ডলফিন কেন এক চোখ খোলা রেখে ঘুমায়

ডলফিনের মস্তিষ্কের একটি অর্ধেক ঘুমিয়ে পড়লে বাকি অর্ধেক জেগে থাকে কেন?ছবি: সংগৃহীত

সমুদ্রের মাঝে একটি ডলফিন ভাসছে, বেশ ঢিমেতালে। কাছ থেকে তাকালে দেখা যাবে, এর একটি চোখ বন্ধ, আরেকটি খোলা! ঘুমিয়ে আছে, অথচ পুরোপুরি ঘুমিয়ে নেই। ডলফিনের কাছে এটি একদম রোজকার ব্যাপার।

মানুষ ঘুমালে দুই চোখ বন্ধ হয়, শরীর নিস্তেজ হয়ে যায় এবং মস্তিষ্কের দুই অংশ একসঙ্গে বিশ্রামে যায়। কিন্তু ডলফিনের বেলায় গল্পটা অন্য রকম। এদের মস্তিষ্কের একটি অর্ধেক ঘুমিয়ে পড়লে বাকি অর্ধেক জেগে থাকে। জেগে থাকা অংশের বিপরীত চোখটি খোলা থাকে, অর্থাৎ ডান মস্তিষ্ক জাগ্রত মানে বাঁ চোখ খোলা, আবার উল্টোটাও সত্যি। বিজ্ঞানের ভাষায় এই অদ্ভুত ঘুমের নাম দেওয়া হয়েছে ইউনিহেমিস্ফেরিক স্লো-ওয়েভ স্লিপ।

১৯৬৪ সালে জন সি লিলি নামে এক গবেষক প্রথম এই চোখ বন্ধ ও চোখ খোলা ব্যাপারটি বুঝতে পারেন। তিনি অনুমান করেছিলেন, ঘুমের মধ্যেও ডলফিন আশপাশ দেখতে ও শুনতে পারে।

ডলফিনের মস্তিষ্কে একসঙ্গে ঘুম ও জাগরণ ঘটে
ছবি: এনডিটিভি

পরে রুশ জীববিজ্ঞানী লেভ মুখামেতভ আসল ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করেন। ইলেকট্রোএনসেফালোগ্রাফি বা ইইজিতে স্পষ্ট ধরা পড়ে, ডলফিনের মস্তিষ্কের দুই হেমিস্ফিয়ারের আলাদা আলাদা তরঙ্গ। একটিতে ধীর গতির ঘুমের ছাপ, অন্যটিতে দ্রুত গতির জাগরণের ছাপ। অর্থাৎ একই মস্তিষ্কে ঘুম ও জাগরণ ঘটছে একসঙ্গে!

মানুষ তো দুই চোখ বন্ধ করেই আরাম করে ঘুমায়। তাহলে ডলফিনকে এই বাড়তি কষ্টটা করতে হয় কেন?

আরও পড়ুন
১৯৬৪ সালে জন সি লিলি নামে এক গবেষক প্রথম এই চোখ বন্ধ ও চোখ খোলা ব্যাপারটি বুঝতে পারেন। তিনি অনুমান করেছিলেন, ঘুমের মধ্যেও ডলফিন আশপাশ দেখতে ও শুনতে পারে।

এর কারণ লুকিয়ে আছে এদের শরীরের গঠনে। ডলফিন স্তন্যপায়ী প্রাণী, কোনো মাছ নয়। এদের ফুসফুস আছে, কিন্তু কোনো ফুলকা নেই। তাই শ্বাস নেওয়ার জন্য এদের নিয়মিত পানির ওপরে উঠতেই হয়। মানুষের শ্বাসপ্রশ্বাস ঘুমের মধ্যেও আপনাআপনি চলতে থাকে; আমাদের মস্তিষ্কের ব্রেনস্টেম অংশটি একাই এই কাজ সামলে নেয়, এ জন্য সচেতন থাকার দরকার পড়ে না। কিন্তু ডলফিনের বেলায় বিষয়টি পুরোপুরি উল্টো। মাথার ওপরের শ্বাসরন্ধ্র খুলে শ্বাস নেওয়ার বিষয়টি তার মস্তিষ্কে প্রায় একটি সচেতন সিদ্ধান্তের মতো কাজ করে। পুরো মস্তিষ্ক একসঙ্গে অচেতন হয়ে গেলে এদের শ্বাস নেওয়ার তাগিদটাও থেমে যাবে।

ডলফিন স্তন্যপায়ী প্রাণী, কোনো মাছ নয়। এদের ফুসফুস আছে, কিন্তু কোনো ফুলকা নেই
ছবি: মিডজার্নির সাহায্যে তৈরি

ঠিক এই জায়গাতেই অর্ধেক মস্তিষ্কের ঘুম দরকারি হয়ে ওঠে। একটি অর্ধেক বিশ্রামে গেলে অন্যটি শ্বাসপ্রশ্বাসের ছন্দ সামলায় এবং ঠিক সময়ে পানির ওপরে ওঠার বিষয়টি নিশ্চিত করে। এমনকি সাঁতরাতে সাঁতরাতেই এদের এই বিশ্রাম চলতে থাকে। বন্দী ডলফিনের ওপর করা পর্যবেক্ষণ বলছে, এরা দিনে প্রায় দশবার ছোট ছোট পর্বে ঘুমায় এবং প্রতিটি পর্ব এক ঘণ্টারও কম সময়ের হয়ে থাকে। দুই হেমিস্ফিয়ার বা গোলার্ধ মিলিয়ে হিসাব করলে দেখা যায়, সারা দিনে মস্তিষ্কের দুই পাশেই মোটামুটি সমান বিশ্রাম জোটে।

