নিজের নাক ডাকার শব্দে নিজের ঘুম ভাঙে না কেন
রাত দুটো বাজে। সারা বাড়ি নিঝুম, কিন্তু আপনার পাশের মানুষটি এমন বিকট শব্দে নাক ডাকছেন। মনে হচ্ছে কানের কাছে কেউ ড্রিল মেশিন চালাচ্ছে! অতিষ্ঠ হয়ে হয়তো ভাবছেন, এত শব্দের মধ্যে মানুষটা ঘুমাচ্ছে কীভাবে? নিজের শব্দে কি নিজের ঘুম ভাঙে না?
আপনার মনে জাগা এই প্রশ্নটি নিয়েই আমাদের আজকের আলোচনা। এই প্রশ্নের উত্তর আছে বিজ্ঞানে। গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু মানুষ এত জোরে নাক ডাকেন যে তা ১১০ ডেসিবেল পর্যন্ত হতে পারে। শব্দের এই তীব্রতা একটি করাতকলের শব্দের চেয়েও বেশি! অথচ সেই মানুষটি দিব্যি ঘুমাচ্ছেন। এর রহস্য কী?
শুরুতেই একটা মজার তথ্য দিই। মাঝেমধ্যে কিন্তু নাক ডাকা ব্যক্তি নিজের শব্দে নিজেই জেগে ওঠেন! অস্ট্রেলিয়ার সিডনি সেন্টার ফর টিএমজে অ্যান্ড স্লিপ থেরাপির চিকিৎসক মণীশ শাহের মতে, ‘নাক ডাকার শব্দে ঘুম ভেঙে যায় ঠিকই, কিন্তু সেই জেগে থাকা স্থায়ী হয় মাত্র কয়েক সেকেন্ড।’
২০২২ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, নাক ডাকা ব্যক্তিরা রাতে অন্তত চার-পাঁচবার জেগে ওঠার কথা মনে করতে পারেন। তবে যাদের স্লিপ অ্যাপনিয়া১ আছে, তারা শ্বাসকষ্টের কারণে রাতে শত শত বার জেগে উঠলেও সকালে উঠে তার কিছুই মনে করতে পারেন না। একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় মাইক্রো-অ্যারোজাল। মস্তিষ্ক এই ক্ষণিকের জাগরণকে স্মৃতিতে ধরে রাখে না।
অস্ট্রেলিয়ার সিডনি সেন্টার ফর টিএমজে অ্যান্ড স্লিপ থেরাপির চিকিৎসক মণীশ শাহের মতে, ‘নাক ডাকার শব্দে ঘুম ভেঙে যায় ঠিকই, কিন্তু সেই জেগে থাকা স্থায়ী হয় মাত্র কয়েক সেকেন্ড।’
এখন প্রশ্ন হলো, আপনার কানে যে শব্দ বজ্রপাতের মতো ঠেকছে, নাক ডাকা ব্যক্তির কাছে তা কেন নস্যি? এর পেছনে রয়েছে আমাদের মস্তিষ্কের এক অদ্ভুত ফিল্টার ব্যবস্থা, যার নাম থ্যালামাস।
থ্যালামাস অনেকটা আপনার ঘরের দরজার দারোয়ানের মতো। ঘুমের মধ্যে কোন শব্দ ভেতরে ঢুকতে দেবে আর কোনটা দেবে না, তা সে ঠিক করে। যেমন ধরুন, জানালার বাইরের রাস্তার ট্র্যাফিকের শব্দ বা ঘরের সিলিং ফ্যানের ঘড়ঘড় শব্দকে থ্যালামাস কম গুরুত্বপূর্ণ বলে ফিল্টার করে দেয়। কিন্তু কেউ আপনার নাম ধরে ডাকলে বা ফায়ার অ্যালার্ম বাজলে সে সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্ককে জাগিয়ে তোলে। নাক ডাকার শব্দকেও থ্যালামাস অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় শব্দ হিসেবে বাতিল করে দেয়।
মস্তিষ্কের আরেকটি জাদুকরী ক্ষমতা হলো সেন্সরি গেটিং। যখন আমরা নিজেরা কোনো শব্দ করি, মস্তিষ্ক আগে থেকেই তা জানে। যেমন, নিজের সুড়সুড়িতে হাসি পায় না, কারণ মস্তিষ্ক জানে স্পর্শটা আপনার নিজেরই। ঠিক তেমনি, অবচেতন মন জানে যে নাক ডাকার এই বিকট শব্দটা নিজের শরীর থেকেই আসছে এবং এটি কোনো বিপদ নয়। তাই মস্তিষ্ক এই শব্দের তীব্রতাকে কমিয়ে দেয় বা অগ্রাহ্য করে। একে বলে করোলারি ডিসচার্জ। অর্থাৎ নিজের কাজের সংকেত মস্তিষ্ক আগেই পেয়ে যায়, তাই চমকে ওঠে না।
মস্তিষ্কের একটি জাদুকরী ক্ষমতা হলো সেন্সরি গেটিং। যখন আমরা নিজেরা কোনো শব্দ করি, মস্তিষ্ক আগে থেকেই তা জানে। যেমন, নিজের সুড়সুড়িতে হাসি পায় না কারণ মস্তিষ্ক জানে স্পর্শটা আপনার।
নাক ডাকা কেবল অন্যের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায় না, এটি আপনার স্বাস্থ্যের জন্যও বড় হুমকি হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানের হেনরি ফোর্ড মেডিকেল সেন্টারের স্নায়ু বিশেষজ্ঞ ভার্জিনিয়া স্কিবা বলছেন, ‘নাক ডাকা কমাতে হলে প্রথমেই চিৎ হয়ে ঘুমানো বন্ধ করতে হবে। কারণ চিৎ হয়ে ঘুমালে মাধ্যাকর্ষণ আপনার শ্বাসনালির ওপর কাজ করে এবং বাতাস চলাচলের পথ সরু করে দেয়। ফলে নাক ডাকার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। এর বদলে পাশ ফিরে ঘুমানোর অভ্যাস করুন।’
নাক ডাকাকে অবহেলা করা উচিত নয়। কারণ তীব্র নাক ডাকা অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়ার২ লক্ষণ হতে পারে। ফলে উচ্চ রক্তচাপ, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক এমনকি ডায়াবেটিসের মতো ভয়াবহ রোগ হতে পারে। যদি সমস্যা গুরুতর হয়, তবে চিকিৎসকরা ‘CPAP’ মেশিনের৩ পরামর্শ দেন। এই আধুনিক মেশিনগুলো অনেকটা ফিসফিসানির মতো মৃদু শব্দ করে চলে এবং মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে তা মানিয়ে নেয়।
আমাদের মস্তিষ্ক নিজের তৈরি শব্দকে বন্ধু ভেবে এড়িয়ে যায়, আর অন্যের শব্দকে শত্রু ভেবে জাগিয়ে তোলে। তাই নাক ডাকা কেবল একটি বিরক্তিকর শব্দ নয়, এটি আপনার শরীরের একটি সংকেতও হতে পারে।