বেঁচে থাকার জন্য শরীরের কতটুকু অংশ দরকার
১৯৭৫ সালের মুক্তি পায় ব্রিটিশ কমেডি মুভি মন্টি পাইথন অ্যান্ড দ্য হোলি গ্রেইল। মুভির একটা দৃশ্যে রাজা আর্থারের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে ব্ল্যাক নাইটের হাত-পা সব কাটা পড়ে। অথচ সে নাছোড়বান্দা! সে বলছে, ‘আরে, এ তো সামান্য আঁচড়!’ মুভির পর্দায় এটা দেখে আমরা হাসি। কিন্তু বিজ্ঞান কী বলে? সত্যিই কি শরীরের এতগুলো অংশ হারানোর পরেও মানুষ বেঁচে থাকতে পারে?
ডার্ক হিউমার একপাশে সরিয়ে রাখলে প্রশ্নটা কিন্তু বেশ ইন্টারেস্টিং। আমাদের শরীরে প্রায় ৮০টি অঙ্গ আছে। এর মধ্যে মাত্র ৫টি অঙ্গকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে অতি-জরুরি অঙ্গ বলা হয়। এগুলো ছাড়া বেঁচে থাকা অসম্ভব। যেমন মস্তিষ্ক, হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস, লিভার ও কিডনি।
বাকি অঙ্গগুলোর কী অবস্থা? ইউসি স্যান ডিয়াগো হেলথের ট্রমা সার্জন জেসিকা উইভারের মতে, অন্ত্র, অগ্ন্যাশয় বা ত্বক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে ঠিকই, কিন্তু এগুলো ছাড়াও আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাহায্যে বেঁচে থাকা সম্ভব। আর আক্কেল দাঁতের মতো কিছু জিনিস তো শরীরের এমনিই আছে। বিজ্ঞানীরা আজও তর্ক করেন, এগুলোর আদৌ কোনো দরকার আছে কি না! চোখ বা জিহ্বা না থাকলে জীবনটা কঠিন হবে, কোয়ালিটি অব লাইফ কমে যাবে, কিন্তু জীবন প্রদীপ নিভে যাবে না।
ইউসি স্যান ডিয়াগো হেলথের ট্রমা সার্জন জেসিকা উইভারের মতে, অন্ত্র, অগ্ন্যাশয় বা ত্বক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে ঠিকই, কিন্তু বাকি অঙ্গগুলো ছাড়াও আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাহায্যে বেঁচে থাকা সম্ভব।
হাত-পা ছাড়া কি বাঁচা সম্ভব? অবশ্যই। ব্ল্যাক নাইটের মতো অবস্থা হলেও বেঁচে থাকা সম্ভব, যদি রক্তপাত বন্ধ করা যায়। জেসিকা উইভার একটা মজার তথ্য দিয়েছেন। ডাক্তাররা সাধারণত পায়ের চেয়ে হাত বাঁচানোর বেশি চেষ্টা করেন। কারণ, কৃত্রিম পা দিয়ে হাঁটাচলা করা এখন অনেক সহজ এবং এর ফলাফলও চমৎকার। কিন্তু আমাদের হাত দিয়ে আমরা এত সূক্ষ্ম সব কাজ করি যে, কৃত্রিম হাত দিয়ে তার বিকল্প তৈরি করা খুব কঠিন।
তবে হাত-পা কাটলে আসল বিপদ হলো রক্তপাত। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরে গড়ে ৫ লিটার রক্ত থাকে। এর মধ্যে ৩ লিটার বেরিয়ে গেলে রোগীকে বাঁচানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ওই ব্ল্যাক নাইট যদি আধুনিক কোনো হাসপাতালে পৌঁছাতে পারত, তাহলে হয়তো সে বেঁচে যেত। তবে অত রক্তপাতের পর তার ওই ডায়লগ দেওয়ার শক্তি থাকত কি না সন্দেহ!
সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হলো, ভাইটাল অর্গানগুলোরও পুরোটা সবসময় লাগে না। মস্তিষ্ক ঠিক থাকলে মস্তিষ্কের একটা বড় অংশ বাদ দিয়েও মানুষ বেঁচে থাকতে পারে। লিভারের একটা বড় অংশ কেটে ফেললেও সমস্যা নেই, এটি আবার নিজেকে গড়ে নিতে পারে। একটি কিডনিতেই আপনি দিব্যি জীবন পার করে দিতে পারবেন। অনেকে তো অন্যকে দানও করেন। তবে একসঙ্গে এসব অঙ্গ বিচ্ছিন্ন করলে সমস্যা হবে। ধীরে ধীরে বা এক এক করে অংশগুলো বাদ দেওয়া হলে শরীর মানিয়ে নিতে পারে। কিন্তু একসঙ্গে বড় আঘাত লাগলে বাঁচার সম্ভাবনা কমে যায়।
তবে হাত-পা কাটলে আসল বিপদ হলো রক্তপাত। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরে গড়ে ৫ লিটার রক্ত থাকে। এর মধ্যে ৩ লিটার বেরিয়ে গেলে রোগীকে বাঁচানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
আমাদের ভাইটাল অর্গানগুলো বিকল হয়ে গেলে এখন মেশিনের সাহায্য নেওয়া যায়। কিডনির জন্য ডায়ালাইসিস আছে। হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুসের কাজ চালানোর জন্য আছে একমো (ECMO) মেশিন। তবে দুটি অঙ্গের কাজ মেশিন দিয়ে পুরোপুরি করা যায় না। লিভার ও মস্তিষ্ক। লিভার প্রতিস্থাপন করা সম্ভব, কিন্তু মস্তিষ্কের বিকল্প নেই।
আমরা এখন যান্ত্রিকভাবে অনেক অঙ্গের কাজ চালিয়ে নিতে পারি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শুধু শ্বাস-প্রশ্বাস চালু রাখাই কি বেঁচে থাকা? ডায়ালাইসিস মানুষকে দীর্ঘকাল বাঁচিয়ে রাখতে পারে, কিন্তু একমো মেশিনের মতো প্রযুক্তিগুলো সাধারণত সাময়িক সময়ের জন্য ব্যবহার করা হয়। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তটা নিতে হয় রোগীর অবস্থা এবং তাঁর ব্যক্তিগত মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে। ব্ল্যাক নাইটের মতো হাত-পা ছাড়া বা মেশিনের সাহায্যে বেঁচে থাকা সম্ভব, কিন্তু সেটাকে কী বেঁচে থাকা বলবেন নাকি শুধুই টিঁকে থাকা!