উচ্চ তাপমাত্রা থেকে বোরো ধান রক্ষায় করণীয়
বৃষ্টিহীন প্রকৃতি ও তীব্র দাবদাহে আবারও হিট শকের আতঙ্ক কৃষকের চোখেমুখে। কিন্তু এই নীরব ঘাতকের হাত থেকে বোরো ধানকে বাঁচানোর কি কোনো উপায় নেই? ধানের জমিতে ঠিক কত ইঞ্চি পানি ধরে রাখতে হবে? তীব্র গরমে যখন পাতাপোড়া ও ব্লাস্ট রোগের আক্রমণ বাড়ে, তখন ঠিক কোন ছত্রাকনাশক কীভাবে স্প্রে করলে ফসল বাঁচানো যাবে?
বাংলাদেশের কৃষি বরাবরই প্রকৃতিনির্ভর। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দেশের কৃষিকে প্রতিনিয়ত নানা ঘাত-প্রতিঘাত মোকাবিলা করে এগোতে হচ্ছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, বন্যা, খরা, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা ও মাত্রাতিরিক্ত ঠান্ডা। এর সঙ্গে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নতুন করে যোগ হয়েছে উচ্চ তাপপ্রবাহ বা হিট শক। এটি আমাদের কৃষিতে নতুন ধরনের একটি অভিঘাত।
দীর্ঘদিনের বৃষ্টিহীন উচ্চ তাপপ্রবাহই মূলত এই হিট শকের প্রধান কারণ। ২০২১ সালের ৪ এপ্রিল হাওরাঞ্চলে প্রবাহিত তীব্র দাবদাহ হাওয়ায় বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। এর মূল কারণ ছিল দীর্ঘদিনের বৃষ্টিহীন প্রকৃতি বা হিট শক। এই শকে নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, নড়াইল, কুষ্টিয়া, রাজশাহী, ময়মনসিংহসহ দেশের ৩৬টি জেলায় বোরো ধানের পাশাপাশি ভুট্টা, সবজি, চীনাবাদাম, সূর্যমুখী ও কলার ফলন ব্যাপকভাবে নষ্ট হয়। সব মিলিয়ে সে বছর মোট ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৩৪ কোটি টাকা! এর মধ্যে শুধু বোরো ধানেরই ক্ষতি হয়েছিল ৩২৮ কোটি টাকার।
কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, সে সময় হিট শকে ৪৮ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান আক্রান্ত হয়। গত বছর বোরো মৌসুমে ধানের ফুল ফোটার পর্যায়ে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা সহনীয় পর্যায়ে থাকায় বোরো ধানের চিটা হওয়ার সমস্যা ততটা প্রকটভাবে দেখা যায়নি। কিন্তু চলতি বছরের এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহের তীব্র দাবদাহ আবারও হিট শক রূপ নেবে কি না, তা নিয়ে কৃষিপরিবেশবিদেরা ইতিমধ্যে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। কেন এটি ভাবনার বিষয়, চলুন তা নিয়ে আলোচনা করা যাক।
২০২১ সালের ৪ এপ্রিল হাওরাঞ্চলে প্রবাহিত তীব্র দাবদাহ হাওয়ায় বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। এর মূল কারণ ছিল দীর্ঘদিনের বৃষ্টিহীন প্রকৃতি বা হিট শক।
ধানের বৃদ্ধিতে উচ্চ তাপমাত্রার প্রভাব
ধানগাছ বৃদ্ধির বিভিন্ন পর্যায়ে উচ্চ তাপমাত্রা বিভিন্ন মাত্রায় প্রভাব বিস্তার করে। অঙ্গজ বৃদ্ধি পর্যায়ে উচ্চ তাপমাত্রার (৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি) প্রভাবে ধানের পাতার অগ্রভাগ সাদা হয়ে যায় এবং পাতায় ক্লোরোটিক ও সাদাটে দাগ দেখা যায়। এ ছাড়া গোছায় কুশির সংখ্যা ও গাছের উচ্চতা কমে যাওয়ার লক্ষণও দেখা যায়।
