গিরগিটি কি রক্ত চোষে

কামিনীগাছে স্ত্রী গিরগিটিছবি: লেখক

গিরগিটি। দেখতে কিছুটা ভয়জাগানিয়া। সেটা ওদের ঘাড়ের ওপরের কেশরের কারণে। তবে তার চেয়ে বেশি ভয় রং বদলানোয়। হয়তো একটা শান্ত নিরীহ গিরগিটি এসে বসল পাঁচিলের ওপর। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার মাথার দিকটা লাল হতে শুরু করল। টকটকে ইটের মতো লাল রং। সেই রং ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে পিঠ অবধি। তা দেখে মানুষ ভয় পায়। ভাবে, গিরগিটি বুঝি অন্য কারও রক্ত শুষে লাল হচ্ছে। কিন্তু আশপাশে তো কোনো প্রাণী নেই! তবে রক্ত চুষবে কার শরীর থেকে?

সুতরাং মানুষের শরীর থেকেই রক্ত চুষে নিচ্ছে! এর থেকে বাঁচার পথও নাকি আছে। ডান হাতের বুড়ো আঙুল মুখে পুরে চুষলে নাকি গিরগিটি আর রক্ত খেতে পারে না! প্রশ্ন হলো, গিরগিটি কি আদৌ এভাবে রক্ত চুষে নিতে পারে?

গিরগিটি
ছবি: মং হাই সিং মারমা

মানুষ ভয় পেতে ভালোবাসে। যখন কোনো ঘটনার সমাধান পায় না, তখন ভয়ের ব্যাপারটাই প্রথম মাথায় আসে। আদ্যিকালের কোনো এক ভয়কাতুরে মানুষ ঠিক এভাবেই ভেবেছিল গিরগিটিকে নিয়ে। নিজের কাছেই হয়তো প্রশ্ন করেছিল, গিরগিটি কেন লাল হলো? নিশ্চয়ই আমার শরীর থেকে রক্ত পান করেছে? কিন্তু ভয়কাতুরে লোকটা যুক্তি দিয়ে ভাবে না, শরীরে কামড় না দিয়ে কীভাবে রক্ত চুষল?

আরও পড়ুন
গিরগিটি মানুষের জন্য খুবই উপকারী প্রাণী। ফসলের জন্য ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ এদের মূল খাদ্য। আবার মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু মশা সাবাড় করতেও এদের জুড়ি নেই।

ভয়ের ভেতর একটা রোমান্টিক ব্যাপার আছে। তাই বর্ষার অলস দুপুরে কিংবা রাতের আঁধারে মানুষ ভয়ের গল্প বলতে ভালোবাসে। বিশেষ করে লোকমুখে শোনা ভূতপ্রেত কিংবা দৈত্য-দানবের গল্প। এ কারণে হরর কাহিনিগুলো বিশ্বব্যাপী এত জনপ্রিয়।

যাহোক, আদ্যিকালের লোকটা ব্যাখ্যা খুঁজে পায়নি, নিজের মতো করে অদ্ভুত একটা ব্যাখ্যা তৈরি করেছিল। তারপর সেই ব্যাখ্যা ছড়িয়ে দিয়েছিল সমাজে। যুগের পর যুগ কেটে গেছে, গিরগিটি নিয়ে ভয় যেমন কাটেনি আজও, তেমনি ভুল ধারণার বিনাশও হয়নি। বহু মানুষ আজও মনে করে, গিরগিটি দূর থেকে রক্ত শুষে নেয়।

ফসলের জন্য ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ গিরগিটির মূল খাদ্য
ছবি: সাদিক মৃধা

ভয় মানুষকে হিংস্র করে তোলে। তাই রক্তচোষা শত্রুকে দেখলেই মেরে ফেলার প্রবণতা দেখা যায়। এ কারণেই প্রতিবছর হাজার হাজার নিরীহ গিরগিটি মানুষের আক্রমণে মারা পড়ে। অথচ গিরগিটি মানুষের জন্য খুবই উপকারী প্রাণী। ফসলের জন্য ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ এদের মূল খাদ্য। আবার মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু মশা সাবাড় করতেও এদের জুড়ি নেই।

আরও পড়ুন
ভয় মানুষকে হিংস্র করে তোলে। তাই রক্তচোষা শত্রুকে দেখলেই মেরে ফেলার প্রবণতা দেখা যায়। এ কারণেই প্রতিবছর হাজার হাজার নিরীহ গিরগিটি মানুষের আক্রমণে মারা পড়ে।

