ডাঙার প্রথম পোকার পা ছিল ২৪টি, জানা গেল পুরনো বই থেকে
আপনার চেনা তেলাপোকা বা পিঁপড়ের ৬টি পা থাকলেও, কোটি কোটি বছর আগে তাদের পূর্বপুরুষদের পা ছিল ২৪টি! কিন্তু ইবে থেকে কেনা একটি পুরোনো রুশ বইয়ের সাধারণ একটি স্কেচ কীভাবে বিজ্ঞানীদের বাধ্য করল পোকামাকড়ের বিবর্তনের ইতিহাস নতুন করে লিখতে? আমেরিকার একটি মিউজিয়ামে দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে ভুল পরিচয়ে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকা ওই অদ্ভুত জীবাশ্মটি আসলে কীসের?
ঘরের কোণে ঘাপটি মেরে থাকা তেলাপোকার ৬টি পা দেখেই অনেকের আত্মরাম খাঁচাছাড়া হওয়ার জোগাড় হয়। ওই একই পোকা যদি ৬টির বদলে ২৪টি পা নিয়ে আপনার দিকে তেড়ে আসে, তবে কেমন লাগবে? আজ থেকে কোটি কোটি বছর আগে পৃথিবীর সত্যিকারের চিত্রটা নাকি এমনই ছিল!
আধুনিক যুগে পোকামাকড় বলতে আমরা বুঝি যাদের ছয়টি পা আছে। কিন্তু কে জানত, পোকামাকড়ের আদিপুরুষদের পায়ের সংখ্যা ছিল আজকের তুলনায় ঠিক চারগুণ বেশি! আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, বিজ্ঞানের এত বড় একটি যুগান্তকারী আবিষ্কারের সূত্রপাত হয়েছে ইবে (eBay) থেকে কেনা একটি পুরোনো ও সেকেলে বইয়ের পাতা থেকে।
কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির জীবাশ্মবিজ্ঞানের পিএইচডি গবেষক এরিক তিহেলকা ইবে থেকে একটি পুরোনো রুশ পাঠ্যবই কিনেছিলেন। পাতা উল্টাতে উল্টাতে হঠাৎ একটি সাদাকালো স্কেচে তাঁর চোখ আটকে যায়। বইটিতে দাবি করা হয়েছিল, এটি আজ থেকে ৩২ কোটি ৪০ লাখ বছর আগেকার একটি জলজ ক্রাস্টাসিয়ান প্রাণীর জীবাশ্ম। ক্রাস্টাসিয়ান মানে কাঁকড়া বা চিংড়ি জাতীয় প্রাণী। কিন্তু এরিকের তীক্ষ্ণ চোখে ধরা পড়ে অন্য কিছু। ক্রাস্টাসিয়ান বলা হলেও, এর শরীর আধুনিক সিলভারফিশ পোকার মতো তিনটি পরিষ্কার ভাগে বিভক্ত এবং মাথায় অ্যান্টেনা রয়েছে। কিন্তু হিসাব গোলমাল হয়ে গেল পায়ের জায়গায় এসে। আধুনিক পোকার মতো এর ছয়টি পা নয়, বরং শরীরের মাঝখান থেকে বেরিয়ে এসেছে পাক্কা ২৪টি পা!
