ব্যায়াম করার সময় হার্টরেট সর্বোচ্চ কত থাকা নিরাপদ
জিমনেসিয়ামে গিয়ে ট্রেডমিল বা এক্সারসাইজ বাইকে ওঠার অভিজ্ঞতা হয়তো আপনার আছে! কোথাও কি একটা হিসাব লেখা দেখেছেন? হিসাবটি হলো, ব্যায়াম করার সময় আপনার হার্টবিট সর্বোচ্চ কত হওয়া নিরাপদ? সূত্র হলো, ২২০ থেকে আপনার বয়স বাদ দিন। মানে আপনার বয়স ৩০ বছর হলে হার্টবিট ২২০ – ৩০ = ১৯০ পর্যন্ত হওয়া স্বাভাবিক। বিদেশের জিমনেসিয়ামে এটা দেখা যায়।
এই জাদুকরী সূত্রটিকে আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন এবং ব্রিটিশ হার্ট ফাউন্ডেশনের মতো বড় বড় সংস্থাও স্বীকৃতি দিয়েছে। এই হিসাব অনুযায়ী, ৫০ বছর বয়সী একজন মানুষের সর্বোচ্চ হার্টরেট হওয়া উচিত মিনিটে ১৭০ বিট। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, একই বয়সের দুজন মানুষের সর্বোচ্চ হার্টরেটে আকাশ-পাতাল তফাত থাকতে পারে। তাই এত সহজ কোনো সূত্র দিয়ে সবার হার্টরেট মাপা সম্ভব নয়!
নিয়মিত ব্যায়াম করলে আমরা আমাদের বিশ্রামের সময়কার হৃৎস্পন্দন কমাতে পারি ঠিকই, কিন্তু সর্বোচ্চ হার্টরেটকে চাইলেই পরিবর্তন করা যায় না।
সর্বোচ্চ হার্টরেট জানাটা কেন জরুরি
ব্যায়ামের নিখুঁত পরিকল্পনা করার জন্য সর্বোচ্চ হার্টরেট জানা খুব দরকারি। আপনি যদি সর্বোচ্চ হার্টরেটের ৭০ ভাগের মধ্যে থেকে ব্যায়াম করেন, তবে তা আপনার অক্সিজেনের সাহায্যে কাজ করার ক্ষমতা বাড়াবে। আর এর চেয়ে বেশি হলে ব্যায়ামগুলো আপনার অক্সিজেন ছাড়া শক্তি উৎপাদনের ফিটনেস বাড়াতে সাহায্য করে।
নিয়মিত ব্যায়াম করলে আমরা আমাদের বিশ্রামের সময়কার হৃৎস্পন্দন কমাতে পারি ঠিকই, কিন্তু সর্বোচ্চ হার্টরেটকে চাইলেই পরিবর্তন করা যায় না। ব্যায়ামের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের হার্ট বেশি মাত্রায় স্পন্দিত হতে থাকে, যাতে পেশিগুলোতে বেশি অক্সিজেনযুক্ত রক্ত পৌঁছাতে পারে। কিন্তু এরও একটা সীমা আছে।
হার্টের বিটগুলো যখন খুব দ্রুত হতে থাকে, তখন একটি বিট এবং পরের বিটের মাঝখানের সময়টা এতই কমে যায় যে, হার্টের প্রকোষ্ঠগুলো নতুন করে রক্তে পূর্ণ হওয়ার সময় পায় না। ফলে প্রতি স্পন্দনে আগের চেয়ে কম রক্ত পাম্প হয়। হার্টের নিজস্ব প্রাকৃতিক পেসমেকার সাইনোঅ্যাট্রিয়াল নোডই সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করে দেয়। এই নোডের কোষগুলো একটি নির্দিষ্ট গতির চেয়ে বেশি দ্রুত বৈদ্যুতিক সংকেত পাঠাতে পারে না। এ কারণেই আমাদের হৃৎস্পন্দনেরও একটা সর্বোচ্চ সীমা থাকে।
হার্টের বিটগুলো যখন খুব দ্রুত হতে থাকে, তখন একটি বিট এবং পরের বিটের মাঝখানের সময়টা এতই কমে যায় যে, হার্টের প্রকোষ্ঠগুলো নতুন করে রক্তে পূর্ণ হওয়ার সময় পায় না।
১৯৭১ সালের সেই নড়বড়ে সূত্র
