জোনাকি কেন আলো জ্বালে

আলোর সংকেত দিয়ে প্রেম নিবেদন, নাকি মৃত্যুর ফাঁদ? জোনাকির এই মায়াবী আলোর পেছনে লুকিয়ে আছে এক রোমাঞ্চকর জগৎ। স্ত্রী জোনাকি কীভাবে নকল সংকেত পাঠিয়ে শিকার করে পুরুষ জোনাকিকে? ছোট্ট এই পোকার জীবনের অদ্ভুত সব রহস্য আর ছলনার গল্প…

একটি স্ত্রী জোনাকি পোকাছবি: এআইয়ের সাহায্যে তৈরি

জোনাকি পোকা কেন আলো জ্বালে? উত্তরটা কিন্তু মোটেও সোজা নয়। অন্ধকারে পথ দেখার জন্য জোনাকি আলো জ্বালে না। জোনাকির আলো আসলে তার ভাষা, ভাব বিনিময়ের মাধ্যম। মানুষ যেমন কথা বলে নিজের মনের ভাব প্রকাশ করে, জোনাকি সেটা করে আলোর মাধ্যমে। পৃথিবীর বেশিরভাগ কীটপতঙ্গই মুখ দিয়ে শব্দ করতে পারে না। কোনোটা ডানা ঝাপটে, কোনোটা পা দিয়ে শব্দ করে ভাবের আদান-প্রদান করে। কিন্তু জোনাকির উপায় একটাই—আলো জ্বালানো।

বিষয়টা আরেকটু সহজ করে বলি। সমুদ্রে জাহাজ চলাচলের সময় লাইট হাউজের আলো দেখে নাবিকরা দিক ঠিক করে। শহরে ট্রাফিক সিগন্যালের লাল-সবুজ বাতি দেখে ড্রাইভাররা বোঝে কখন থামতে হবে আর কখন চলতে হবে। এখানে কেউ কারও সঙ্গে কথা বলছে না, শুধু আলোর সংকেত দেখেই বুঝে নিচ্ছে কী করতে হবে।

জোনাকির ব্যাপারটাও ঠিক সেরকম। ওরা কথা বলতে পারে না, কিন্তু আলোর ঝলক দেখে বুঝতে পারে কে কী চাইছে। মজার ব্যাপার হলো, জোনাকির আলোর প্রায় ৯৮ ভাগই আলো, তাপ উৎপন্ন হয় না বললেই চলে। তাই জোনাকির আলো একেবারে ঠান্ডা। এ কারণেই নিজের আলোয় জোনাকি জ্বলে-পুড়ে ছাই হয়ে যায় না।

আরও পড়ুন
জোনাকিরা কথা বলতে পারে না, কিন্তু আলোর ঝলক দেখে বুঝতে পারে কে কী চাইছে। মজার ব্যাপার হলো, জোনাকির আলোর প্রায় ৯৮ ভাগই আলো, তাপ উৎপন্ন হয় না বললেই চলে।

জোনাকিরা মানুষের মতো আড্ডা দেয় না। তাহলে তাদের যোগাযোগের দরকার হয় কেন? এর প্রধান কারণ হলো প্রজনন। প্রজননের সময় হলে স্ত্রী ও পুরুষ জোনাকি পরস্পরকে আকর্ষণ করার জন্য আলো জ্বালে। জোনাকির আলো একটানা জ্বলে না, একবার জ্বলে এবং নেভে। ঠিক যেমন সমুদ্রের সিগন্যাল লাইট জ্বলে আর নেভে। পুরুষ জোনাকিগুলো উড়তে উড়তে আলো জ্বেলে সিগন্যাল পাঠায় স্ত্রী জোনাকির উদ্দেশে। স্ত্রী জোনাকিরা তখন ঝোপের আগায় কিংবা ঘাসের ওপর বসে অপেক্ষা করে। পুরুষ জোনাকির সংকেত এসে ধরা পড়ে তাদের চোখে। স্ত্রী জোনাকিরা তখন সেই সংকেতে সাড়া দেয় এবং নিজেরাও সংকেত পাঠায়। সেই সংকেত লক্ষ্য করে পুরুষ জোনাকি ছুটে যায় স্ত্রীর কাছে। এভাবেই ওদের বন্ধুত্ব হয়।

একটি স্ত্রী জোনাকি পোকা
ছবি: এআইয়ের সাহায্যে তৈরি

প্রশ্ন হলো, শত শত জোনাকির সংকেত থেকে স্ত্রী জোনাকি সঠিক পুরুষটাকে চিনে নেয় কীভাবে? আসলে প্রত্যেক প্রজাতির জোনাকির সংকেতের ধরন আলাদা। স্ত্রী জোনাকি তার নিজের প্রজাতির সংকেত চিনে নেয় এবং সাড়া দেয়। অন্য প্রজাতির আলোর সংকেতে তারা সাড়া দেয় না।

