৪৫ মিনিটের ঘুম মস্তিষ্কের শেখার ক্ষমতা বাড়ায়
দুপুরের খাওয়ার পর টেবিলে বসেছেন, কিন্তু চোখের পাতা কিছুতেই খোলা রাখতে পারছেন না। শরীরটা ছেড়ে দিচ্ছে, মাথাটা কেমন জ্যাম হয়ে আছে। বস অফিসে নতুন কাজের ফর্দ ধরিয়ে দিচ্ছেন, কিন্তু কোনো কথাই যেন মগজে ঢুকছে না। এই পরিস্থিতি আমাদের সবার কাছেই খুব পরিচিত। অনেকে একে আলসেমি বা ফাঁকিবাজি মনে করেন। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, আপনার মস্তিষ্ক আসলে একটু বিশ্রাম চাইছে। সে জন্য দরকার মাত্র ৪৫ মিনিটের একটা ছোট্ট ঘুম।
সম্প্রতি নিউরোইমেজ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, দুপুরে মাত্র ৪৫ মিনিটের একটা ঘুম আমাদের মস্তিষ্ককে নতুন করে সাজিয়ে তোলে। এটি শুধু ক্লান্তি দূর করে না, নতুন কিছু শেখার জন্য মস্তিষ্ককে নমনীয় এবং প্রস্তুত করে।
সুইজারল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব জেনেভা এবং জার্মানির ইউনিভার্সিটি অব ফ্রাইবুর্গের মেডিকেল সেন্টারের একদল গবেষক মিলে এই গবেষণাটি চালিয়েছেন। তাঁদের মতে, সারাদিন আমরা যখন জেগে থাকি, আমাদের মস্তিষ্ক অবিরাম কাজ করতে থাকে। আমরা যা দেখি, যা শুনি বা যা ভাবি, সবই মস্তিষ্ক প্রসেস করে।
বিজ্ঞানের ভাষায়, এ সময় আমাদের মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষ বা নিউরনগুলোর মধ্যে নতুন নতুন সংযোগ তৈরি হয়। একে বলে সিন্যাপস। আমরা যত বেশি তথ্য নিই, এই সংযোগগুলো তত শক্তিশালী ও ঘন হতে থাকে। শুনতে ভালোই লাগছে, তাই না? কিন্তু সমস্যা হলো, এই সংযোগগুলো বাড়তে বাড়তে একসময় মস্তিষ্ক পরিপূর্ণ হয়ে যায়। অনেকটা স্মার্টফোনের মেমোরি ফুল হয়ে যাওয়ার মতো। তখন চাইলেও নতুন কোনো তথ্য বা পড়া আর মাথায় ঢুকতে চায় না। সিস্টেমটা তখন ধীর হয়ে যায়, নতুন কিছু শেখার ক্ষমতা কমে আসে।
গবেষক দলের প্রধান অধ্যাপক ক্রিস্টফ নিসেন বলেন, ‘আমাদের ফলাফল বলছে, খুব অল্প সময়ের ঘুমও মস্তিষ্ককে নতুন তথ্য ধারণের জন্য প্রস্তুত করতে পারে।’
দুপুরের এই ছোট্ট ঘুমটা অনেকটা ক্লিনারের কাজ করে। এটি মস্তিষ্কের ওই অতিরিক্ত বা অপ্রয়োজনীয় সংযোগগুলোর চাপ কমিয়ে দেয়। একে বিজ্ঞানীরা বলছেন সিন্যাপটিক রিসেট। মজার ব্যাপার হলো, এই রিসেট করার সময় কিন্তু আপনার পুরোনো স্মৃতি মুছে যায় না। বরং অগোছালো তথ্যগুলো গুছিয়ে তথ্যের জন্য জায়গা ফাঁকা করে দেয়। ফলে ঘুম থেকে ওঠার পর মস্তিষ্ক আবার নতুনের মতো কাজ শুরু করতে পারে।
এই পরীক্ষাটি চালানো হয়েছিল ২০ জন সুস্থ তরুণের ওপর। তাঁদের দুই ভাগে ভাগ করা হয়। এক দলকে দুপুরে গড়ে ৪৫ মিনিটের জন্য ঘুমোতে দেওয়া হয়, আর অন্য দলকে জাগিয়ে রাখা হয়। যেহেতু মানুষের মস্তিষ্কের ভেতরের সিন্যাপস সরাসরি মাপা যায় না, তাই বিজ্ঞানীরা ট্রান্সক্র্যানিয়াল ম্যাগনেটিক স্টিমুলেশন এবং ইইজির মতো আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নেন।
যারা ৪৫ মিনিট ঘুমিয়েছেন, তাঁদের মস্তিষ্কের সিন্যাপটিক চাপ কমেছে এবং নতুন সংযোগ তৈরির ক্ষমতা অনেক বেড়েছে। অন্যদিকে যারা জেগে ছিলেন, তাঁদের মস্তিষ্ক ছিল ক্লান্ত এবং নতুন কিছু শেখার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না।
গবেষক দলের আরেক সদস্য অধ্যাপক কাই স্পিগেলহালডার বলেন, ‘মানসিক পুনরুদ্ধারের জন্য এই অল্প সময়ের ঘুম কত জরুরি, তা এই গবেষণা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। এটি আপনাকে আরও পরিষ্কারভাবে চিন্তা করতে এবং পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে সাহায্য করে।’
যেকোনো পেশার মানুষের জন্যই এই পাওয়ার ন্যাপ বা অল্প সময়ের ঘুম উপকারী। তবে বিশেষ করে যাদের মস্তিষ্ক খাটিয়ে কাজ করতে হয়, তাদের জন্য এটি টনিকের মতো কাজ করে। যেমন শিক্ষার্থী, সংগীতশিল্পী, খেলোয়াড়, লেখক কিংবা নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মীরাও এর মধ্যে পড়েন। পরীক্ষার আগে একটানা পড়ার চেয়ে মাঝখানে একটু ঘুমিয়ে নিলে পড়া ভালো মনে থাকে।
তবে গবেষকেরা একটা বিষয়ে সতর্ক করেছেন। ঘুমের সমস্যা হলেই হুটহাট ঘুমের ওষুধ খাওয়া ঠিক নয়। বিশেষ করে যারা ইনসোমনিয়া বা অনিদ্রায় ভোগেন, তাদের ক্ষেত্রে সমস্যাটা মস্তিষ্কের ক্ষমতার নয়, বরং দুশ্চিন্তা ও বাজে অভ্যাসের। ঘুমের ওষুধ মস্তিষ্কের এই প্রাকৃতিক ‘রিসেট’ প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তাই ঘুমের ওষুধ না খেয়ে প্রাকৃতিকভাবে ঘুমানোর চেষ্টা করুন।
আর হ্যাঁ, দুপুরে খাওয়ার পর একটু ঝিমুনি এলে নিজেকে দোষ দেবেন না। বরং সম্ভব হলে ৪৫ মিনিটের জন্য একটু চোখ বুজে নিন। উঠে দেখবেন আবার নিজেকে সতেজ লাগছে!