পাখিরা কীভাবে নিজেদের বাসা নির্বাচন করে
আমরা যখন নতুন কোনো রেস্তোরাঁয় খেতে যাই, তখন চট করে গুগল বা অনলাইনে রেস্তোরাঁটার রিভিউ দেখে নিই। মানুষ সেখানে ভালো ভালো কথা লিখলে আমরা বুঝি জায়গাটা সুবিধার। আর যদি বদনাম থাকে, তবে ভুলেও ওই মুখো হই না।
কিন্তু বনের পশুপাখিদের তো এমন রিভিউ পড়ার সুযোগ নেই। ওরা কীভাবে বাসা নির্বাচন করে? কোন গাছটায় বাসা বানালে নিরাপদে থাকা যাবে, তা কীভাবে বুঝতে পারে পাখিরা?
শুনলে অবাক হবেন, পাখিদেরও আছে রিভিউ ব্যবস্থা। তবে তা আমাদের মতো নয়, পাখিদের মতো করে। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনের বনগুলোতে পাখিরা আসলেই তাদের বাসস্থান নিয়ে ‘রিভিউ’ দেয়। আর পাখিদের সেই রিভিউ শুনেই মানুষ বুঝতে পারছে, জঙ্গলটা সুস্থ আছে কি না।
আদ্রিয়ান উলফ একজন বন সংরক্ষক। তিনি ওয়াশিংটনের গ্রেট পেনিনসুলা কনজারভেন্সি’র স্টুয়ার্ডশিপ ডিরেক্টর। একসময় তিনি স্ট্রিকড হর্নড লার্ক নামে একধরনের বিপন্ন পাখি নিয়ে গবেষণা করতেন। তিনি মজা করে বলেন, ‘ওই পাখির ছানাগুলোকে দেখতে একদম রাগী বুড়ো মানুষের মতো লাগত!’
কিন্তু এখন আদ্রিয়ান শুধু একটা পাখি নিয়ে পড়ে নেই। তিনি পুরো বনের দেখভাল করেন। তাঁর কাজ হলো, পুরোনো বনগুলোকে আবার প্রাকৃতিক রূপ দেওয়া। গাছপালা পাতলা করা, নতুন গাছ লাগানো। মোদ্দা কথা, বনের পরিবেশ আবার ফিরেয়ে আনা। কিন্তু তিনি বুঝবেন কীভাবে যে তাঁর কাজ সঠিক হচ্ছে? এখানেই তিনি সাহায্য নেন পাখিদের।
এই প্রজেক্টটা অত্যন্ত জরুরি। কারণ পৃথিবীজুড়ে পাখির সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমছে। আদ্রিয়ান জানান, ১৯৭০ সাল থেকে এ পর্যন্ত পৃথিবী থেকে প্রায় ৩০০ কোটি পাখি হারিয়ে গেছে।
বিদেশে রেস্তোরাঁ বা সেবার মান যাচাইয়ের জন্য ইয়েলপ নামে একটা জনপ্রিয় অ্যাপ আছে। আদ্রিয়ান উলফ পাখিদের গানকে এই ইয়েলপ রিভিউয়ের সঙ্গে তুলনা করেন। তিনি বলেন, ‘পাখিরা যখন কোনো বনে এসে গান গায়, তার মানে হলো তারা বলছে এই জায়গাটা ভালো। আমি এখানে বারবার আসব। এটাই হলো বনের জন্য সেরা ইতিবাচক রিভিউ। আর যদি বনে পাখির ডাক কমে যায়, তাহলে বুঝতে হবে রিভিউ খারাপ। বনের পরিবেশ তাদের বসবাসের উপযোগী নয়।’
এই প্রজেক্টটা অত্যন্ত জরুরি। কারণ পৃথিবীজুড়ে পাখির সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমছে। আদ্রিয়ান জানান, ১৯৭০ সাল থেকে এ পর্যন্ত পৃথিবী থেকে প্রায় ৩০০ কোটি পাখি হারিয়ে গেছে। শুধু পশ্চিমা বিশ্বের বনগুলো থেকেই উধাও হয়েছে প্রায় ১০০ কোটি পাখি।
