গভীর সাগরে চতুর্থ বারের মতো দেখা গেল ৭ পায়ের অক্টোপাস
গভীর সমুদ্র মানেই এক রহস্যপুরী। সেখানে এমন সব আজব প্রাণীর বাস, যা দেখলে মনে হয় ভিনগ্রহের কোনো এলিয়েন বুঝি ভুল করে পৃথিবীতে চলে এসেছে। আজ আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেব তেমনই এক অদ্ভুত প্রাণীর সঙ্গে। বিজ্ঞানীরা আদর করে একে ডাকেন ‘দ্য ব্লব অক্টোপাস’। তবে এর আসল নাম সেভেন-আর্ম অক্টোপাস বা সাত পায়ের অক্টোপাস।
নাম শুনেই হয়তো ভাবছেন, বেচারার নিশ্চয়ই কোনো দুর্ঘটনায় একটা পা কাটা পড়েছে! কিন্তু ঘটনা আসলে তা নয়। এর নামকরণের পেছনে লুকিয়ে আছে এক মজার রহস্য। তার আগে বলে নিই, অক্টোপাসের সাধারণত ৮টি বাহু থাকে। সেগুলোকেই আমরা পা বলি। অনেকে হাতও বলেন। যদিও এর শুধু পেছনের বাহু দুটি হাঁটার সময় পা হিসেবে ব্যবহার করে। আসলে এই বাহুগুলোর সাহায্যে এরা চলাফেরা করে, শিকার ধরা ও পরিবেশ বোঝার জন্য ব্যবহার করে।
আবার প্রসঙ্গে ফিরি। এই প্রাণীটি কিন্তু চুনোপুঁটি নয়। ওজনে এটি প্রায় ৭৫ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। অথচ এত বিশাল সাইজ নিয়েও এরা বড়ই লাজুক। সচরাচর এদের দেখা পাওয়াই যায় না। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের মন্টেরি বে অ্যাকুয়ারিয়াম রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা সাগরের নিচে এক রোবট পাঠিয়েছিলেন। রোবটটির নাম ভেন্টানা। সমুদ্রের প্রায় ২ হাজার ৩০০ ফু গভীরে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ ক্যামেরায় ধরা পড়ে এই দানবীয় অক্টোপাসটি।
অক্টোপাসের সাধারণত ৮টি বাহু থাকে। সেগুলোকেই আমরা পা বলি। অনেকে হাতও বলেন। যদিও এর শুধু পেছনের বাহু দুটি হাঁটার সময় পা হিসেবে ব্যবহার করে।
বিশ্বাস করবেন কি না জানি না, এমবিএআরআই গত ৪০ বছর ধরে সমুদ্র গবেষণা করছে; কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে তারা মাত্র চতুর্থবারের মতো জীবন্ত অবস্থায় এই প্রাণীটিকে দেখতে পেল। এর আগে ডুবুরি এরিক আসকিলসরুড এর কিছু ছবি তুলতে পেরেছিলেন, তবে ভিডিও ফুটেজ পাওয়াটা সত্যিই ভাগ্যের ব্যাপার।
বিজ্ঞানীদের কাছে এর খটমটে নাম হলো হ্যালিফ্রন আটলান্টিকাস (Haliphron atlanticus)। নাম সেভেন-আর্ম হলেও বাস্তবে এদের বাহু কিন্তু আটটাই থাকে। তাহলে এমন নাম কেন? মজার ব্যাপার হলো, নামটা মূলত দেওয়া হয়েছে পুরুষ অক্টোপাসদের আচরণের কারণে।
পুরুষ অক্টোপাসদের প্রজননের জন্য হেক্টোকোটাইলাস নামে একটি বিশেষ বাহু থাকে। এই বাহু দিয়েই তারা শুক্রাণু স্থানান্তর করে। কিন্তু বেশির ভাগ সময় তারা এই বিশেষ বাহুটি চোখের নিচে লুকিয়ে রাখে। ফলে দূর থেকে দেখলে মনে হয় এর সাতটা বাহু!
প্রজননের সময় পুরুষ অক্টোপাস এই বাহুটি শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে সঙ্গীর কাছে দিয়ে দেয়। প্রকৃতির কী অদ্ভুত খেলা! এই অক্টোপাসদের সংসারে স্বামী-স্ত্রীর সাইজের পার্থক্য শুনলে আপনার চোখ কপালে উঠবে। স্ত্রী অক্টোপাস লম্বায় প্রায় ১৩ ফুটের বেশি হতে পারে। কিন্তু পুরুষ অক্টোপাস লম্বায় মাত্র ৮-১২ ইঞ্চি! ১৩ ফুটের বিশাল এক দানবীর পাশে ৮ ইঞ্চির পুঁচকে এক পুরুষ! প্রকৃতিতে পুরুষদের তুলনায় স্ত্রী প্রাণীদের বড় হওয়ার ঘটনা নতুন নয়, তবে এখানে পার্থক্যটা আকাশ-পাতাল।
পুরুষ অক্টোপাসদের প্রজননের জন্য হেক্টোকোটাইলাস নামে একটি বিশেষ বাহু থাকে। এই বাহু দিয়েই তারা শুক্রাণু স্থানান্তর করে। কিন্তু বেশির ভাগ সময় তারা এই বিশেষ বাহুটি চোখের নিচে লুকিয়ে রাখে।
আমরা সাধারণত জানি, অক্টোপাস মাছ বা কাঁকড়া খায়। কিন্তু এই সাত পায়ের দানব কী খায়? ২০১৭ সালে এমবিএআরআইয়ের বিজ্ঞানী স্টিভেন হ্যাডক এবং তাঁর দল প্রথম আবিষ্কার করেন যে, এরা আসলে জেলিফিশের মতো জেলটিনাস বা থলথলে প্রাণী খেতে পছন্দ করে।
এবারও তার প্রমাণ মিলল। নতুন ভিডিওতে দেখা গেছে, অক্টোপাসটি তার বাহু দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে একটি লাল রঙের হেলমেট জেলি। বিজ্ঞানীরা বলছেন, সম্ভবত এরা জেলিফিশের বিষাক্ত হুল বা স্টিংগারকে নিজেদের শিকারের অস্ত্র হিসেবেও ব্যবহার করে।
গভীর সমুদ্রের খাদ্যজাল যে কতটা জটিল, এই ঘটনা তারই প্রমাণ। সাগরের নিচে ঘুটঘুটে অন্ধকারে জেলিফিশ চিবিয়ে খাওয়া এই সাত পায়ের অক্টোপাস আমাদের আবারও মনে করিয়ে দিল, পৃথিবীর তিন ভাগ জল, আর সেই জলের নিচে লুকিয়ে আছে আমাদের কল্পনার চেয়েও বিস্ময়কর সব গল্প।