কিছু মানুষ অতীতের স্মৃতি কল্পনা করতে পারে না কেন
মনে করার চেষ্টা করুন তো, আজ সকালের কী নাশতা করেছেন? অথবা আপনি যে মগটিতে চা বা কফি খেয়েছেন, তার নকশাটা কি চোখের সামনে ভাসছে? কিংবা পাউরুটির ওপর মাখানো জ্যামের লালচে রংটা কি দেখতে পাচ্ছেন?
বেশির ভাগ মানুষই চোখ বন্ধ করে অতীত বা ভবিষ্যতের যেকোনো ছবি কল্পনায় একেবারে নিখুঁতভাবে দেখতে পান। একে বলা হয় মাইন্ডস আই বা মনের চোখ। কিন্তু আপনি জানলে অবাক হবেন, পৃথিবীর প্রায় ৪ শতাংশ মানুষের এই মনের চোখ বলতে কিছু নেই! চোখ বন্ধ করলে তারা শুধু ঘোর অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই দেখতে পায় না। তাদের কাছে কোনো কিছুর ধারণা বা শব্দ হয়তো মাথায় আসে, কিন্তু সেটার কোনো ছবি তাদের কল্পনায় ভাসে না। বিজ্ঞানের ভাষায় এই অদ্ভুত দশাকে বলা হয় অ্যাফ্যান্টাসিয়া।
২০১৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার সিডনি ইউনিভার্সিটির স্নায়ুবিজ্ঞানী ম্যাক শাইন তাঁর সহকর্মীদের সঙ্গে হ্যালুসিনেশন বা দৃষ্টিবিভ্রম নিয়ে আলোচনা করছিলেন। হঠাৎ তিনি বললেন, ‘আমি চোখ বন্ধ করলে তো একদম কিছুই দেখতে পাই না! সব ফাঁকা!’ তাঁর কথা শুনে সহকর্মীরা তো অবাক! ম্যাক শাইন নিজেও তখন প্রথম বুঝলেন, মানুষের কল্পনার জগৎ সবার জন্য এক রকম নয়।
অনেক অ্যাফ্যান্টাসিয়া থাকা মানুষই জীবনে কোনো দিন বুঝতে পারেন না, তাঁদের কল্পনার জগৎ অন্যদের চেয়ে আলাদা। কোনো সাইকোলজি ক্লাস বা হঠাৎ পড়া কোনো আর্টিকেলের মাধ্যমেই তাঁরা প্রথম এই অদ্ভুত সত্যটির মুখোমুখি হন।
বেশির ভাগ মানুষই চোখ বন্ধ করে অতীত বা ভবিষ্যতের যেকোনো ছবি কল্পনায় একেবারে নিখুঁতভাবে দেখতে পান। একে বলা হয় মাইন্ডস আই বা মনের চোখ।
২০০৩ সালে এডিনবরা ইউনিভার্সিটির নিউরোলজিস্ট অ্যাডাম জেমান এমন এক রোগীর সন্ধান পান, যিনি হৃৎপিণ্ডের একটি ছোট সার্জারির পর হঠাৎ করেই তাঁর কল্পনার ছবি দেখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন! জেমান এই ঘটনাটি নিয়ে ২০১০ সালে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। এরপরই ঘটে আসল চমক! দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এ এই খবরটি ছাপা হওয়ার পর প্রায় ২০ হাজার মানুষ জেমানের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানান, তাঁদেরও মনের চোখ নেই, আর তাঁরা জন্ম থেকেই এমন!
২০১৫ সালে জেমান এই অবস্থার নাম দেন অ্যাফ্যান্টাসিয়া। গ্রিক শব্দ ফ্যান্টাসিয়া মানে মনের চোখ, আর এর আগে ‘অ্যা’ বসিয়ে বোঝানো হয়েছে মনের চোখ না থাকা। তবে জেমান বা অন্য বিজ্ঞানীরা এটিকে কোনো রোগ বা সমস্যা বলতে রাজি নন। তাঁরা একে মানুষের মস্তিষ্কের একটি আকর্ষণীয় বৈচিত্র্য হিসেবেই দেখেন। গবেষণায় দেখা গেছে, এটি অনেকটা জিনগত। পরিবারের কারও থাকলে আপনারও এটি হওয়ার আশঙ্কা ১০ গুণ বেড়ে যায়। মজার ব্যাপার হলো, শিল্পীদের চেয়ে বিজ্ঞান বা প্রযুক্তির পেশায় থাকা মানুষদের মধ্যে অ্যাফ্যান্টাসিয়া বেশি দেখা যায়!