শরীরে মুখ না লাগিয়ে দূর থেকে কোনো প্রাণীর পক্ষে রক্ত চোষা সম্ভব নয়। আবার মুখ লাগিয়ে রক্ত চুষতে গেলেও বিশেষ ধরনের দাঁত ও জিভের দরকার হয়। হরর মুভিগুলোতে দেখা যায়, রক্তচোষা ভ্যাম্পায়ারদের বিশেষ ধরনের দাঁত আছে। এই দাঁত দিয়ে ত্বক ছিদ্র করে তারপর রক্ত চোষে।

গিরগিটি বেশ দূর থেকে কীটপতঙ্গকে আক্রমণ করে। এ জন্য ব্যবহার করে লম্বা জিভ। এ ধরনের জিভ ব্যবহার করে রক্ত চোষা সম্ভব নয়। রক্ত চোষার জন্য চ্যাপ্টা জিভ ও বিশেষ গঠনের ঠোঁটের দরকার হয়। এ ধরনের জিভ ও ঠোঁট ডিম পাড়া সরীসৃপদের থাকা সম্ভব নয়।

হ্যাঁ, জোঁকের মতো কিছু প্রাণী রক্ত চুষতে পারে। তবে তাদের মুখে একধরনের বিশেষ চোষক থাকে। এ ধরনের চোষকও গিরগিটির মতো মাংসাশী প্রাণীর থাকা সম্ভব নয়।

কামিনীগাছে স্ত্রী গিরগিটি। এরা রং বদলাতে পারে না
ছবি: লেখক

একধরনের বাদুড় আছে, এরা অন্য প্রাণীর রক্ত চুষে খায়। মনে রাখা জরুরি, বাদুড় উড়তে পারে, কিন্তু এরা পাখি নয়। ডিমও পাড়ে না। এরা সরাসরি ছানা জন্ম দেয়। ছানারা মায়ের বুকের দুধ পান করে বেড়ে ওঠে। এ ধরনের বাদুড়ের তীক্ষ্ণ দাঁত আছে। তাই খুব সহজেই অন্য প্রাণীর গায়ে বসে এরা রক্ত পান করতে পারে।

আরও পড়ুন
গিরগিটি বেশ দূর থেকে কীটপতঙ্গকে আক্রমণ করে। এ জন্য ব্যবহার করে লম্বা জিভ। এ ধরনের জিভ ব্যবহার করে রক্ত চোষা সম্ভব নয়। রক্ত চোষার জন্য চ্যাপ্টা জিভ ও বিশেষ গঠনের ঠোঁটের দরকার হয়।

অন্যদিকে গিরগিটি সরীসৃপজাতীয় প্রাণী। এরা ডিম পাড়ে। এদের ছানারা দুধ পান করে না। তাই এদের ঠোঁট ও জিভ রক্তপানের জন্য উপযোগী নয়। এমনকি ত্বক ছিদ্র করতে সক্ষম তীক্ষ্ণ দাঁতও এদের নেই। তাই এদের পক্ষে মানুষ তো দূর অস্ত, অন্য কোনো প্রাণীরই রক্ত পান করা সম্ভব নয়। অর্থাৎ রক্ত গিরগিটির খাবার নয়।

স্ত্রী গিরিগিটিকে মুগ্ধ করতে কামিনীগাছে হাজির এই পুরুষ গিরগিটি। ধীরে ধীরে এর মাথার রং লাল হচ্ছে
ছবি: লেখক

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের সরীসৃপবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ডেভিড ব্ল্যাকবার্ন এ বিষয়ে গবেষণা করছেন। তিনি বলেন, ‘গিরগিটি কখনোই রক্তপায়ী নয়। এরা পতঙ্গভুক। এদের প্রধান খাবার ফড়িং, ঝিঁঝি পোকা, ছোট মাকড়সা এবং বিভিন্ন ধরনের পোকা।’

আরও পড়ুন
গিরগিটি সরীসৃপজাতীয় প্রাণী। এরা ডিম পাড়ে। এদের ছানারা দুধ পান করে না। তাই এদের ঠোঁট ও জিভ রক্তপানের জন্য উপযোগী নয়। এমনকি ত্বক ছিদ্র করতে সক্ষম তীক্ষ্ণ দাঁতও এদের নেই।

গিরগিটি নিয়ে ভুল ধারণা এদের রং বদলানোর ক্ষমতার কারণে। সেটি ওরা করে পরিবেশের সঙ্গে মিশে শত্রুর চোখে ধুলা দেওয়ার জন্য। গিরগিটি ছোট প্রাণী, চারপাশে শত্রুর অভাব নেই। এ জন্য এরা ছদ্মবেশ ধরে। যখন যেখানে থাকে, সেখানকার রঙের সঙ্গে মিলিয়ে শরীরের রং বদলে ফেলে। তখন চোখের সামনে থাকলেও সহজে চোখে পড়ে না।