কিন্তু কখনো কখনো ঘটে এক ভয়ঙ্কর ঘটনা। কিছু স্ত্রী জোনাকি ছলনার আশ্রয় নেয়। তারা আলোর সংকেত বদলে ভিন্ন প্রজাতির পুরুষ জোনাকিকে বন্ধুত্বের মিথ্যা বার্তা পাঠায়। সেসব পুরুষ জোনাকি নিজেদের প্রজাতির স্ত্রী ভেবে ছুটে আসে বন্ধুত্বের আশায়। কিন্তু কাছে আসতেই তারা বুঝতে পারে, তাদের ঠকানো হয়েছে। স্ত্রী জোনাকি তখন পুরুষ জোনাকিকে ফাঁদে ফেলে খেয়ে ফেলে! একে বলে ফেম ফাটাল বা মরণঘাতী নারী। ফোটুরিস গণের স্ত্রী জোনাকিরা মূলত এ কাজ বেশি করে।

আরও পড়ুন
আসলে প্রত্যেক প্রজাতির জোনাকির সংকেতের ধরন আলাদা। স্ত্রী জোনাকি তার নিজের প্রজাতির সংকেত চিনে নেয় এবং সাড়া দেয়। অন্য প্রজাতির আলোর সংকেতে তারা সাড়া দেয় না।

জোনাকি আসলে বিটল বা গুবরে পোকা শ্রেণির পোকা। ইংরেজিতে এদের নাম ফায়ারফ্লাই, কিন্তু এরা মাছি বা ফ্লাই নয়। এদের আরও অনেক নাম আছে। যেমন, লাইটিং বাগ, গ্লো ওয়ার্ম, মুন বাগ ইত্যাদি। পৃথিবীর সব প্রজাতির পুরুষ জোনাকি উড়তে পারে, তবে অনেক প্রজাতির স্ত্রী জোনাকি উড়তে পারে না। এরা দেখতে অনেকটা লার্ভা বা শুঁয়োপোকার মতো। তবে এরা আলো জ্বালতে পারে। এদেরকে গ্লো ওয়ার্ম বলা হয়। এদের আলো পুরুষ জোনাকির চেয়েও শক্তিশালী হয়।

জোনাকি পোকা
ছবি: এআইয়ের সাহায্যে তৈরি

জোনাকির দেহকে তিনটি অংশে ভাগ করা যায়। মাথা, বুক ও পেট। জোনাকির মাথায় সামনের দিকে দুটি শুঁড় বা অ্যান্টেনা থাকে। জোনাকির তো আর মানুষের মতো নাক নেই, তাই এই শুঁড় দিয়েই ওরা গন্ধ শোঁকে এবং পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা পায়। মাথার দুপাশে দুটো বড় চোখ আছে, যা আসলে কয়েকশ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আলোক সংবেদী চোখ দিয়ে তৈরি। একে বলে পুঞ্জাক্ষি। বুকের অংশে আছে ছয়টি পা। পেছনের চার পা দিয়ে হাঁটাহাঁটি করে, আর সামনের পা দুটো অনেক সময় কোনো কিছু আঁকড়ে ধরতে সাহায্য করে। জোনাকির পেটের দিকে আছে বক্স লাইটের মতো সাদা একটি অংশ। সেখান থেকেই জোনাকি আলো জ্বালে।

জোনাকির বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ
ছবি: সংগৃহীত

জোনাকি যেহেতু বিটল শ্রেণির প্রাণী, তাই এর পিঠ শক্ত খোলস দিয়ে আবৃত। এই খোলস জোনাকিকে আঘাত থেকে রক্ষা করে। খোলসের নিচেই রয়েছে জোনাকির আসল পাখা। এমনিতে জোনাকি যখন বসে থাকে, তখন খোলস দুটি লেগে থাকে গায়ে গায়ে। ওড়ার সময় জোনাকির খোলস দুটো দুদিকে সরে যায় এবং ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে হালকা পাতলা দুটো পাখা। সেই পাখায় ভর দিয়েই উড়ে বেড়ায় জোনাকি। সারা দুনিয়ায় নানা রঙের জোনাকি আছে—হলুদ, বাদামি, সবুজ, ধূসর, লাল ইত্যাদি। প্রজাতিভেদে জোনাকির আলোর রংও ভিন্ন ভিন্ন হয়। সবুজ আলোর জোনাকি পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। তবে লাল ও হলুদ আলোর জোনাকিও আছে।

 

লেখক: সাংবাদিক

সূত্র: বিবিসি, লাইভ সায়েন্স ও ন্যাশনাল জিওগ্রাফি

আরও পড়ুন