ব্যায়াম করেও কেন অনেকের ওজন কমে না
জিমে গিয়ে ট্রেডমিলে দৌড়াচ্ছেন, দরদর করে ঘাম ঝরছে। মেশিনের ডিসপ্লের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, ৫০০ ক্যালরি বার্ন করে ফেলেছেন। মনে মনে হয়তো ধরেই নিলেন, এবার ওজন না কমে যাবে কোথায়? কিন্তু সপ্তাহ শেষে ওজন মাপার যন্ত্রে দাঁড়িয়ে দেখলেন, ওজন তেমন কমেনি। মেজাজটা তখন কেমন লাগে?
এমন ঘটনা কিন্তু শুধু আপনার একার সঙ্গে ঘটছে না। বিজ্ঞান বলছে, ওজন কমানোর জন্য ব্যায়াম বা এক্সারসাইজ আসলে অতটা কার্যকর নয়, যতটা আমরা ভাবি। যুক্তরাষ্ট্রের ডিউক ইউনিভার্সিটির গবেষক হারমান পন্টজার এবং এরিক ট্রেক্সলারের সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে এর পেছনের আসল কারণ।
পন্টজারের মতে, আমাদের শরীরটা আসলে বড্ড হিসেবি। আপনি যখন ব্যায়াম করে বাড়তি ক্যালরি পোড়ান, শরীর তখন ভাবে, অনেক শক্তি খরচ হয়ে গেল! এখন অন্য জায়গা থেকে খরচ কমাতে হবে।
১৪টি ভিন্ন গবেষণা ও প্রায় ৪৫০ জন মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে অদ্ভুত এক তথ্য। ধরুন, আপনি ব্যায়াম করে ২০০ ক্যালরি খরচ করলেন। অঙ্ক বলে, আপনার মোট শক্তি খরচ ২০০ ক্যালরি বাড়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে বাড়ে মাত্র ৬০ ক্যালরি! বাকি ১৪০ ক্যালরি শরীর ম্যানেজ করে নেয় অন্য জায়গা থেকে কমিয়ে।
পন্টজারের মতে, আমাদের শরীরটা আসলে বড্ড হিসেবি। আপনি যখন ব্যায়াম করে বাড়তি ক্যালরি পোড়ান, শরীর তখন ভাবে, অনেক শক্তি খরচ হয়ে গেল! এখন অন্য জায়গা থেকে খরচ কমাতে হবে।
অনেকে ভাবেন, ‘কম খাব আর বেশি দৌড়াব, তাহলে তো চর্বি গলবেই।’ এখানেই বড় ভুলটা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা ডায়েট করার পাশাপাশি ব্যায়ামও করেন, তাঁদের শরীর আরও বেশি কৃপণ হয়ে যায়। শরীর তখন তার বিপাকক্রিয়া কমিয়ে দেয়, ঘুমের মধ্যেও শক্তি খরচ কমিয়ে দেয়। ফলাফল? আপনি জিমে যেটুকু বাড়তি ক্যালরি পোড়ালেন, শরীর অন্যদিক থেকে খরচ কমিয়ে সেটা পুরোপুরি উসুল করে নেয়। অর্থাৎ, নেট রেজাল্ট শূন্য!
পন্টজার তানজানিয়ার হাদজা উপজাতির মানুষদের ওপর গবেষণা করেছিলেন। এরা সারাদিন শিকার করে, বনে-বাদাড়ে ছোটাছুটি করে। কিন্তু অবাক কাণ্ড! সারাদিন ডেস্কে বসে কাজ করা একজন আধুনিক মানুষের চেয়ে তাদের মোট শক্তি খরচ খুব একটা বেশি নয়। প্রাকৃতিক পরিবর্তনের ফলেই আমাদের শরীর এমনভাবে তৈরি হয়েছে, যাতে সে যেকোনো পরিস্থিতিতে শক্তি জমিয়ে রাখতে পারে।
গবেষণায় একটা মজার তফাত পাওয়া গেছে। দৌড়ঝাঁপ করলে শরীর দ্রুত কম্পেনসেশন মোডে চলে যায়। কিন্তু ওয়েট লিফটিং বা ভারোত্তোলনের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা একটু আলাদা। দেখা গেছে, ওয়েট লিফটিং করলে ক্যালরি খরচ প্রত্যাশার চেয়ে একটু বেশিই হয়। কারণ, ভারী ওজন তুললে পেশি বা মাসলে যে ধকল যায়, তা মেরামত করতে শরীরের বাড়তি শক্তি লাগে। তবে পন্টজার সাবধান করে দিয়েছেন, এতে পেশি গঠিত হয় ঠিকই, কিন্তু চর্বি কমার হার খুব একটা আহামরি নয়। তাই ওজন কমানোর জন্য এটাও জাদুকরী কোনো সমাধান নয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, যারা ডায়েট করার পাশাপাশি ব্যায়ামও করেন, তাঁদের শরীর আরও বেশি কৃপণ হয়ে যায়। শরীর তখন তার বিপাকক্রিয়া কমিয়ে দেয়, ঘুমের মধ্যেও শক্তি খরচ কমিয়ে দেয়।
তাহলে উপায়? যুক্তরাজ্যের বাথ ইউনিভার্সিটির ডিলান থম্পসন বা হাভিয়ের গঞ্জালেজের মতো গবেষকেরা বলছেন, হয়তো মানুষ ব্যায়াম করার পর বাকি সময়টা বেশি বিশ্রাম নেয় বা অলস হয়ে পড়ে বলেই ক্যালরি খরচ কম দেখায়। এ নিয়ে আরও গবেষণার দরকার। তবে সবাই যে এক বাক্যে এই তত্ত্ব মেনে নিয়েছেন তা-ও নয়।
ব্যায়াম যদি ওজন কমাতে খুব একটা সাহায্য না-ই করে, তবে উপায় কী? হার্ভার্ড হেলথ এবং মায়ো ক্লিনিকের বিশেষজ্ঞদের মতে, ওজন কমানোর সমীকরণে ব্যায়ামের চেয়ে খাদ্যাভ্যাসের ভূমিকা অনেক বেশি।
ওজন কমানোর মূল চাবিকাঠি হলো ক্যালরি ডেফিসিট। অর্থাৎ আপনি সারা দিনে যে পরিমাণ ক্যালরি পোড়ান, তার চেয়ে কম ক্যালরি গ্রহণ করতে হবে। দৌড়ে ৫০০ ক্যালরি পোড়ানোর চেয়ে এক বেলা ফাস্ট ফুড বা মিষ্টি না খেয়ে ৫০০ ক্যালরি শরীরে ঢুকতে না দেওয়া অনেক বেশি সহজ ও কার্যকর।
ব্যায়াম ওজন কমাতে সরাসরি জাদুর মতো কাজ না করলেও, ওজন ধরে রাখতে বা মেইনটেইন করতে এর জুড়ি নেই। একবার ডায়েট করে ওজন কমানোর পর সেই ওজন যাতে আর না বাড়ে, তার জন্য নিয়মিত ব্যায়াম জরুরি।
মোদ্দাকথা হলো, শরীর সুস্থ রাখতে ব্যায়ামের বিকল্প নেই। হার্ট ভালো রাখতে, রোগবালাই দূরে রাখতে দৌড়ঝাঁপ চালিয়ে যান। কিন্তু যদি উদ্দেশ্য হয় শুধুই ওজন কমানো, তবে ব্যায়াম করে হয়তো অনেক ওজন কমানো সম্ভব হবে না!