খেলাধুলা করলে প্রাপ্তবয়স্করা বেশি সুস্থ থাকে, বলছে গবেষণা

বড়দের সুস্থ ও চিন্তামুক্ত থাকতে খেলার ভীষণ দরকার!ছবি: গেটি ইমেজ

ছোটবেলার কথা মনে আছে? যখন সারা দিন দৌড়ঝাঁপ, লুকোচুরি ও কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে যেতে কোনো ক্লান্তি ছিল না! কিন্তু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই খেলার সময় যেন কোথায় হারিয়ে যায়। আমরা সেই চঞ্চলতা ও কল্পনাশক্তির জায়গাটা পূরণ করে ফেলি রাজ্যের ব্যস্ততা ও গাম্ভীর্য দিয়ে। আমরা ধরে নিই, খেলাধুলা শুধু ছোটদের জন্য!

কিন্তু বিজ্ঞান বলছে অন্য কথা। শিশুদের যেমন শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য খেলাধুলা প্রয়োজন, ঠিক একইভাবে বড়দেরও সুস্থ ও চিন্তামুক্ত থাকতে খেলার ভীষণ দরকার!

বড়দের খেলা কেমন হবে

বড়দের খেলা মানেই কিন্তু মাঠে গিয়ে ছোটদের মতো দৌড়াদৌড়ি করা বা খেলনা নিয়ে বসা নয়। এটি আসলে বয়সের সঙ্গে রূপ বদলায়। বড়দের খেলা মানে দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ কাজগুলোর প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি।

বন্ধুদের সঙ্গে দারুণ কোনো জোকস বলে হাসাহাসি করাও কিন্তু বড়দের খেলা
ছবি: মিডজার্নির সাহায্যে তৈরি

বড়দের খেলা হতে পারে শারীরিক, সামাজিক, সৃজনশীল কিংবা পুরোটাই কল্পনার। হয়তো আপনি শখের বশে কোনো বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছেন, বন্ধুদের সঙ্গে দারুণ কোনো জোকস বলে হাসাহাসি করছেন, কোনো পাজল মেলাচ্ছেন বা শুধু নিজের আনন্দের জন্য কোনো একটা কাজ করছেন। এগুলো সবই কিন্তু বড়দের খেলা। কোনো কাজের নির্দিষ্ট কোনো ফলাফলের আশা না করে, শুধু কৌতূহল ও আনন্দ নিয়ে তাতে ডুবে যাওয়ার এই মানসিকতাই হলো আসল খেলা।

আরও পড়ুন
হয়তো আপনি শখের বশে কোনো বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছেন, কোনো পাজল মেলাচ্ছেন বা শুধু নিজের আনন্দের জন্য কোনো একটা কাজ করছেন। এগুলো সবই কিন্তু বড়দের খেলা।

খেললে আমাদের কী লাভ

গবেষণা বলছে, যেসব প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নিয়মিত এ ধরনের আনন্দদায়ক বা খেলাধুলামূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তাঁরা জীবনের চাপ অনেক ভালোভাবে সামলাতে পারেন। নিউজিল্যান্ডের কয়েকটি পরিবারের ওপর করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, রুটিনের বাইরের এসব খেলাধুলা বড়দের মানসিক চাপ তো কমায়ই, সেই সঙ্গে পরিবারের সবার মধ্যে সম্পর্কও দারুণ মজবুত করে।

বড়দের খেলার আরও কিছু জাদুকরী উপকারিতা রয়েছে। যেমন, কাজের চাপ থেকে মস্তিষ্ককে কিছুটা বিশ্রাম দেওয়ার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো খেলা। সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, বয়স্কদের মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য ভালো রাখতেও এর দারুণ প্রভাব রয়েছে।

আবেগ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে খেলাধুলা। এটি আমাদের আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা বাড়ায়। গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা কাজের ফাঁকে একটু আনন্দ বা খেলাধুলায় মাতেন, তাঁরা অন্যদের প্রতি অনেক বেশি সহানুভূতিশীল ও ইতিবাচক হন।

