বাবার গায়ের গন্ধ নবজাতকের মস্তিষ্কে যে প্রভাব ফেলে
মায়ের গায়ের গন্ধ চিনে নেওয়ার অদ্ভুত এক ক্ষমতা নিয়ে শিশুরা জন্মায়। পৃথিবীর আলো দেখার আগে, মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থাতেই তারা মায়ের গন্ধের সঙ্গে পরিচিত হয়ে যায়। কিন্তু বাবার গন্ধের বেলায় কী ঘটে? নতুন জন্ম নেওয়া একটি শিশু কি তার বাবার গায়ের গন্ধ আলাদা করে চিনতে পারে? এই কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা এক চমকপ্রদ তথ্য আবিষ্কার করেছেন। বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স অ্যাডভান্সেস-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক একটি গবেষণা বলছে, বাবার গায়ের গন্ধও নবজাতকের মস্তিষ্কে দারুণ প্রভাব ফেলে।
এই চমৎকার গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের ইনস্টিটিউট ফর লার্নিং অ্যান্ড ব্রেইন সায়েন্সেসের গবেষক ইয়ারা এন্ডেভেল্ট-শাপিরা। তাঁর গবেষণার মূল বিষয় অলফ্যাকশন। মানে আমাদের ঘ্রাণশক্তি কীভাবে কাজ করে, তা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করাই তাঁর কাজ। আপনি হয়তো খেয়াল করেছেন, মানুষের ঘ্রাণশক্তি অনেক সময় অবচেতনভাবেই আমাদের অনুভূতির সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। শাপিরার মতে, শরীরের এই স্বাভাবিক গন্ধ মানুষের একধরনের ননভার্বাল ল্যাঙ্গুয়েজ। আমরা মুখে কোনো কথা না বলেও কেবল গায়ের গন্ধের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে প্রতিনিয়ত নানা তথ্য আদান-প্রদান করি।
শাপিরার মতে, শরীরের স্বাভাবিক গন্ধ মানুষের একধরনের ননভার্বাল ল্যাঙ্গুয়েজ। আমরা মুখে কোনো কথা না বলেও কেবল গায়ের গন্ধের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে প্রতিনিয়ত নানা তথ্য আদান-প্রদান করি।
এর আগে তিনি মা এবং শিশুর মধ্যে গায়ের গন্ধের যে নিবিড় শারীরিক ও মানসিক সম্পর্ক রয়েছে, তা নিয়ে বিশদ কাজ করেছিলেন। সেই গবেষণার সূত্র ধরেই তাঁর মাথায় আসে, ঠিক একই ধরনের সম্পর্ক বাবা এবং শিশুর মধ্যেও তৈরি হয় কি না! বর্তমান সময়ে শিশুদের লালনপালন বা দেখভালের ক্ষেত্রে বাবারা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। কিন্তু জীবনের একদম শুরুর দিকের এই বিকাশে বাবার উপস্থিতি বা তাঁর ভূমিকা ঠিক কতটা, সে সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের কাছে খুব বেশি তথ্য ছিল না।
এই ব্যাপারটি হাতে-কলমে প্রমাণের জন্য শাপিরা ও তাঁর দল একটি অভিনব পরীক্ষার আয়োজন করেন। প্রতিটি শিশুকে তিনটি ছোট কার্যক্রমে অংশ নিতে দেওয়া হয়। এর মধ্যে একটি সেশন ছিল শিশুর নিজের বাবার সঙ্গে, বাকি দুটি একেবারে অপরিচিত দুজন পুরুষের সঙ্গে।