বেশির ভাগ মানুষই নিজের সত্যিকারের সর্বোচ্চ হার্টরেট জানেন না। অ্যাথলেট বা খেলোয়াড়দের এই সর্বোচ্চ সীমা মাপার জন্য তাদের একেবারে শেষ সীমা পর্যন্ত পরীক্ষা করা হয়, যা কেবল ডাক্তারদের কড়া নজরদারিতেই সম্ভব। তাই সাধারণ মানুষ নিজেদের বয়সের ওপর ভিত্তি করে ওই গাণিতিক সূত্রটিই ব্যবহার করেন। গবেষণায় দেখা গেছে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হার্টের পেসমেকারের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ কমে যায়। ফলে সর্বোচ্চ হার্টরেটও নিচে নেমে আসে।
কিন্তু ওই যে ‘২২০ মাইনাসের বয়স’ সূত্রটির কথা বললাম, সেটি কোথা থেকে এল? এটি মূলত ১৯৭১ সালের একটি গবেষণাপত্র থেকে এসেছে। আধুনিক বিজ্ঞানের মানদণ্ডে এই সূত্রের ভিত্তি খুবই নড়বড়ে! ওই পুরোনো গবেষণায় বিভিন্ন জায়গা থেকে পাওয়া তথ্য কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম না মেনেই একসঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। এমনকি কোনো সঠিক পরিসংখ্যানগত মডেল ব্যবহার না করে, শুধু চোখের আন্দাজে সূত্রটি দাঁড় করানো হয়! তা সত্ত্বেও এটি একসময় ব্যায়াম-বিজ্ঞানের এক অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়ে যায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হার্টের পেসমেকারের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ কমে যায়। ফলে সর্বোচ্চ হার্টরেটও নিচে নেমে আসে।
নতুন সূত্র এবং ব্যক্তিগত ভিন্নতা
সাম্প্রতিক দশকগুলোতে আরও নিখুঁত পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে হওয়া নতুন গবেষণাগুলো বলছে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হার্টরেট কমে যাওয়ার হার ১৯৭১ সালের ওই সূত্রের চেয়ে বেশ ধীর।
এর একটি জনপ্রিয় বিকল্প হলো তানাকা ইকুয়েশন। ২০০১ সালে জার্নাল অব দ্য আমেরিকান কলেজ অব কার্ডিওলজি-তে প্রথম এটি প্রকাশিত হয়। এই সূত্র অনুযায়ী, সর্বোচ্চ হার্টরেট বের করতে হলে আপনার বয়সের সঙ্গে ০.৭ গুণ করে, সেই গুণফলকে ২০৮ থেকে বাদ দিতে হবে। অর্থাৎ ২০৮ - ০.৭ × বয়স। এই হিসাবে একজন ৫০ বছর বয়সী মানুষের সর্বোচ্চ হার্টরেট হবে ১৭৩।
তবে এই নতুন সূত্রগুলোও মানুষের ব্যক্তিগত শারীরিক ভিন্নতা ধরতে ব্যর্থ হয়েছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে প্লাস ওয়ান জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ২৩০ জন মানুষের ওপর সাতটি ভিন্ন ভিন্ন সূত্র প্রয়োগ করে দেখা হয়। দেখা যায়, এই গাণিতিক হিসাবগুলো অনেক সময়ই আসল হার্টরেটের চেয়ে মিনিটে প্রায় ২০ বিট পর্যন্ত কম বা বেশি ফলাফল দিচ্ছে! এই বিশাল ভুলের মানে, একটি সূত্র হয়তো বলছে একজন ৫০ বছর বয়সীর জন্য এটি একটি মাঝারি ব্যায়াম, অথচ বাস্তবে সেটি হয়তো তার জন্য একটি চরম ঝুঁকিপূর্ণ ও তীব্র ব্যায়াম হয়ে দাঁড়াচ্ছে!
তাহলে উপায় কী
সাধারণ মানুষ বা শৌখিন অ্যাথলেটরা এখন কী করবেন? অধ্যাপক রবার্গসের মতে, আসল চাবিকাঠি হলো ধারাবাহিকতা। যেকোনো একটি পদ্ধতি বা সূত্র বেছে নিন এবং সব সময় সেটিই অনুসরণ করুন। এতে আপনি অন্তত বুঝতে পারবেন, আপনার বেছে নেওয়া ব্যায়ামের পদ্ধতিটি কাজ করছে কি না। আর কাজ না করলে সে অনুযায়ী পরিবর্তনও আনতে পারবেন।