আরও পড়ুন
মাথার ওপরের শ্বাসরন্ধ্র খুলে শ্বাস নেওয়ার বিষয়টি ডলফিনের মস্তিষ্কে প্রায় একটি সচেতন সিদ্ধান্তের মতো কাজ করে। পুরো মস্তিষ্ক একসঙ্গে অচেতন হয়ে গেলে এদের শ্বাস নেওয়ার তাগিদটাও থেমে যাবে।

শুধু যে শ্বাসের সমস্যা, তা কিন্তু নয়। সমুদ্রে হাঙর ঘোরাফেরা করে। আর ডলফিনের নিরাপত্তার মূল হাতিয়ার হলো তার সজাগ ইন্দ্রিয়। দুই চোখ বন্ধ হয়ে গেলে এদের বিপদ টের পাওয়ার কোনো উপায় থাকবে না। তাই জেগে থাকা অর্ধেক মস্তিষ্ক খোলা চোখটি দিয়ে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করে যায়। কোনো বিপদের আভাস পেলেই পুরো মস্তিষ্ক মুহূর্তের মধ্যে সজাগ হয়ে যেতে পারে।

তবে গল্পটা ঠিক ততটাও সরল নয়, যতটা মনে হচ্ছে। গবেষকেরা পরে দেখিয়েছেন, অন্ধ ডলফিন বা অন্ধকার পরিবেশেও এই অর্ধেক মস্তিষ্কের ঘুম বজায় থাকে। তার মানে, চোখ খোলা থাকাটা হলো ফলাফল, মূল কারণ নয়। মস্তিষ্কের ভেতরের কোনো জৈবিক প্রক্রিয়াই আসলে এই চক্র নিয়ন্ত্রণ করে। চোখ খোলা থাকাটা শুধু সেই প্রক্রিয়ার একটি বাইরের চিহ্ন মাত্র।

ডলফিনের নিরাপত্তার মূল হাতিয়ার হলো তার সজাগ ইন্দ্রিয়
ছবি: মিডজার্নির সাহায্যে তৈরি

মানুষের ঘুমের প্রধান দুটি ধাপ রয়েছে—স্লো-ওয়েভ এবং আরইএম। এই আরইএম ধাপেই মানুষ স্বপ্ন দেখে। কিন্তু ডলফিনের ক্ষেত্রে আরইএম পর্যায়ের প্রায় কোনো প্রমাণই মেলে না। এদের ঘুম মূলত স্লো-ওয়েভেই বাঁধা থাকে। বিষয়টি এতটাই ব্যতিক্রমী যে কিছু গবেষক একে আদৌ ঘুম বলতে রাজি নন! তাঁদের মতে, এটি হয়তো সম্পূর্ণ আলাদা একটি অবস্থা, ভুলবশত যার নাম ঘুমের সঙ্গে জুড়ে গেছে।

আরও পড়ুন
ডলফিনের পূর্বপুরুষেরা একসময় ডাঙায় থাকত। জলে ফিরে যাওয়ার পথে এদের ফুসফুস ও তাপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা আগের মতোই রয়ে গেছে, কেবল চারপাশের পরিবেশটি বদলে গেছে।

তবে এই অদ্ভুত কৌশলে ডলফিন কিন্তু একা নয়। বেলুগা তিমি, পাইলট তিমি, পরপয়েজ ও আমাজন নদীর ডলফিন—এদের সবার মধ্যেই এই ঘুমের ধরন দেখা গেছে। মজার বিষয় হলো, আকাশের পাখিদের সঙ্গেও এদের মিল আছে। ফ্রিগেট পাখি আকাশে দীর্ঘ উড্ডয়নের সময় একই কৌশলে বাতাসে উড়তে উড়তেই বিশ্রাম নেয়। হাঁসের কিছু প্রজাতি আবার পাহারাদারির দায়িত্ব নিজেদের দলের মধ্যে ভাগ করে নেয়। যে পাহারায় থাকে, সে এক চোখ খোলা রাখে এবং পরদিন তার দায়িত্ব বদলে যায়। কুমিরও যে একই কাজ করে, বিজ্ঞানীদের কাছে তারও প্রমাণ মিলেছে। ২০১৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার গবেষকেরা প্রমাণ করেন, কুমিরও ঘুমানোর সময় এক চোখ খোলা রেখে চারপাশ সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারে।

ডলফিনের পূর্বপুরুষেরা একসময় ডাঙায় থাকত। জলে ফিরে যাওয়ার পথে এদের ফুসফুস ও তাপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা আগের মতোই রয়ে গেছে, কেবল চারপাশের পরিবেশটি বদলে গেছে। এই বদলে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় এদের শ্বাসপ্রক্রিয়া নিজেদের স্বেচ্ছাধীন রয়ে গেছে। আর এর সমাধান হিসেবেই অর্ধেক মস্তিষ্কের ঘুমের পরিবর্তন ঘটেছে।

ডলফিনের পূর্বপুরুষেরা একসময় ডাঙায় থাকত। জলে ফিরে যাওয়ার পথে এদের ফুসফুস ও তাপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা আগের মতোই রয়ে গেছে
ছবি: রয়টার্স

যে প্রাণী এক দিনের জন্য শ্বাস নেওয়া ভুলে গেলে মারা যাবে, ঘুমাতে গেলে তার এমন একটি পথ লাগবেই, যেখানে সচেতনতা কখনো পুরোপুরি হারায় না। ঠিক কোন জৈব রাসায়নিক সংকেত এই ঘুমচক্র চালায়, কেনই-বা এদের মধ্যে আরইএম ধাপটি সম্পূর্ণ অনুপস্থিত থেকে যায়, বিজ্ঞানীরা এখনো এসব কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন।

লেখক: সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্র: ডিসকভার ম্যাগাজিন ও লাইভ সায়েন্স

আরও পড়ুন