খুশি থাকার তিন বৈজ্ঞানিক উপায়
পৃথিবীতে আমরা সবাই একটা জিনিসের পেছনেই তো হন্যে হয়ে ছুটছি—সুখ! কিন্তু মুশকিল হলো, এই সুখ জিনিসটা ঠিক কোথায় পাওয়া যায় বা কীভাবে মেলে, সেটা আমরা খুব একটা ভালো বুঝি না। মন খারাপ হলে আমরা হয়তো শপিং মলে গিয়ে রাজ্যের জিনিসপত্র কিনে ফেলি, অথবা বাসে-ট্রেনে অপরিচিত মানুষের সঙ্গে কথা বলা এড়িয়ে চলি। মজার ব্যাপার হলো, বিজ্ঞান বলছে, সুখ পাওয়ার জন্য আমরা সচরাচর যা যা করি, তার অনেকগুলোই আসলে কোনো কাজে আসে না। এমনকি, জোর করে সুখী হওয়ার চেষ্টা করলেও নাকি হিতে বিপরীত হতে পারে! চলুন, সুখ নিয়ে বিজ্ঞানীদের চমৎকার কিছু গবেষণার গল্প শোনা যাক।
তবে শুরুতে বলে রাখি, এটি কিন্তু কোনো ডাক্তারি পরামর্শ নয়। আপনার যদি বিষণ্ণতা বা মন খারাপের সমস্যা থাকে, তবে অবশ্যই একজন পেশাদার চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত।
বিজ্ঞান বলছে, সুখ পাওয়ার জন্য আমরা সচরাচর যা যা করি, তার অনেকগুলোই আসলে কোনো কাজে আসে না। এমনকি, জোর করে সুখী হওয়ার চেষ্টা করলেও নাকি হিতে বিপরীত হতে পারে!
অপরিচিত মানুষের সঙ্গে একটু আড্ডা দিয়ে দেখুন
আমরা মানুষ, স্বভাবগতভাবেই আমরা সমাজবদ্ধ জীব। কিন্তু নিজেদের এই স্বভাবটা আমরা নিজেরাই যেন ভুলে গেছি! ২০১৪ সালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় এবং ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই গবেষক, নিকোলাস এপলি এবং জুলিয়ানা শ্রোয়েডার একটি পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। তাঁরা বাসে বা ট্রেনে যাতায়াত করা কিছু যাত্রীকে তিনটি দলে ভাগ করেন। এক দলকে বলা হলো, যাত্রাপথে অপরিচিত কারও সঙ্গে গায়ে পড়ে গল্প জুড়ে দিতে। দ্বিতীয় দলকে বলা হলো, একদম চুপচাপ থাকতে। আর তৃতীয় দলকে তাদের স্বাভাবিক নিয়মে চলতে বলা হলো।
ফলাফল কী হলো জানেন? যারা অপরিচিত মানুষের সঙ্গে একটু গল্প জুড়ে দিয়েছিলেন, তাদের যাত্রাটা অন্য সবার চেয়ে অনেক বেশি আনন্দদায়ক হয়েছিল! সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, এই যাত্রীরা আগেই ধরে নিয়েছিলেন, অপরিচিত কারও সঙ্গে কথা বলতে গেলে তাদের বিরক্তই লাগবে।
২০২০ সালের আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়, আমরা অপরিচিতদের সঙ্গে কথা বলতে ভয় পাই কারণ আমরা ভাবি, সে যদি বিরক্ত হয়? যদি কথা চালিয়ে যেতে না পারি? কিংবা মানুষটা আমাকে নিয়ে কী ভাববে? কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, আমাদের এই ভয়গুলো একেবারেই অমূলক। তাই, মনটা একটু ভালো করতে চাইলে আজই বাসে, ট্রেনে বা লিফটে কোনো অপরিচিত মানুষের সঙ্গে দুটি কথা বলে দেখতে পারেন। গবেষণা অন্তত বলছে, আপনার মন ভালো হবেই!
এক দলকে বলা হলো, যাত্রাপথে অপরিচিত কারও সঙ্গে গায়ে পড়ে গল্প জুড়ে দিতে। দ্বিতীয় দলকে বলা হলো, একদম চুপচাপ থাকতে। আর তৃতীয় দলকে তাদের স্বাভাবিক নিয়মে চলতে বলা হলো।
টাকার চেয়ে সময়ের দাম বেশি
টাকা নাকি সুখ, এই তর্ক তো বহু পুরনো। বেশির ভাগ মানুষই মনে করেন, আরেকটু বেশি টাকা থাকলেই হয়তো তারা অনেক বেশি সুখী হতেন। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা। সুখের সঙ্গে টাকার চেয়েও বেশি সম্পর্ক রয়েছে সময়ের।
২০১৯ সালে সায়েন্স অ্যাডভান্সেস জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় প্রায় এক হাজার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর কাছে জানতে চাওয়া হয়, তারা জীবনের কোনটিকে বেশি গুরুত্ব দেন—সময় নাকি টাকা? এক বছর পর তাদের সঙ্গে আবার যোগাযোগ করা হয়। দেখা যায়, যারা টাকার চেয়ে সময়কে বেশি মূল্য দিয়েছিলেন, তারা অপেক্ষাকৃত বেশি সুখী জীবন কাটাচ্ছেন!