অঙ্গজ বৃদ্ধি পর্যায়ে উচ্চ তাপমাত্রা ফলনে তেমন ক্ষতিকর প্রভাব না ফেললেও, প্রজনন পর্যায়ে উচ্চ তাপমাত্রা (৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি) ধানের ফলনের ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ধানের প্রজনন পর্যায়ে শীষ বের হওয়ার ৯ দিন আগে তাপমাত্রা ৩৫-৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ফুল ফোটা ও পরাগায়নের সময় ১-২ ঘণ্টা তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তারও বেশি হলে সাদা শীষ, সাদা স্পাইকলেট ও শীষে স্পাইকলেটের সংখ্যা কমে যায়। এ ছাড়া চিটা সমস্যার কারণে ধানের ফলন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়।
ধানের পরিপক্ব পর্যায়ে উচ্চ তাপমাত্রা দানা গঠন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে। ফলে অর্ধপুষ্ট দানার সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। এটি ধানের ফলন ও গুণগত মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ধানের ফুল ফোটা ও পরাগায়নের সময় যে শীষগুলোতে ফুল ফুটতে থাকে, তা খুবই সক্রিয় অবস্থায় থাকে। এ অবস্থায় ধানের শীষকে তপ্ত হাওয়ার ক্ষতি থেকে রক্ষার জন্য গাছ প্রচুর পরিমাণে পানি প্রস্বেদন প্রক্রিয়ায় বের করে দেয়। এই প্রস্বেদন অনেকটা গাছের শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার শীতলকরণ ব্যবস্থার মতো কাজ করে।
ধানের পরিপক্ব পর্যায়ে উচ্চ তাপমাত্রা দানা গঠন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে। ফলে অর্ধপুষ্ট দানার সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। এটি ধানের ফলন ও গুণগত মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) গবেষণায় দেখা গেছে, ধানের শীষ ও ডিগপাতার তাপমাত্রা বাতাসের তাপমাত্রার চেয়ে ৪-৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম রাখতে হয়। এ জন্য গাছকে প্রচুর পানি প্রস্বেদন প্রক্রিয়ায় বের করে দিতে হয়। ধানের শারীরবৃত্তীয় এ প্রক্রিয়া বজায় রাখতে গিয়ে বৃষ্টিহীন তীব্র দাবদাহের সময় ধানের শীষ ও ডিগপাতা থেকে অতি অল্প সময়ে অনেক পানি বের হয়ে যায়। ফলে শীষ ও ডিগপাতা দ্রুত শুকিয়ে যেতে পারে।
শুকিয়ে যাওয়া সাদা শীষ সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ধানের সব কুশির শীষ একসঙ্গে বের হয় না বা শীষের সব ফুল একসঙ্গে ফোটে না। তাই শতভাগ ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা কম থাকে। আবার যেসব ক্ষেত্রে ধানের দানা গঠন প্রক্রিয়া চলছে, সেসব ক্ষেত্রে ডিগপাতা শুকিয়ে গেলেও দানা গঠন প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে। ফলে ক্ষতি হয় খুব সামান্য।
গত বছর বোরো মৌসুমে ধানের ফুল ফোটা পর্যায়ে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা সহনীয় পর্যায়ে ছিল। ফলে বোরো ধানের চিটা সমস্যা ততটা প্রকটভাবে দেখা যায়নি। কিন্তু চলতি বোরো মৌসুমে তেমন বৃষ্টিপাত না হওয়ায় তাপমাত্রা দিন দিন বেড়েই চলেছে। সংগত কারণেই বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ কমে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে হিট শকের আশঙ্কা কোনোভাবেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
ধানের শারীরবৃত্তীয় এ প্রক্রিয়া বজায় রাখতে গিয়ে বৃষ্টিহীন তীব্র দাবদাহের সময় ধানের শীষ ও ডিগপাতা থেকে অতি অল্প সময়ে অনেক পানি বের হয়ে যায়। ফলে শীষ ও ডিগপাতা দ্রুত শুকিয়ে যেতে পারে।
উচ্চ তাপমাত্রা থেকে ধান রক্ষায় করণীয়
