অর্থসহায়তা বন্ধ হওয়ার পর জাম্বিয়ায় আবারও ফিরেছে এইডস
দেশে হাম ও হামের উপসর্গে গত ১৫ মার্চ থেকে ১৪ মে পর্যন্ত মোট ৪৩৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ৫৪ হাজার ৪১৯ শিশুর। এ সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩৯ হাজার ১৬০ শিশু। তবে এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে ফিরেছে ৩৪ হাজার ৯৬৮ শিশু। এছাড়া ৭ হাজার ৩০৫ শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে বলেও উল্লেখ করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
জনস্বাস্থ্যবিদেরা বলছেন, টিকা প্রাপ্তির ঘাটতি, অ্যাকটিভ ক্যাম্পেইনের অভাব এবং যথাযথভাবে অর্থ বরাদ্দ না হওয়ায় হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। অর্থ বরাদ্দ সঠিকভাবে না হলে কী হতে পারে, তার একটি বড় উদাহরণ হতে পারে জাম্বিয়ায় এইডস ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা। ইউএসএআইডির ফান্ড বন্ধ হওয়ার পর জাম্বিয়ায় যেভাবে এইডস আবার ফিরে এসেছে, তা নিয়েই আমাদের আজকের এই লেখা।
উত্তর জাম্বিয়ার তামাখনি অঞ্চলের ছোট্ট শহর এমপংওয়ে। শহরের মিশন হাসপাতালের পুরুষ ওয়ার্ডে মার্চের এক সকালে নিঃশব্দে মারা যান সাউলো কাসেকেলা। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র সাইত্রিশ বছর। পেশায় তিনি ছিলেন একজন নিরাপত্তারক্ষী। মৃত্যুর দুই দিন আগে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল।
তাঁর বুকের এক্সরের ছবিটি পরে আলাদা করে রেখে দিয়েছিলেন এক নার্স। দেখা গেছে, সাদা-কালো এই ছবিতে ফুসফুস যেন মেঘে ঢেকে গেছে। যক্ষ্মা পুরো বুক গ্রাস করে ফেলেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ৫৪ হাজার ৪১৯ শিশুর। এ সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩৯ হাজার ১৬০ শিশু।
বহুদিন চিকিৎসাহীন অবস্থায় ছিলেন তিনি। এইচআইভি সংক্রমণের কারণেই তাঁর বুকের এক্সরের এমন চিত্র পাওয়া গেছে। এক্সরের সঙ্গে চিকিৎসকের হাতে লেখা ছোট্ট একটি নোট ছিল, যেখানে লেখা, এই ছবিটা চিকিৎসাশিক্ষার্থীদের জন্য সংরক্ষণ করতে হবে।
যেদিন কাসেকেলা মারা গেলেন, সেদিন ওয়ার্ডে ছিল মোট আটজন রোগী। এর মধ্যে চারজনেরই এইডস ছিল। এদেরই একজন তেত্রিশ বছরের লুইস চিফুতা। বিছানায় কঙ্কালসার শরীর নিয়ে পড়ে ছিলেন তিনি। জ্বরে কাঁপছিলেন। পাশে এসে দাঁড়ানো ভাইবোনদেরও ঠিকমতো চিনতে পারছিলেন না।
মাত্র এক বছর আগেও এই হাসপাতালে এমন রোগী মাসে একজন কিংবা দুজন পাওয়া যেত। কিন্তু ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এমন রোগী এসেছে আঠাশজন। ফেব্রুয়ারিতে আরও আঠাশজন। মার্চেও এসেছে সাতজন।