গবেষণায় দেখা গেছে, বয়স্কদের মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে খেলার দারুণ প্রভাব রয়েছে
ছবি: কিস্টোন হেলথ

খেলাধুলার একটা দারুণ ক্ষমতা হলো, এটি যেকোনো বয়সের ব্যবধান মুছে দিতে পারে। বড়রা যখন ছোটদের সঙ্গে খেলায় মেতে ওঠেন, তখন বয়স, পদবি বা সামাজিক মর্যাদার তফাতগুলো আর থাকে না। এটি দুই প্রজন্মের মধ্যে একটি সুন্দর সেতু তৈরি করে।

আরও পড়ুন
গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা কাজের ফাঁকে একটু আনন্দ বা খেলাধুলায় মাতেন, তাঁরা অন্যদের প্রতি অনেক বেশি সহানুভূতিশীল ও ইতিবাচক হন।

শহরগুলো কি বড়দের খেলার উপযোগী

সারা জীবনই যদি মানুষের খেলার প্রয়োজন থাকে, তবে আমাদের চারপাশের পরিবেশেরও তো সেভাবেই তৈরি হওয়া উচিত। কিন্তু খেয়াল করে দেখবেন, আমাদের চারপাশের পার্ক বা খেলার জায়গাগুলো শুধু শিশুদের কথা ভেবেই বানানো হয়।

শহরের কোনো এক কোণে রাখা মিউজিক্যাল সুইং, বড়দেরও একটু থেমে আনমনে খেলা করতে উৎসাহ জোগায়
ছবি: মিউজিক্যাল সুইং

নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, বড়দের জন্য সবচেয়ে ভালো খেলার পরিবেশ হলো, যেটি দেখতে ঠিক প্রথাগত খেলার মাঠের মতো নয়; বরং সাধারণ হাঁটাচলার পথেই খেলার উপাদান ছড়িয়ে থাকে। যেমন, রাস্তার পাশে বড় বড় সিঁড়ি, হাঁটার পথে একটু ভিন্ন রকম পাথরের ধাপ, কিংবা শহরের কোনো এক কোণে রাখা মিউজিক্যাল সুইং! এগুলো বড়দেরও একটু থেমে আনমনে খেলা করতে উৎসাহ জোগাবে। এ ধরনের নকশা এখনো খুব একটা দেখা যায় না, তবে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে এটি দারুণ পদক্ষেপ হতে পারে।

আরও পড়ুন
নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, বড়দের জন্য সবচেয়ে ভালো খেলার পরিবেশ হলো, যেটি দেখতে ঠিক প্রথাগত খেলার মাঠের মতো নয়; বরং সাধারণ হাঁটাচলার পথেই খেলার উপাদান ছড়িয়ে থাকে।

লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই!

আমাদের সমাজে বড়দের খেলাধুলাকে অনেক সময় লজ্জাজনক বা বেমানান হিসেবে দেখা হয়। এমন মানসিকতার কারণে অনেকেই নিজের ভেতরে থাকা সেই চঞ্চল শিশুটাকে লুকিয়ে রাখেন। কিন্তু যেদিন থেকে আমরা বুঝব, বড়দের খেলাধুলা কোনো অপরাধ বা লজ্জার বিষয় নয়, সেদিন থেকে আমাদের চারপাশের পরিবেশটা আরও অনেক বেশি সজীব ও আনন্দময় হয়ে উঠবে।

তাই জীবনের এই যান্ত্রিক ব্যস্ততার মাঝে নিজের আনন্দের জন্য একটু সময় বের করুন। কারণ, সুস্থ থাকতে হলে শুধু ছোটদের নয়, আপনারও খেলার দরকার আছে!

লেখক: সহকারী শিক্ষক, গণিত বিভাগ, পদ্মা ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, শরীয়তপুর

সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট

আরও পড়ুন