তীব্র দাবদাহের ক্ষতি থেকে ধান রক্ষার একমাত্র উপায় ধানের জীবনকালের ওপর ভিত্তি করে বপন ও রোপণের সময় এমনভাবে সমন্বয় করা, যাতে ধানের ফুল ফোটার সময়কাল এমন তীব্র দাবদাহকে এড়িয়ে যেতে পারে। এ সময় বোরো ধানের যেসব জাত ফুল ফোটা পর্যায়ে আছে বা এখন ফুল ফুটছে বা সামনে ফুল ফুটবে, সেসব জমিতে পর্যাপ্ত পানি ধরে রাখতে হবে। ধানের শীষে দানা শক্ত না হওয়া পর্যন্ত জমিতে অবশ্যই ২-৩ ইঞ্চি পানি রাখতে হবে।
ঝড়ের কারণে ব্যাকটেরিয়াজনিত পাতাপোড়া বা ব্যাকটেরিয়াজনিত লালচে রেখা রোগের আক্রমণ হতে পারে। আক্রান্ত যেসব জমিতে ধান ফুল আসা পর্যায়ে রয়েছে, সেসব জমিতে ৬০ গ্রাম এমওপি, ৬০ গ্রাম থিওভিট ও ২০ গ্রাম দস্তা সার ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে ৫ শতাংশ জমিতে বিকেলে স্প্রে করতে হবে। তবে ধান থোড় অবস্থায় থাকলে বিঘা প্রতি অতিরিক্ত ৫ কেজি পটাশ সার উপরিপ্রয়োগ করলে ভালো ফল পাওয়া যাবে।
এ সময় বোরো ধানের যেসব জাত ফুল ফোটা পর্যায়ে আছে বা এখন ফুল ফুটছে বা সামনে ফুল ফুটবে, সেসব জমিতে পর্যাপ্ত পানি ধরে রাখতে হবে।
বোরো ধানের এ পর্যায়ে নেক ব্লাস্ট বা শীষ ব্লাস্ট রোগের ব্যাপক আক্রমণ হতে পারে। শীষ ব্লাস্ট রোগ হওয়ার পরে তা দমন করার কোনো সুযোগ থাকে না। তাই ধানের জমিতে রোগ হোক বা না হোক, থোড় ফেটে শীষ বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই একবার এবং এর ৫-৭ দিন পর আরেকবার স্প্রে করতে হবে। বিঘা প্রতি (৩৩ শতাংশ) ৫৪ গ্রাম ট্রুপার, ৭৫ ডব্লিউপি/ দিফা ৭৫ ডব্লিউপি/ জিল ৭৫ ডব্লিউপি অথবা ৩৩ গ্রাম নাটিভো ৭৫ডব্লিউজি, অথবা ট্রাইসাইক্লাজল/স্ট্রবিন গ্রুপের অনুমোদিত ছত্রাকনাশক অনুমোদিত মাত্রায় ৬৭ লিটার পানিতে ভালোভাবে মিশিয়ে শেষ বিকেলে স্প্রে করতে হবে।
এ সময় জমিতে বাদামি গাছফড়িংয়ের আক্রমণ হতে পারে। আক্রমণপ্রবণ এলাকায় মিপসিন ৭৫ডব্লিউপি, প্লিনাম ৫০ডব্লিউজি, একতারা ২৫ডব্লিউডি, এডমায়ার ২০এসএল, সানমেক্টিন ১.৮ইসি, এসাটাফ ৭৫এসপি, প্লাটিনাম ২০ এসপি অথবা অনুমোদিত কীটনাশকের বোতলে বা প্যাকেটে উল্লিখিত মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে। কীটনাশক অবশ্যই গাছের গোড়ায় প্রয়োগ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ডাবল নজেলবিশিষ্ট স্প্রেয়ার ব্যবহার করা উত্তম।
ধানের জমিতে রোগ হোক বা না হোক, থোড় ফেটে শীষ বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই একবার এবং এর ৫-৭ দিন পর আরেকবার স্প্রে করতে হবে।
উচ্চ তাপমাত্রা প্রতিরোধী ধানের জাত উদ্ভাবনে ব্রির গবেষণা অগ্রগতি
বৈশ্বিক আবহাওয়া পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব বুঝতে পেরে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ২০১৩ সাল থেকে উচ্চ তাপমাত্রা সহনশীল জাত উদ্ভাবনের গবেষণা শুরু করে। উচ্চ তাপমাত্রা সহনশীল ‘এন২২’ জাতের সঙ্গে বোরো মৌসুমের জনপ্রিয় আধুনিক জাত ‘ব্রি ধান ২৮’-এর সংকরায়ণ করে মার্কার অ্যাসিস্টেড ব্যাকক্রসিং পদ্ধতির মাধ্যমে একটি অগ্রগামী সারি নির্বাচন করা হয়েছে, যা মধ্যম মাত্রার উচ্চ তাপমাত্রা সহনশীল।
এই সারিটি বর্তমানে আঞ্চলিক ফলন পরীক্ষণ পর্যায়ে রয়েছে। ফলন ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হলে একে নতুন জাত হিসেবে অনুমোদনের জন্য জাতীয় বীজ বোর্ডে আবেদন করা হবে। জাত হিসেবে অনুমোদিত হলে ফুল ফোটা পর্যায়ে তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলেও এই সারিটি আশানুরূপ ফলন দিতে পারবে।