মাত্র ১৯ বছরেই অ্যালঝেইমার্স, চিকিৎসাবিজ্ঞানের বড় বিস্ময়

হাইস্কুলে পড়া এক কিশোর হঠাৎ ভুলে যেতে শুরু করল গতকালের ঘটনা। চিকিৎসকেরা ভাবলেন সাধারণ কোনো সমস্যা, কিন্তু রিপোর্ট দেখে তাঁদের চোখ কপালে! ১৯ বছরের তরুণের মস্তিষ্কে বাসা বেঁধেছে অ্যালঝেইমার্স। চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই অমীমাংসিত রহস্য কি আমাদের ভবিষ্যতের জন্য কোনো অশনিসংকেত?

সাধারণত বয়স্করা অ্যালঝেইমার্স রোগে আক্রান্ত হয়ছবি: কটো ফেজা/ গেটি ইমেজ

অ্যালঝেইমার্স বা স্মৃতিভ্রম মানেই আমরা কোনো বয়স্ক মানুষের কথা ভাবি। স্বাভাবিকভাবেই বয়স্করা বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন, ভুলে গেছেন প্রিয়জনদের নাম। আমরা ধরেই নিই, এটি বার্ধক্যজনিত রোগ। কিন্তু ২০২২ সালে চীনের একটি ঘটনা চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের এই ধারণা পাল্টে দিয়েছে। মাত্র ১৯ বছর বয়সের এক তরুণের শরীরে ধরা পড়েছে অ্যালঝেইমার্স! এখন পর্যন্ত এটিই রেকর্ড করা বিশ্বের সবচেয়ে কম বয়সী অ্যালঝেইমার্স কেস!

অ্যালঝেইমার্স বয়স্কদের মধ্যে একটি সাধারণ রোগ
ছবি: জেলজকোসেনট্রাক/ গেটি ইমেজ

এই ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল আরও আগে। ছেলেটির বয়স তখন মাত্র ১৭ বছর। ক্লাসে পড়া মনে রাখতে পারছিল না। পড়ার টেবিলে বসলেই মনোযোগ হারিয়ে যেত। ধীরে ধীরে অবস্থা এতই খারাপ হলো যে, গতকাল কী ঘটেছিল বা নিজের জিনিসপত্র কোথায় রেখেছে, তাও সে বেমালুম ভুলে যেতে শুরু করল। পরিস্থিতির ভয়াবহতায় শেষমেশ হাইস্কুলের গণ্ডিটাও আর পেরোতে পারল না।

আরও পড়ুন
মাত্র ১৯ বছর বয়সের এক তরুণের শরীরে ধরা পড়েছে অ্যালঝেইমার্স! এখন পর্যন্ত এটিই রেকর্ড করা বিশ্বের সবচেয়ে কম বয়সী অ্যালঝেইমার্স কেস!

চীনের বেইজিংয়ের ক্যাপিটাল মেডিকেল ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা প্রথমে বিষয়টি বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না। তাঁরা ওই তরুণের ব্রেইন স্ক্যান করে দেখেন, মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস শুকিয়ে ছোট হয়ে গেছে। হিপোক্যাম্পাস আমাদের স্মৃতি জমা রাখে।

ছবি: ফ্লিন্ট রিহ্যাব

এমনকি ওই তরুণের সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড বা মেরুদণ্ডের তরল পরীক্ষা করেও অ্যালঝেইমার্সের স্পষ্ট লক্ষণ পাওয়া যায়। সাধারণত ৩০ বছরের কম বয়সী কারও অ্যালঝেইমার্স হলে তার পেছনে জিনগত কারণ থাকে। এর আগে সবচেয়ে কম বয়সী যে রোগীর খোঁজ পাওয়া গিয়েছিল, তার শরীরেও PSEN1 জিনের পরিবর্তন ছিল। তাঁর বয়স ছিল ২১ বছর। কিন্তু এই ১৯ বছর বয়সী তরুণের কেসটা সম্পূর্ণ আলাদা এবং রহস্যময়।

আরও পড়ুন
মেমোরি ক্লিনিকে পরীক্ষায় দেখা যায়, তার সমবয়সী অন্য তরুণদের তুলনায় তার সামগ্রিক স্মৃতিশক্তি ৮২ শতাংশ কম! তার তাৎক্ষণিক কোনো কিছু মনে রাখার ক্ষমতা নেমে গেছে ৮৭ শতাংশের নিচে।

সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, তার বংশে বা পরিবারে কারও কখনো অ্যালঝেইমার্স বা ডিমেনশিয়া ছিল না। জিনোম সিকোয়েন্সিং করে গবেষকেরা কোনো ক্ষতিকর মিউটেশন খুঁজে পাননি। এমনকি তার মাথায় কোনো আঘাত লাগেনি, কিংবা এমন কোনো ইনফেকশনও হয়নি, যা স্মৃতিশক্তি কেড়ে নিতে পারে। অথচ মেমোরি ক্লিনিকে পরীক্ষার পর দেখা যায়, তার সমবয়সী অন্য তরুণদের তুলনায় তার সামগ্রিক স্মৃতিশক্তি ৮২ শতাংশ কম! তার তাৎক্ষণিক কোনো কিছু মনে রাখার ক্ষমতা নেমে গেছে ৮৭ শতাংশের নিচে।

অ্যালঝেইমার্স সাধারণত মস্তিষ্কে অ্যামাইলয়েড প্লাক এবং টাউ প্রোটিন জমার কারণে হয়। এই তরুণের ক্ষেত্রেও সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইডে টাউ প্রোটিনের মাত্রা বেশি পাওয়া গেছে। এমনটা সাধারণত বয়স্ক রোগীদের ক্ষেত্রেই দেখা যায়।

একজন সুস্থ মানুষ এবং একজন অ্যালঝেইমার্স রোগীর মস্তিষ্কের পার্থক্য
ছবি: মার্ক অ্যান্ড মেরি স্টিভেন্স নিউরোইমেজিং অ্যান্ড ইনফরম্যাটিক্স ইনস্টিটিউট / সায়েন্স সোর্স

জার্নাল অব অ্যালঝেইমার্স ডিজিজ-এ প্রকাশিত এই ঘটনা বিজ্ঞানীদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। কারণ, কোনো জিনগত ত্রুটি ছাড়াই এত কম বয়সে অ্যালঝেইমার্স হওয়াটা সত্যিই রহস্যজনক। এই ঘটনা প্রমাণ করে, অ্যালঝেইমার্স রোগকে আমরা যতটা সরল ভাবতাম, আসলে তা নয়। এর গতিপথ অনেক জটিল। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই রোগের রহস্য উন্মোচন করাই এখন বিজ্ঞানীদের সামনে আগামীর বড় চ্যালেঞ্জ।

লেখক: সহকারী শিক্ষক, গণিত বিভাগ, পদ্মা ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, শরীয়তপুর

সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট ও জার্নাল অব অ্যালঝেইমার্স ডিজিজ

আরও পড়ুন