হুট করেই এই পরিবর্তন এসেছে শহরটিতে। এর পেছনে আছে এমন এক সিদ্ধান্ত, যা কয়েক দশক ধরে তৈরি হওয়া জাম্বিয়ার স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে হঠাৎ নাড়িয়ে দিয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা কার্যক্রমে বড় পরিবর্তন আসে। প্রথম মাসেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন, বৈশ্বিক বেশ কিছু সহায়তা কর্মসূচি বন্ধ করা হবে। এর মধ্যে আছে বিশ্বের অন্যতম বড় এইচআইভি সহায়তা কর্মসূচিও। বড় বাজেট কাটের কারণে ওলট-পালট হয়ে গেছে পুরো ব্যবস্থা।
বহু বছর ধরে জাম্বিয়ায় এই কর্মসূচি লাখো মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে। সেটার অর্থায়ন বাতিল করার ফলে জাম্বিয়া সরকার জরুরি অবস্থার মতো পরিস্থিতিতে পড়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সহায়তা না থাকায় মানুষের হাতে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
যেদিন কাসেকেলা মারা গেলেন, সেদিন ওয়ার্ডে ছিল মোট আটজন রোগী। এর মধ্যে চারজনেরই এইডস ছিল। এদেরই একজন তেত্রিশ বছরের লুইস চিফুতা।
জাম্বিয়া সরকার শেষ পর্যন্ত ওষুধ সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হতে দেয়নি। কিন্তু ভাইরাসের বিস্তার ঠেকানোর জন্য যে বহুরকম ব্যবস্থা ছিল, সেগুলো অনেকটাই বন্ধ হয়ে গেছে। এসব ব্যবস্থাই সাউলো কাসেকেলার মতো মানুষদের বাঁচিয়ে রাখত।
এখন জাম্বিয়ার স্বাস্থ্যব্যবস্থা অনেক ছোট হয়ে গেছে। ছোট পরিসরে একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা টিকে আছে। যুক্তরাষ্ট্র গত ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছিল যে নতুন এক স্বাস্থ্য চুক্তিতে সই করতে হবে জাম্বিয়াকে। সেই চুক্তিতে জাম্বিয়া স্বাক্ষর করেনি। কারণ এর সঙ্গে যুক্ত আছে দেশটির খনিজ সম্পদে যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত প্রবেশাধিকার।
যুক্তরাষ্ট্র বলছে, এই চুক্তি হলে পাঁচ বছরের অর্থায়ন নিশ্চিত হবে এবং জাম্বিয়া নিজের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর আরও নিয়ন্ত্রণ পাবে। কিন্তু জাম্বিয়ার কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলছেন, চুক্তি না হলে যদি পুরো সহায়তাই বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে। তবে জাম্বিয়ার কর্মকর্তারা চুক্তি নিয়ে আলাপে আগ্রহী।
এখন এমপংওয়ের হাসপাতালগুলোতে যে দৃশ্য দেখা যাচ্ছে, সেটা অনেকটা ৩০ বছর আগের জাম্বিয়ার মতো। তিন দশক আগে জাম্বিয়ার এইডস আক্রান্ত তরুণ-তরুণীদের দিয়ে হাসপাতালগুলো ভর্তি থাকত। তাঁরা যন্ত্রণায় মারা যেত। এইচআইভি ও এইডস মহামারি পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলেছিল। তখন দেশের গড় আয়ু নেমে এসেছিল মাত্র সাইত্রিশ বছরে।
তারপর ২০০৩ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের প্রশাসন শুরু করে ইতিহাসের অন্যতম বড় মানবিক স্বাস্থ্য কর্মসূচি। প্রেসিডেন্টস ইমারজেন্সি প্ল্যান ফর এইডস রিলিফ নামে একটি কর্মসূচি চালু করা হয়, যাকে সংক্ষেপে বলে পেপফার। জাম্বিয়া ছিল সেই কর্মসূচির অন্যতম প্রধান দেশ।