তার মানে এই নয় যে টাকা দিয়ে সুখ পাওয়া যায় না। টাকা অবশ্যই আপনাকে সুখী করতে পারে, যদি আপনি সেটা সঠিক জায়গায় খরচ করেন। ২০১৮ সালে হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল ও ইউসিএলএয়ের গবেষকরা বলছেন, টাকা দিয়ে জিনিসপত্র কিনলে তা দীর্ঘস্থায়ী সুখ দেয় না। বরং তিনটি জায়গায় টাকা খরচ করলে মানুষ সত্যিই আনন্দ পায়—অন্যের উপকারে, নতুন কোনো অভিজ্ঞতায় এবং সময় কেনায়। শেষেরটা শুনতে হয়তো একটু অদ্ভুদ লাগছে। বিষয়টা একটু বুঝিয়ে বলি। ধরুন, আপনি নিজের কোনো কাজ টাকার বিনিময়ে অন্য কাউকে দিয়ে করিয়ে নিলেন। এতে আপনি নিজে কিছুটা অবসর পেলেন। এটাই হলো সময় কেনা।
অবশ্য, আপনি যদি দৈনন্দিন খরচ চালাতেই হিমশিম খান, তবে এই সূত্র আপনার জন্য নয়। কিন্তু আপনার পকেটে যদি বাড়তি কিছু টাকা থাকে, তবে তা দিয়ে জিনিসপত্র না কিনে বরং কোনো সুন্দর অভিজ্ঞতা বা কিছুটা অবসর কিনে দেখতে পারেন।
২০১৮ সালে হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল ও ইউসিএলএয়ের গবেষকরা বলছেন, টাকা দিয়ে জিনিসপত্র কিনলে তা দীর্ঘস্থায়ী সুখ দেয় না। বরং তিনটি জায়গায় টাকা খরচ করলে মানুষ সত্যিই আনন্দ পায়।
সুখের পেছনে ছুটলে সুখ পালায়
শুনতে একটু অদ্ভুত লাগলেও সত্যি, জোর করে সুখী হওয়ার চেষ্টা করলে আপনার মন আরও বেশি খারাপ হতে পারে! সুখ এমন কোনো বস্তু নয় যে আপনি দৌড়ে গিয়ে ধরে ফেলবেন।
২০১১ সালের একটি গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখেন, যেসব মানুষ সুখী হওয়াকে জীবনের অনেক বড় লক্ষ্য হিসেবে দেখেন, তারা একটুতেই বেশি হতাশ হয়ে পড়েন। একটি পরীক্ষায় কিছু মানুষকে ল্যাবে বসিয়ে একটি সুন্দর, আনন্দের ভিডিও দেখানো হয়েছিল। কিন্তু তার আগে তাদের সুখের গুরুত্ব নিয়ে কিছু কথা পড়ে শোনানো হয়।
মজার ব্যাপার হলো, যাদের সুখী হওয়ার জন্য আগে থেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করা হয়েছিল, আনন্দের ভিডিওটি দেখার পর তারাই তুলনামূলক কম আনন্দ পেয়েছেন! কারণ, তারা প্রত্যাশা করেছিলেন এই ভিডিওটা তাদের প্রচণ্ড সুখী করে দেবে, কিন্তু বাস্তবে তা না হওয়ায় তারা হতাশ হয়েছেন।
২০১১ সালের একটি গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখেন, যেসব মানুষ সুখী হওয়াটাকে জীবনের অনেক বড় লক্ষ্য হিসেবে দেখেন, তারা একটুতেই বেশি হতাশ হয়ে পড়েন।
তাহলে উপায় কী? বিখ্যাত দার্শনিক জন স্টুয়ার্ট মিলের একটি কথা আছে, নিজের ব্যক্তিগত সুখের ওপর মনকে আটকে না রাখা। ২০১৭ সালে টরন্টো ও ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরাও একই সমাধান দিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, নিজের মানসিক অবস্থা বা আবেগকে জোর করে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করবেন না। মন খারাপ হলে সেটাকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিন। সব সময় আমাকে সুখী হতেই হবে, এমন চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেললেই বরং আপনি অনেক বেশি শান্তিতে থাকতে পারবেন।
দিনশেষে সুখ জিনিসটা আসলে কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য নয়, এটি চলার পথের ছোট ছোট মুহূর্ত। তাই অযথাই সুখের পেছনে হন্যে হয়ে না ছুটে, প্রতিদিনের ছোট ছোট অনুভূতিগুলোকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিলেই হয়তো আসল সুখের দেখা মিলবে।