব সন্দেহ ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে ছোটদের ক্ষেত্রেও এটি শতভাগ সফল প্রমাণিত হয়েছে।
ম্যালেরগু ও তাঁর দল এমন একটি ছোট পোর্টেবল মেশিন তৈরি করে ফেলেছেন, যেখানে আঙুলের মাথা থেকে নেওয়া মাত্র কয়েক ফোঁটা রক্ত দিলেই ১৫ মিনিটে চোখের সামনে ফলাফল ভেসে উঠবে।
এই পরীক্ষার বাস্তব প্রয়োগ কতটা জীবনরক্ষাকারী হতে পারে, তার একটি চমৎকার উদাহরণ দিয়েছেন ম্যালেরগু। তাঁর এক সহযোগী গবেষক ক্যারিবীয় দ্বীপ মার্টিনিকে ডেঙ্গু জ্বরের প্রাদুর্ভাবের সময় রোগীদের ওপর এই পরীক্ষাটি ব্যবহার করেছিলেন। ডেঙ্গু মূলত একটি ভাইরাল জ্বর, যা বিশ্রাম নিলে এমনিতেই সেরে যায়। কিন্তু ওই রক্তপরীক্ষায় ধরা পড়ে, ডেঙ্গুর লক্ষণ নিয়ে আসা বেশ কয়েকজন রোগীর শরীরে ভাইরাসের বদলে লেপ্টোস্পাইরোসিস নামে একটি ভয়ংকর ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন বাসা বেঁধেছে! সঠিক সময়ে ব্যাকটেরিয়া মারার অ্যান্টিবায়োটিক না পড়লে এই রোগে মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। শুধু একটি ১৫ মিনিটের রক্তপরীক্ষার কারণে সেদিন নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন ওই রোগীরা।
গবেষক বেলিনি এখন প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিন শ থেকে পাঁচ শ শিশুর ওপর আরও বড় পরিসরে এই পরীক্ষাটি চালানোর। অন্যদিকে ম্যালেরগু ও তাঁর দল এমন একটি ছোট পোর্টেবল মেশিন তৈরি করে ফেলেছেন, যেখানে আঙুলের মাথা থেকে নেওয়া মাত্র কয়েক ফোঁটা রক্ত দিলেই ১৫ মিনিটে চোখের সামনে ফলাফল ভেসে উঠবে। আর এই ডিভাইসটি এরই মধ্যে গবেষণার কাজে ব্যবহারের জন্য অনুমোদনও পেয়ে গেছে।