এখন এমপংওয়ের হাসপাতালগুলোতে যে দৃশ্য দেখা যাচ্ছে, সেটা অনেকটা ৩০ বছর আগের জাম্বিয়ার মতো। তিন দশক আগে জাম্বিয়ার এইডস আক্রান্ত তরুণ-তরুণীদের দিয়ে হাসপাতালগুলো ভর্তি থাকত।
তখন উন্নত দেশগুলোতে অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল ওষুধ এইডসকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এনেছিল। কিন্তু সেই ওষুধের দাম এত বেশি ছিল যে আফ্রিকার প্রায় কেউই তা পেত না। পেপফার সেই চিত্র বদলে দেয়। লাখ লাখ মানুষ বিনা মূল্যে ওষুধ পেতে শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্র পরীক্ষাগার, ক্লিনিক, তথ্যব্যবস্থা ও সরবরাহ নেটওয়ার্কব্যবস্থা তৈরি করে দেয়। নতুন সংক্রমণের হার কমতে থাকে। জাম্বিয়ার গড় আয়ু আবার বেড়ে দাঁড়ায় সাতষট্টি বছরে।
কিন্তু গত বছর পরিস্থিতি আবার বদলে গেছে। বিদেশি সহায়তা পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে ট্রাম্প প্রশাসন এইচআইভি কর্মসূচির অর্থায়ন বন্ধ করে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা উত্তর জাম্বিয়ায় স্থানীয় বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে এই কর্মসূচি চালাত। সেই অঞ্চলেই এইচআইভির সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি। অর্থ বন্ধ হতেই একের পর এক সংগঠন হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়।
জাম্বিয়ার স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জরুরি বৈঠক করেন। প্রাদেশিক কার্যালয়গুলোতে বার্তা পাঠানো হয়, যেভাবেই হোক ওষুধ সরবরাহ চালু রাখতে হবে। তাঁরা শেষ পর্যন্ত অধিকাংশ চিকিৎসাকেন্দ্র চালু রাখতে পেরেছেন। প্রায় ১৩ লাখ মানুষ এখনো ওষুধ পাচ্ছে। কিন্তু সেই ব্যবস্থা আসলে ভেতর থেকে ভেঙে পড়ছে। কারণ, প্রতিরোধমূলক কর্মসূচিগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। পরীক্ষাও কমে গেছে। ফলে নতুন সংক্রমণ কত দ্রুত বাড়ছে, তা সরকার নিশ্চিতভাবে এখন আর জানে না।
আগে কেউ এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়েছে, পরীক্ষায় এমনটা ধরা পড়লে তাঁর যৌনসঙ্গীদের খুঁজে বের করে পরীক্ষা করা হতো। সংক্রমিত হলে তাঁদের চিকিৎসাও শুরু করা হতো। প্রতিবছর শনাক্ত হওয়া সংক্রমণের সত্তর শতাংশই এই ব্যবস্থায় ধরা পড়ত। এখন সেটি বন্ধ।
যুক্তরাষ্ট্র পরীক্ষাগার, ক্লিনিক, তথ্যব্যবস্থা ও সরবরাহ নেটওয়ার্কব্যবস্থা তৈরি করে দেয়। নতুন সংক্রমণের হার কমতে থাকে। জাম্বিয়ার গড় আয়ু আবার বেড়ে দাঁড়ায় সাতষট্টি বছরে।
আগে গর্ভবতী এইচআইভি আক্রান্ত নারীদের গর্ভকালীন তিনবার ভাইরাসের মাত্রা পরীক্ষা করা হতো। এখন হয় মাত্র একবার। আক্রান্ত মায়ের শিশুর জন্মের পরপরই নির্ভুল জিনগত পরীক্ষা করা হতো। এখন সেই পরীক্ষা হয় ছয় সপ্তাহ পরে। আগে যেকোনো রোগে চিকিৎসা নিতে এলেই মানুষকে এইচআইভি পরীক্ষা করা হতো। এখন পরীক্ষা হয় শুধু যাঁরা নিজেরা চান, কিংবা যাঁদের যক্ষ্মা বা যৌনরোগের উপসর্গ আছে।