পাতা উল্টাতে উল্টাতে হঠাৎ একটি সাদাকালো স্কেচে তিহেলকার চোখ আটকে যায়। বইটিতে দাবি করা হয়েছিল, এটি আজ থেকে ৩২ কোটি ৪০ লাখ বছর আগেকার একটি জলজ ক্রাস্টাসিয়ান প্রাণীর জীবাশ্ম।
পৃথিবীতে বর্তমানে যত প্রাণী আছে, তার অর্ধেকেরও বেশি হলো এই পোকামাকড়। জেনেটিক বিশ্লেষণ থেকে বিজ্ঞানীরা অনেক আগেই জানতে পেরেছিলেন, পোকামাকড়রা আসলে জলজ ক্রাস্টাসিয়ান থেকেই বিবর্তিত হয়ে ডাঙায় উঠে এসেছিল। কিন্তু এই জল থেকে ডাঙায় ওঠার মাঝখানের সময়টাতে ঠিক কী ঘটেছিল, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের কাছে কোনো প্রমাণ ছিল না। ৩৮ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৩২ কোটি ২০ লাখ বছর আগের সময়টাকে জীবাশ্মবিজ্ঞানীরা বলেন হেক্সাপড গ্যাপ। কারণ এই বিশাল সময়কালের কোনো পোকার জীবাশ্ম পৃথিবীতে পাওয়া যাচ্ছিল না। ঠিক এই জায়গাতেই বাজিমাত করে ওই রুশ বইয়ের স্কেচটি। কারণ ওই জীবাশ্মটির বয়স ছিল ৩২ কোটি ৪০ লাখ বছর, যা নিখুঁতভাবে ওই নিখোঁজ সময়কালের ভেতরে পড়ে!
শুধু একটি বইয়ের স্কেচ দেখে তো আর ইতিহাস বদলে ফেলা যায় না। তাই এরিক সোজা উড়াল দিলেন যুক্তরাষ্ট্রে। কারণ টেক্সাস থেকে উদ্ধার হওয়া আসল জীবাশ্মটি ১৯৮৫ সাল থেকে পড়ে আছে সান ডিয়েগো ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের সংগ্রহশালায়। সেখানে গিয়ে বিশেষ মাইক্রোস্কোপ এবং লাইট পোলারাইজেশন ফিল্টার দিয়ে কালো পাথরের ওপর থাকা কালো ওই জীবাশ্মটি পরীক্ষা করে তিনি নিশ্চিত হন, এটি কোনো সাধারণ ক্রাস্টাসিয়ান নয়, বরং এটি একটি আদিম পোকা! অতিরিক্ত পাগুলো জলজ পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া এক ধরনের বংশগত স্মৃতি মাত্র।
৩৮ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৩২ কোটি ২০ লাখ বছর আগের সময়টাকে জীবাশ্মবিজ্ঞানীরা বলেন হেক্সাপড গ্যাপ। কারণ এই বিশাল সময়কালের কোনো পোকার জীবাশ্ম পৃথিবীতে পাওয়া যাচ্ছিল না।
এই অদ্ভুত প্রাণীটির শরীর জল থেকে ডাঙায় ওঠার এক নিখুঁত পরিবর্তনের গল্প বলে। এর নিচের দিকের পাগুলো ছিল বেশ চ্যাপ্টা, যা দিয়ে সে পানিতে চমৎকার সাঁতার কাটতে পারত। আর ঠিক মাঝখানের ছয়টি পা ছিল শক্ত, যা দিয়ে সে ডাঙায় হাঁটাচলা করত। গবেষকরা এই পোকার নাম দিয়েছেন চোশা প্রিকার্সর। চোশা শব্দটি এসেছে ডিনে বা নাভাজো আদিবাসীদের ভাষা থেকে, যার অর্থ পোকা। তাদের পুরাণে বলা আছে, পৃথিবীতে ডাঙার প্রথম বাসিন্দা ছিল এই পোকারাই।
নেচার জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় বলা হয়েছে, চোশার আসল পরিচয় পাওয়ার পর বিজ্ঞানীরা স্কটল্যান্ড ও ইলিনয়ের যাদুঘরে পড়ে থাকা আরও বেশ কিছু পুরোনো জীবাশ্ম নতুন করে পরীক্ষা করেন। সেগুলো পরীক্ষা করে দেখা যায়, ৪০ কোটি ৫ লাখ বছর আগের স্কটিশ জীবাশ্ম লেভারহুলমিয়াও অতিরিক্ত পা ওয়ালা একটি আদিম পোকা! হার্ভার্ড মিউজিয়ামের পেলিওবায়োলজিস্ট রিচার্ড জে. নেক্টের মতে, ৪০ বছর ধরে ভুল পরিচয়ে পড়ে থাকা একটি জীবাশ্ম যেভাবে নতুন প্রযুক্তির কল্যাণে বিজ্ঞানের ইতিহাস বদলে দিল, তা সত্যিই অভাবনীয়।