তবে শুধু আত্মরক্ষার জন্যই গিরগিটি ছদ্মবেশ ধারণ করে না। বাংলাদেশের খুব পরিচিত গিরগিটি কমন গার্ডেন লিজার্ড বা রক্তচোষা। এই প্রজাতির পুরুষ গিরগিটিই কেবল রং বদলাতে পারে। তা-ও আবার একটিমাত্র রঙে, সেটা হলো লাল রং। এরা শুধু আত্মরক্ষার জন্যই রং বদলায় না, আরও একটি কারণ আছে। পুরুষ গিরগিটি স্ত্রী গিরগিটির দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য কখনো কখনো নিজের রং বদলে ফেলে। ধূসর বাদামি রং বদলে টকটকে লাল রঙে রাঙিয়ে ফেলে নিজের মাথা, ঘাড় ও পিঠ। এতে স্ত্রী গিরগিটির কাছে সুন্দর হয়ে ওঠে পুরুষ গিরগিটি। অর্থাৎ রং বদলের এই প্রক্রিয়া গিরগিটির বংশবিস্তার ও টিকে থাকার জন্য অতি জরুরি। অথচ এটাকেই আমরা ভুল ভেবে গিরগিটিকে মেরে ফেলি!

পাঁচিলের ইটের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে নিজের মাথা লাল রঙে রাঙিয়েছে গিরগিটি, এটি একধরনের ছদ্মবেশ
ছবি: লেখক

গিরগিটি কোনো কারণে ভয় পেলেও নিজের রং বদলে ফেলে। এদের ত্বকের নিচে ক্রোমাটোফোরস নামে একধরনের কোষ আছে। ভয় পেলে বা সঙ্গীকে আকৃষ্ট করার সময় হলে এই কোষগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে। তখন এসব কোষে রক্তসঞ্চালন বেড়ে যায়। এতে গিরগিটির ত্বক লাল হয়ে ওঠে। ডেভিড ব্ল্যাকবার্নের মতে, ‘এটি একটি জৈবিক প্রক্রিয়া মাত্র, এর সঙ্গে রক্ত খাওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। এটি ভিত্তিহীন ও কাল্পনিক বিশ্বাস।’

আরও পড়ুন
বাংলাদেশের খুব পরিচিত গিরগিটি কমন গার্ডেন লিজার্ড বা রক্তচোষা। এই প্রজাতির পুরুষ গিরগিটিই কেবল রং বদলাতে পারে। তা-ও আবার একটিমাত্র রঙে, সেটা হলো লাল রং।

সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, গিরগিটির রক্ত চোষার ব্যাপারটা একেবারে ভিত্তিহীন। কারও রক্ত চুষে খেয়েছে, এমন কোনো তথ্য বিজ্ঞানীদের হাতে নেই। তাই বলে গিরগিটি কি কামড় দিতে পারে না? এমনটা নয়। খুব বিপদে পড়লে গিরগিটি কামড়ে দেয়। হয়তো আপনি গিরগিটির লেজ ধরেছেন কিংবা পায়ের নিচে গিরগিটির লেজ চাপা পড়েছে, তখন বাধ্য হয়েই সে আপনাকে কামড়ে দিতে পারে। তবে সে কামড় খুবই মৃদু, হয়তো আঁচড়ের মতো।

গিরগিটি রং বদলায় তার নিজের প্রয়োজনে
ছবি: কাজল হাজরা

যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী জোনাথন লসোস বলেন, ‘গিরগিটির লালা বা কামড়ে বিষধর সাপের মতো কোনো বিষাক্ত উপাদান নেই। তবে তাদের মুখে খুবই সাধারণ ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে। কিন্তু রক্ত চুষে নেওয়া বা মানুষের ক্ষতি করার মতো ক্ষমতা এদের নেই।’

মোদ্দাকথা হলো, গিরগিটি রং বদলায় তার নিজের প্রয়োজনে। তবে এ জন্য মানুষের রক্ত চুষতে হয় না। তাই এই কুসংস্কার আঁকড়ে ধরে ছোট্ট প্রাণীটাকে মেরে ফেলা একদমই ভুল। গিরগিটি মানুষের শত্রু নয়, বরং বন্ধু। তাই এদের রক্ষায় আমাদের এগিয়ে আসা উচিত।

আরও পড়ুন