তবে এখানে একটা ছোট্ট বিজ্ঞানভিত্তিক কৌশল খাটানো হয়েছিল। অপরিচিত ওই দুই পুরুষের মধ্যে একজনকে পরতে দেওয়া হয়েছিল শিশুর বাবার আগে থেকে পরা একটি শার্ট, যাতে বাবার শরীরের স্বাভাবিক গন্ধ লেগে ছিল। অন্যজনকে পরতে দেওয়া হয়েছিল একেবারে নতুন, পরিষ্কার এবং গন্ধহীন একটি শার্ট। শিশুরা যেন নির্দিষ্ট কোনো প্যাটার্ন বুঝতে না পারে বা অভ্যস্ত হয়ে না পড়ে, তাই এই তিনটি ইন্টার্যাকশনের ক্রম একেবারে এলোমেলোভাবে সাজানো হয়েছিল। এরপর বিজ্ঞানীরা খুব সতর্কতার সঙ্গে এই ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিগুলো তুলনা করে দেখার চেষ্টা করেন, সামাজিক যোগাযোগের সময় বাবার গায়ের গন্ধ শিশুর মস্তিষ্কের অভ্যন্তরীণ ছন্দের ওপর ঠিক কী ধরনের প্রভাব ফেলে।
প্রতিটি শিশুকে তিনটি ছোট কার্যক্রমে অংশ নিতে দেওয়া হয়। এর মধ্যে একটি সেশন ছিল শিশুর নিজের বাবার সঙ্গে, বাকি দুটি একেবারে অপরিচিত দুজন পুরুষের সঙ্গে।
শিশুদের মস্তিষ্কের ভেতরে ঠিক কী চলছে, তা নিখুঁতভাবে মাপার জন্য শিশু এবং ওই পুরুষদের মাথায় বিশেষ একধরনের যন্ত্র পরানো হয়। শাপিরার ভাষায়, ‘যন্ত্রগুলোকে দেখতে অনেকটা শাওয়ার ক্যাপ বা গোসলের সময় মাথায় পরার টুপির মতো লাগছিল, যার চারপাশ দিয়ে অসংখ্য তার এবং ইলেকট্রোড বেরিয়ে ছিল। এই আধুনিক যন্ত্রের কাজ হলো সামাজিক যোগাযোগের সময় মস্তিষ্ক কতটা সিঙ্ক্রোনাইজডভাবে কাজ করছে, তা পরিমাপ করা।’
পরীক্ষার ফল বিজ্ঞানীদের রীতিমতো অবাক করে দেয়। তাঁরা দেখতে পান, যখন বাবা সরাসরি শিশুর সামনে উপস্থিত ছিলেন, তখন শিশুর মস্তিষ্কের কার্যকলাপ অনেক বেশি ছন্দে ছিল। কিন্তু সবচেয়ে বড় চমকটি অপেক্ষা করছিল পরের ধাপে। যখন সেই অপরিচিত লোকটি শিশুর সামনে এলেন, যার গায়ে শিশুর বাবার পরা শার্টটি ছিল, তখনও শিশুর মস্তিষ্ক ঠিক একইভাবে কাজ করছিল! অর্থাৎ, শুধুমাত্র বাবার গায়ের গন্ধ পেয়ে শিশুর মস্তিষ্ক অপরিচিত লোকটিকেও নিজের অত্যন্ত কাছের কেউ ভেবে নিয়েছিল এবং মস্তিষ্কের তরঙ্গগুলো একই ছন্দে স্পন্দিত হচ্ছিল।
এই গবেষণার ফল একটি বিষয় খুব স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে, নবজাতকরা তাদের বাবার গায়ের গন্ধ খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারে। বাবার শরীরের এই গন্ধ শিশুর কাছে একটি শক্তিশালী সংবেদনশীল সংকেত হিসেবে কাজ করে। বাবা যদি শারীরিকভাবে শিশুর সামনে উপস্থিত নাও থাকেন, তবুও শুধু তাঁর গায়ের গন্ধই শিশুর সামাজিক যোগাযোগকে সহজ করে তোলে।
শুধুমাত্র বাবার গায়ের গন্ধ পেয়ে শিশুর মস্তিষ্ক অপরিচিত লোকটিকেও নিজের অত্যন্ত কাছের কেউ ভেবে নিয়েছিল এবং মস্তিষ্কের তরঙ্গগুলো একই ছন্দে স্পন্দিত হচ্ছিল।
একটি শিশু তার চারপাশের অজানা পৃথিবী সম্পর্কে জানতে প্রতিনিয়ত নানা ধরনের সংবেদনশীল সংকেত গ্রহণ করে। বাবার গায়ের গন্ধ তার মধ্যে মাত্র একটি। কিন্তু বিজ্ঞানীদের মতে, শিশুদের প্রাথমিক বিকাশে বাবারা ঠিক কীভাবে এবং কতটা প্রভাব ফেলেন, তা নিয়ে ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে গবেষণা করার জন্য এটি একটি চমৎকার শুরু। আপনি যখন আপনার সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরেন, তখন আপনার অজান্তেই আপনার গায়ের গন্ধ তার ছোট্ট মস্তিষ্কে এক গভীর নিরাপত্তার চাদর বিছিয়ে দেয়!