একুশে একুশ
জীবাণু যখন বন্ধু
একবিংশ শতাব্দী এখনও চলছে, কিন্তু এই সময়টাই আমাদের ভাবনার ভাষা বদলে দিচ্ছে। আগে যেসব প্রশ্নের উত্তর সহজ মনে হতো, সেগুলো এখন নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। মানুষ, জীবন, প্রকৃতি ও মহাবিশ্ব যেন ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। এই বদলের পেছনে আছে কিছু শক্তিশালী ধারণা। সেগুলো শুধু ল্যাবরেটরিতে সীমাবদ্ধ নয়, আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও প্রভাব ফেলছে। নিউ সায়েন্টিস্ট-এ প্রকাশিত তেমন ২১টি ধারণার সঙ্গে আমরা ধীরে ধীরে পরিচিত হব। সেগুলো একবিংশ শতাব্দীর চিন্তাজগৎকে নতুন পথে নিয়ে গেছে।
প্রথম পর্বে থাকছে মাইক্রোবায়োম।
মানুষ নিজের অজান্তেই হাজার হাজার বছর ধরে অণুজীবের ওপর নির্ভরশীল। জীবাণু মানেই যে ক্ষতিকর বা দেহের শত্রু—এই ধারণা ভুল। আসলে সুস্থভাবে বেঁচে থাকতেও এসব অণুজীব কাজে লাগে।
সহজ কথায়, মাইক্রোবায়োম হলো কোনো নির্দিষ্ট পরিবেশে বসবাসকারী সমস্ত অণুজীব এবং তাদের জিনগত উপাদানের সমষ্টি। এরা এতই ছোট যে অণুবীক্ষণ যন্ত্র ছাড়া দেখাও যায় না। কিন্তু নিজেরা ক্ষুদ্র হলেও আমাদের স্বাস্থ্য রক্ষায় এদের ভূমিকা বিশাল। এরা ক্ষতিকর রোগজীবাণু থেকে আমাদের রক্ষা করে, দেহের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলে এবং খাবার হজম করে শক্তি উৎপাদনে সহায়তা করে।
আমাদের শরীরে যতগুলো নিজস্ব কোষ আছে, প্রায় সমপরিমাণ অণুজীব আমাদের সঙ্গেই বাস করে। মানব মাইক্রোবায়োম খুবই বিচিত্র। আমাদের শরীরের একেক জায়গায় একেক ধরনের অণুজীব বসতি গড়ে তোলে। যেমন অন্ত্র, ত্বক, মুখগহ্বর কিংবা নাকের ভেতর আলাদা আলাদা অণুজীবের রাজত্ব। গত ২৫ বছরে বিজ্ঞানীরা এই অদৃশ্য জগতকে নতুন করে চিনেছেন।
লন্ডনের কিংস কলেজের টিম স্পেক্টর বলেন, ‘অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম মানবস্বাস্থ্য সম্পর্কে আমাদের ধারণা আমূল বদলে দিয়েছে। এখন আমরা জানি, আমাদের শরীরের অণুজীবগুলো বিপাকক্রিয়া ও রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা থেকে শুরু করে মানসিক সুস্থতা পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করে।’
আমাদের শরীরে যতগুলো নিজস্ব কোষ আছে, প্রায় সমপরিমাণ অণুজীব আমাদের সঙ্গেই বাস করে। মানবদেহের একেক জায়গায় একেক ধরনের অণুজীব বসতি গড়ে তোলে।
সেই ১৭শ শতকে নেদারল্যান্ডসের মাইক্রোবায়োলজিস্ট আন্তোনি ভ্যান লিউয়েনহুক নিজের মল পরীক্ষা করে প্রথম গিয়ারদিয়া নামে পরজীবীর সন্ধান পান। তবে তাঁর এই পর্যবেক্ষণ বৈজ্ঞানিক স্বীকৃতি পেতে লেগে গিয়েছিল আরও প্রায় দুই শতক। ১৯৭০-এর দশকে গবেষকেরা প্রথম বুঝতে পারেন, অন্ত্রের অণুজীবগুলো ওষুধ ভাঙতে বা হজম করতে সাহায্য করে।
তবে আসল বিপ্লব ঘটে ২০০০-এর দশকে। জেনেটিক সিকোয়েন্সিং ও কম্পিউটিং প্রযুক্তির উন্নতির ফলে এখন জানা গেছে, প্রত্যেক মানুষের আঙুলের ছাপের মতো একটি অনন্য অণুজীবীয় ফিঙ্গারপ্রিন্ট আছে। গবেষণায় দেখা যায়, মাইক্রোবায়োম ও আমাদের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা সরাসরি একে অপরের সঙ্গে জড়িত। এটি অগ্ন্যাশয় থেকে শুরু করে মস্তিষ্ক পর্যন্ত শরীরের নানা সিস্টেমকে প্রভাবিত করে।
সাম্প্রতিক কিছু আবিষ্কার রীতিমতো চমকপ্রদ। যেমন স্থূলতায় আক্রান্ত ইঁদুরের অন্ত্রের অণুজীব সুস্থ ইঁদুরের দেহে প্রবেশ করালে সেটিও মোটা হয়ে যেতে পারে! আবার নির্দিষ্ট কিছু ব্যাকটেরিয়া উস্কে দিতে পারে অটিজম-সদৃশ উপসর্গ। অণুজীবের অকার্যকারিতা ডায়াবেটিস ও পারকিনসন রোগেরও কারণ হতে পারে। যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লিন্ডসে হল বলেন, ‘মানব মাইক্রোবায়োম নিয়ে সাম্প্রতিক আবিষ্কারগুলো বলছে, এর প্রভাব অন্ত্রের অনেক বাইরেও বিস্তৃত।’
গবেষণায় দেখা যায়, মাইক্রোবায়োম ও আমাদের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা সরাসরি একে অপরের সঙ্গে জড়িত। এটি অগ্ন্যাশয় থেকে শুরু করে মস্তিষ্ক পর্যন্ত শরীরের নানা সিস্টেমকে প্রভাবিত করে।
গবেষকেরা এখন বুঝতে পারছেন, অণুজীবের বৈচিত্র্যই ভালো স্বাস্থ্যের ভিত্তি। এটি ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম, বিষণ্ণতা এমনকি কিছু ক্যানসারের চিকিৎসায় সাহায্য করতে পারে।
মাইক্রোবায়োম আমাদের শরীর ও পরিবেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল হিসেবে কাজ করে। পরিবেশের কোনো ক্ষতিকর পদার্থ আমাদের শরীরে কেমন প্রভাব ফেলবে, তা অনেক সময় নির্ভর করে এই অণুজীবদের ওপর। জন্মের শুরুতে মায়ের কাছ থেকে আমরা কিছু নির্দিষ্ট মাইক্রোবায়োম পাই। তবে খাদ্যাভ্যাস, ওষুধ ও পরিবেশের প্রভাবে সময়ের সঙ্গে এটি বদলে যেতে পারে।
এখন আমরা গবেষণার এমন এক পর্যায়ে প্রবেশ করছি, যেখানে এই জ্ঞান ব্যবহার করে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় বিপ্লব ঘটানো সম্ভব। তবে তার জন্য প্রয়োজন আরও সতর্ক ও কঠোর গবেষণা।