মানুষ তো আর নিজের মাথার ভেতরের ছবি কাউকে দেখাতে পারে না, তাই বিজ্ঞানীরা এটি মাপার কিছু দারুণ কৌশল বের করেছেন। সিডনির নিউ সাউথ ওয়েলস ইউনিভার্সিটির জোয়েল পিয়ারসন এই পদ্ধতিটি ব্যবহার করেন। যখন দুই চোখে দুটি আলাদা ছবি দেখানো হয়, তখন মানুষ যেকোনো একটি রং দেখতে পায়। সাধারণ মানুষ আগে থেকে যে রংটি কল্পনা করে রাখে, পরীক্ষায় সে ওই রংটিই বেশি দেখে। কিন্তু অ্যাফ্যান্টাসিয়া থাকা মানুষদের ক্ষেত্রে এই কল্পনা কোনো প্রভাব ফেলে না।
গবেষণায় দেখা গেছে, অ্যাফ্যান্টাসিয়া অনেকটা জিনগত। পরিবারের কারও থাকলে আপনারও এটি হওয়ার আশঙ্কা ১০ গুণ বেড়ে যায়।
ভূতের গল্প শুনলে সাধারণ মানুষ ভয়ে ঘামতে শুরু করে, কারণ তারা দৃশ্যটি কল্পনা করতে পারে। কিন্তু অ্যাফ্যান্টাসিয়ার ক্ষেত্রে এমনটা কম হয়। আবার, চোখ বন্ধ করে উজ্জ্বল আলোর কথা ভাবলে সাধারণ মানুষের চোখের মণি ছোট হয়ে আসে, কিন্তু এদের ক্ষেত্রে তা হয় না।
যখন আমরা কোনো কিছু দেখি, তখন আমাদের মস্তিষ্কের পেছনের দিকের ভিজ্যুয়াল কর্টেক্স অংশটি কাজ করে। আর যখন আমরা কিছু কল্পনা করি, তখন মস্তিষ্কের সামনের অংশ পেছনের এই ভিজ্যুয়াল কর্টেক্সকে সংকেত পাঠায় উল্টো পথে ছবি তৈরি করার জন্য।
বিজ্ঞানী গিউলিয়া ক্যাবাই একটি দারুণ পরীক্ষা করেন। তিনি সাধারণ মানুষ এবং অ্যাফ্যান্টাসিয়া থাকা মানুষদের কুকুরের ডাক শোনান। তিনি দেখেন, কুকুরের ডাক শুনে দুই দলের মানুষের ভিজ্যুয়াল কর্টেক্সেই কুকুরের ছবি তৈরি হয়েছে! কিন্তু অ্যাফ্যান্টাসিয়া থাকা মানুষরা সেটি দেখতে পাননি।
এর মানে হলো, তাদের মস্তিষ্কে ছবি ঠিকই তৈরি হয়, কিন্তু তাদের সচেতন মন সেই ছবিটাতে পৌঁছাতে পারে না! প্যারিস ব্রেন ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী জিয়াংহাও লিউর গবেষণায় দেখা গেছে, অ্যাফ্যান্টাসিয়া থাকা মানুষদের মস্তিষ্কের ছবি তৈরির অংশ এবং সামনের চিন্তাভাবনা করার অংশের মধ্যে যোগাযোগ বেশ দুর্বল থাকে। আর এই দুর্বল যোগাযোগের কারণেই তারা কল্পনার ছবিটা দেখতে পায় না।
বিজ্ঞানী গিউলিয়া ক্যাবাই দেখেন, কুকুরের ডাক শুনে দুই দলের মানুষের ভিজ্যুয়াল কর্টেক্সেই কুকুরের ছবি তৈরি হয়েছে! কিন্তু অ্যাফ্যান্টাসিয়া থাকা মানুষরা সেটি দেখতে পাননি।
অ্যাফ্যান্টাসিয়া থাকলে কি মানুষের স্মৃতিশক্তি কমে যায়? যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানী উইলমা বেইনব্রিজ একটি পরীক্ষায় কিছু মানুষকে একটি ছবি দেখিয়ে পরে তা স্মৃতি থেকে আঁকতে বলেন। দেখা যায়, অ্যাফ্যান্টাসিয়া থাকা মানুষেরা ছবিতে রং বা ডিটেইলস একটু কম দিলেও, তারা জিনিসগুলোর অবস্থান ঠিকঠাক মনে রাখতে পারে। তারা ছবির বদলে শব্দ বা লজিক দিয়ে স্মৃতি ধরে রাখে!
অনেকে মনে করেন, অ্যাফ্যান্টাসিয়া থাকাটা একদিক দিয়ে বেশ ভালো। বিজ্ঞানী ম্যাক শাইন বলেন, তিনি ভ্রমণের সময় পরিবারের সদস্যদের জন্য খুব একটা মন খারাপ করেন না। কারণ তিনি চোখ বন্ধ করে তাঁদের মুখটা দেখতে পান না বলে সহজেই ওই ভাবনা থেকে মন সরিয়ে নিতে পারেন। তাছাড়া, কোনো ভয়ংকর স্মৃতি বা ট্রমা বারবার চোখের সামনে ভেসে ওঠার কষ্ট থেকেও এঁরা রক্ষা পান।