এর প্রধান কারণ, তাদের বাসস্থান নষ্ট হয়ে যাওয়া। মানুষ বন কেটে ফেলেছে, অথবা বনকে এমনভাবে সাজিয়েছে যা পাখিদের জন্য মোটেও আরামদায়ক নয়। আদ্রিয়ান উলফ তাই বনকে আবার পাখিদের উপযোগী করে গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন।
২০২২ সালে কর্নেল ল্যাব অব অর্নিথোলজির সহায়তায় আদ্রিয়ান উলফ এবং তাঁর দল একটি পাইলট প্রজেক্ট শুরু করেন। প্রজেক্টের নাম এখন ‘লিসেন আপ কোলাবোরেটিভ’। তাঁরা বনের বিভিন্ন গাছে ছোট ছোট অডিও রেকর্ডার বা সাউন্ডবক্স লাগিয়ে দেন।
এই যন্ত্রগুলো সারাদিন বনের শব্দ রেকর্ড করতে থাকে। উদ্দেশ্য পাখিদের উপস্থিতি টের পাওয়া। এখন পর্যন্ত ওয়াশিংটনের প্রায় ১০০টি জায়গায় এই কার্যক্রম চলছে। বিভিন্ন আদিবাসী গোষ্ঠী এবং ল্যান্ড ট্রাস্টও এই কাজে হাত মিলিয়েছে।
আমরা ইন্টারনেটে পাখির কিচিরমিচিরকে বলি টুইট। কিন্তু আদ্রিয়ান উলফের কাছে এগুলো নিছক শব্দ নয়, এগুলো হলো প্রকৃতির রায়। এই প্রজেক্ট আগামী কয়েক বছর ধরে চলবে।
বনের গাছে লাগানো রেকর্ডারগুলো এখন পর্যন্ত ৪ লাখেরও বেশি পাখির ডাক রেকর্ড করেছে। কিন্তু এত বেশি রেকর্ডিং মানুষের কানে শুনে বিশ্লেষণ করা অসম্ভব। তাই এখানে ব্যবহার করা হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এই এআই প্রোগ্রামটি নিখুঁতভাবে বলে দিতে পারে, কোন ডাকটি কোন পাখির। এখন পর্যন্ত প্রায় ৪৫টি নির্দিষ্ট প্রজাতির পাখির ডাক খুঁজে পেয়েছেন তাঁরা।
এই প্রজেক্টের সবচেয়ে বড় সাফল্যের গল্প সোয়াইনসন’স থ্রাশ নামে একটি পাখি। এর ডাক খুব মিষ্টি। আদ্রিয়ান উলফ লক্ষ্য করলেন, তিনি যেসব বনের গাছপালা একটু পাতলা করে আলো-বাতাস ঢোকার ব্যবস্থা করেছেন, সেখানে এই পাখিটির আনাগোনা বেড়ে গেছে।
রেকর্ডারে বারবার এই পাখির শব্দ ধরা পড়ছে। মানে সোয়াইনসন’স থ্রাশ আদ্রিয়ানের কাজে খুশি হয়ে ‘ফাইভ স্টার’ রিভিউ দিয়েছে! আদ্রিয়ান বলেন, ‘আমরা বনের ঘনত্ব একটু কমিয়ে দেওয়ার পর দেখলাম, পাখিরা সেখানে ফিরে আসছে এবং গান গাইছে। এটা আমাদের জন্য এক বিশাল প্রাপ্তি।’
আমরা ইন্টারনেটে পাখির কিচিরমিচিরকে বলি টুইট। কিন্তু আদ্রিয়ান উলফের কাছে এগুলো নিছক শব্দ নয়, এগুলো হলো প্রকৃতির রায়। এই প্রজেক্ট আগামী কয়েক বছর ধরে চলবে। তিনি এবং তাঁর দল কান পেতে থাকবেন বনের সেই সব রিভিউ শোনার জন্য।
পাখিরা যখন গান গায়, তখন তারা শুধু সঙ্গীদের ডাকে না; তারা আমাদের জানান দেয় যে পৃথিবীটা এখনো বসবাসের যোগ্য আছে। আমাদের শুধু সেই ভাষাটা বোঝার চেষ্টা করতে হবে। পৃথিবী থেকে ৩ বিলিয়ন পাখি হারিয়ে গেছে, আর যেন একটিও না হারায়, সেটাই এখন আদ্রিয়ানের লক্ষ্য।