আগে নতুন সংক্রমণের জিনগত বিশ্লেষণ করে বোঝা হতো, কোথায় ভাইরাস দ্রুত ছড়াচ্ছে। কোনো ট্রাক চলাচলের রুট বা খনির শহরে হঠাৎ সংক্রমণ বাড়লে বিশেষ দল পাঠানো হতো। এখন সেই ব্যবস্থাও বন্ধ।
আগে বাজার, গির্জা কিংবা কমিউনিটি কেন্দ্র থেকেই মানুষ গোপনে ও সহজে ওষুধ নিতে পারত। এখন সেসব কেন্দ্র নেই। আগে কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীরা রোগীদের ফোন করতেন, বাড়িতে যেতেন, খোঁজ নিতেন। তাঁদের বেশির ভাগই এখন চাকরি হারিয়েছেন। যৌনকর্মী বা সমাজে বৈষম্যের শিকার মানুষের জন্য আলাদা নিরাপদ সেবাকেন্দ্র ছিল। সেগুলোও বন্ধ হয়ে গেছে। কিশোরীদের জন্য ছিল আলাদা শিক্ষা ও প্রতিরোধ কর্মসূচি। বহু বছর ধরে এই বয়সী মেয়েরাই ছিল সবচেয়ে ঝুঁকিতে। সেই কর্মসূচিও আর নেই।
প্রতিবছর এক লাখের বেশি পুরুষকে বিনা মূল্যে খৎনা করা হতো, কারণ এতে সংক্রমণের ঝুঁকি কমে। সেটিও বন্ধ হয়ে গেছে। আগে যে ভ্রাম্যমাণ দল রোগীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ওষুধ পৌঁছে দিত, সেই দল আর নেই। এই পরিবর্তনের প্রভাব এখন হাসপাতালের বিছানায়, ক্লিনিকের করিডরে, কাগজের ফাইলে, এমনকি নবজাতকের কান্নাতেও দেখা যাচ্ছে। অনেক রোগী এখন চিকিৎসার বাইরে চলে গেছেন। এখন নিয়ন্ত্রণহীন এইচআইভির ভয়াবহ লক্ষণ নিয়ে তাঁরা আবার হাসপাতালে ফিরছেন।
আগে নতুন সংক্রমণের জিনগত বিশ্লেষণ করে বোঝা হতো, কোথায় ভাইরাস দ্রুত ছড়াচ্ছে। কোনো ট্রাক চলাচলের রুট বা খনির শহরে হঠাৎ সংক্রমণ বাড়লে বিশেষ দল পাঠানো হতো।
দেশটির জাতীয় এইচআইভি কর্মসূচির প্রধান লয়েড মুলেঙ্গা স্বীকার করেছেন, সংক্রমণ বেড়েছে, মৃত্যু বেড়েছে, কষ্টও বেড়েছে। তবু তিনি আশা ছাড়ছেন না। তিনি মনে করেন, নতুন প্রতিরোধমূলক ওষুধ হয়তো আবার পরিস্থিতি বদলাতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি ইনজেকশন লেনাকাপাভির। এই ওষুধের এক ডোজ ছয় মাস পর্যন্ত সুরক্ষা দেয়।
এখনো সীমিত আকারে যুক্তরাষ্ট্র কিছু সহায়তা দিচ্ছে। তবে ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। গ্লোবাল ফান্ড থেকে জাম্বিয়া সহায়তা পাচ্ছে বটে, কিন্তু সেই তহবিলও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। এর বাজেটও কমেছে। চুক্তি হওয়া নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা গেছে। চুক্তি না হলে জাম্বিয়াকেই ওষুধ কেনা, পরীক্ষাগারের রাসায়নিক আনা এবং সরবরাহব্যবস্থা চালানোর দায়িত্ব নিতে হবে। অথচ দেশটি এখনো এর জন্য প্রস্তুত নয়।
এইডস প্রতিরোধের জন্য যদি প্রয়োজনীয় সামগ্রীর বর্তমান মজুত শেষ হয়ে যায় এবং নতুন চালান না আসে, তাহলে এরপর কী হবে, তা স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা ভাবতেও পারেন না। এমন হলে মৃত্যু ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট থাকবে না।