৬৫ ফুট লম্বা দানবাকার অক্টোপাস

পৌরাণিক গল্পে একসময় একটি ভয়ংকর সামুদ্রিক দানবের কথা খুব শোনা যেত। দানবটার নাম ক্র্যাকেন। বলা হতো, ক্র্যাকেনের বিশাল বিশাল শুঁড় দিয়ে নাকি আস্ত একটা জাহাজকে পেঁচিয়ে সাগরের অতলে ডুবিয়ে দিতে পারত! গল্পটা শুনলে গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এই ক্র্যাকেন শুধু পৌরাণিক বা রূপকথার গল্প নয়। আজ থেকে প্রায় ১০ কোটি বছর আগে আমাদের এই পৃথিবীর বুকেই সত্যি সত্যি এমন বিশাল আর ভয়ংকর সব অক্টোপাস ঘুরে বেড়াত!

ডাইনোসররা যখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে পৃথিবীর স্থলভাগে, তখন ক্রেটাসিয়াস যুগে সাগরের অতলে রাজত্ব করত এই অতিকায় অক্টোপাসেরা। সম্প্রতি বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স-এ প্রকাশিত একটি গবেষণা থেকে এই চমকপ্রদ তথ্য জানা গেছে। জাপানের হোক্কাইডো বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক জীবাশ্মবিদ ইয়াসুহিরো ইবা এবং তাঁর দল এই গবেষণাটি করেছেন। তাঁদের মতে, পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাচীন এই অক্টোপাসগুলো লম্বায় প্রায় ৬৫ ফুট পর্যন্ত হতো! ৬৫ ফুট মানে বুঝতে পারছেন? প্রায় ছয় তলা একটা ভবনের সমান! ওই সময়ে সাগরে ঘুরে বেড়ানো বিশাল সব সামুদ্রিক সরীসৃপদের চেয়েও এরা আকারে বড় ছিল। বলা যায়, এরা ছিল সাগরের খাদ্যশৃঙ্খলের একদম চূড়ায় থাকা শিকারি।

এখন আপনার মনে একটা খটকা লাগতে পারে। অক্টোপাসের শরীরে তো কোনো হাড়গোড় থাকে না, পুরোটাই নরম মাংসে তৈরি। হাড় না থাকলে কোটি কোটি বছর পর মাটির নিচে এদের জীবাশ্ম বা ফসিল তৈরি হবে কীভাবে? বিজ্ঞানীরা এদের খুঁজেই বা পেলেন কোথা থেকে?

আরও পড়ুন
জাপানের হোক্কাইডো বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক জীবাশ্মবিদ ইয়াসুহিরো ইবা এবং তাঁর দলের মতে, পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাচীন এই অক্টোপাসগুলো লম্বায় প্রায় ৬৫ ফুট পর্যন্ত হতো!

এর উত্তর লুকিয়ে আছে অক্টোপাসের মুখে! আধুনিক অক্টোপাসদের মতোই প্রাচীনকালের সেই বিশাল অক্টোপাসগুলোরও মুখের ভেতর পাখির ঠোঁটের মতো খুব শক্ত ও ধারালো দুটি চোয়াল ছিল। এই চোয়াল দিয়েই তারা শিকারকে টুকরো টুকরো করে খেত। শরীরের নরম অংশগুলো পচে নষ্ট হয়ে গেলেও, সাগরের শান্ত তলদেশে এই শক্ত চোয়ালগুলো চমৎকার জীবাশ্ম হিসেবে কোটি কোটি বছর ধরে সংরক্ষিত ছিল।

বিজ্ঞানীরা জাপান এবং কানাডার ভ্যাঙ্কুভার দ্বীপ থেকে পাওয়া এই চোয়ালের জীবাশ্মগুলো পরীক্ষা করেছেন। এই অক্টোপাসগুলো সিরাটা নামে একটি উপগোষ্ঠীর সদস্য, যাদের বংশধরেরা এখনো পৃথিবীতে বেঁচে আছে। বিজ্ঞানীরা ‘হাই-রেজ্যুলেশন গ্রাইন্ডিং টোমোগ্রাফি’ নামে একটি আধুনিক স্ক্যানিং প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে এই প্রাণীগুলোর শারীরিক কাঠামোর একটি নকশা তৈরি করেন। এই নকশা থেকেই বেরিয়ে আসে অবাক করা সব তথ্য!

এই আবিষ্কারের ফলে বিশাল আকারের ডানাযুক্ত অক্টোপাসদের পৃথিবীতে আসার ইতিহাস আরও প্রায় দেড় কোটি বছর পিছিয়ে গেছে। সামগ্রিকভাবে অক্টোপাসদের ইতিহাস পিছিয়েছে প্রায় ৫০ লাখ বছর। অর্থাৎ, আজ থেকে প্রায় ১০ কোটি বছর আগেই তারা পৃথিবীতে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করে নিয়েছিল।

আরও পড়ুন
বিজ্ঞানীরা জাপান এবং কানাডার ভ্যাঙ্কুভার দ্বীপ থেকে পাওয়া এই চোয়ালের জীবাশ্মগুলো পরীক্ষা করেছেন। এই অক্টোপাসগুলো সিরাটা নামে একটি উপগোষ্ঠীর সদস্য।

তবে শুধু বিশাল আকারই নয়, এই প্রাচীন ক্র্যাকেনরা ছিল দারুণ বুদ্ধিমান! বিজ্ঞানীরা এদের চোয়াল পরীক্ষা করে দেখেছেন, চোয়ালের এক পাশ অন্য পাশের চেয়ে বেশি ক্ষয়প্রাপ্ত। মানে, তারা শিকার ধরার সময় চোয়ালের একটি নির্দিষ্ট পাশ বেশি ব্যবহার করত। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে ল্যাটারলাইজেশন। যেসব প্রাণীর মস্তিষ্ক এবং স্নায়ুতন্ত্র খুব বেশি উন্নত, শুধু তাদের মধ্যেই এই বিশেষ আচরণ দেখা যায়। অর্থাৎ, সেই প্রাচীনকালেও অক্টোপাসেরা ছিল অসম্ভব চালাক!

এই বিশাল অক্টোপাসেরা যে খুব শান্তশিষ্ট ছিল, তা কিন্তু নয়। তাদের চোয়ালের অতিরিক্ত ক্ষয় দেখে বোঝা যায়, তারা খুব আক্রমণাত্মকভাবে শিকার করত। এমনকি শিকারের সঙ্গে তুমুল লড়াই করতে গিয়ে অনেক পূর্ণবয়স্ক অক্টোপাসের চোয়ালের সামনের দিকের প্রায় ১০ শতাংশ ভেঙেও গিয়েছিল!

এত দিন বিজ্ঞানীদের একটি পুরোনো ধারণা ছিল, সাগরের সবচেয়ে ভয়ংকর শিকারি হতে হলে প্রাণীদের মেরুদণ্ড থাকাটা খুব জরুরি। কিন্তু এই অতিকায় প্রাচীন অক্টোপাসেরা প্রমাণ করে দিয়েছে, সাগরের বুকে ত্রাস ছড়ানোর জন্য মেরুদণ্ড থাকার কোনো দরকার নেই; শুধু বিশাল আকার, ধারালো চোয়াল এবং প্রখর বুদ্ধি থাকলেই চলে!

সূত্র: সায়েন্স ডটকম ও পপুলার সায়েন্স

আরও পড়ুন