বৃষ্টি ও দুর্যোগের দিনে যেভাবে জীবন বাঁচাতে পারে প্রযুক্তি

টানা গরমের পর ঢাকায় নেমেছিল ঝুম বৃষ্টিছবি: সংগৃহীত

আকাশে মেঘের ঘনঘটা, হঠাৎ করেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি! বর্তমানে বাংলাদেশের আবহাওয়া ঠিক এমনই। সকালে হয়তো অফিসে বা ক্যাম্পাসে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছেন, এমন সময় দেখলেন আকাশ কালো হয়ে এল। আপনি নিশ্চয়ই চট করে মোবাইলে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে নেন? ছাতা নিয়ে বের হবেন, নাকি ভারী বৃষ্টির কারণে ঘরেই থাকবেন; সেই সিদ্ধান্ত নিতে এই ছোট পূর্বাভাসটি দারুণ কাজে দেয়।

কিন্তু আবহাওয়ার পূর্বাভাস কি কেবল আমাদের বৃষ্টিতে ভেজা বা জলাবদ্ধতায় আটকে পড়া থেকেই বাঁচায়? মোটেও না! বিজ্ঞান বলছে, নিখুঁত এবং সঠিক আবহাওয়ার পূর্বাভাস সরাসরি মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে।

সম্প্রতি প্রসিডিংস অফ দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অফ সায়েন্সেস জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ঠিক এই কথাটিই বলা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ডেরেক লেমোইন এবং তাঁর দল এই গবেষণাটি করেছেন। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন কলাম্বিয়া, ওরেগন এবং প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরাও।

অধ্যাপক লেমোইনের এই গবেষণার মূল বিষয় ছিল চরম গরম বা দাবদাহ। গবেষকেরা ২০০৪ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদিনের আবহাওয়ার পূর্বাভাস, আসল আবহাওয়ার রেকর্ড এবং রোগনিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের মানুষের মৃত্যুর হিসাব একসঙ্গে মিলিয়ে দেখেছেন।

আরও পড়ুন
অধ্যাপক লেমোইন বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যে হারে গরম বাড়ছে, নিখুঁত পূর্বাভাস সেই চরম বিপদের প্রভাবকে অনেকটাই কমিয়ে দিতে পারে।’

তাঁরা দেখেছেন, তাপমাত্রা এবং মানুষের মৃত্যুর হারের মধ্যে সবচেয়ে বড় সম্পর্ক লুকিয়ে আছে আবহাওয়ার পূর্বাভাসের নির্ভুলতার ওপর। পূর্বাভাস যদি গরমের মাত্রাকে কম করে দেখায়, অর্থাৎ ভুল তথ্য দেয়, তখন মৃত্যুঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। কারণ মানুষ তখন বিপদের জন্য প্রস্তুত থাকে না।

গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রযুক্তিগত উন্নতির কারণে আবহাওয়ার পূর্বাভাস যদি আরও নিখুঁত হয়, তবে ২১০০ সাল নাগাদ চরম গরমের কারণে মৃত্যুর হার ১৮ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব! অধ্যাপক লেমোইন বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যে হারে গরম বাড়ছে, নিখুঁত পূর্বাভাস সেই চরম বিপদের প্রভাবকে অনেকটাই কমিয়ে দিতে পারে।’

গবেষকেরা ২০২৫ সালের শুরুর দিকে পেশাদার আবহাওয়াবিদদের ওপর একটি জরিপ চালান। ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা অন্যান্য প্রযুক্তির সাহায্যে পূর্বাভাস কতটা নিখুঁত হতে পারে, তা নিয়ে তাঁরা তিনটি ভিন্ন মডেল তৈরি করেন। এর মধ্যে ছিল খুব ভালো, খুব খারাপ এবং শতভাগ নিখুঁত মডেল।

গবেষকেরা দেখেন, আবহাওয়ার পূর্বাভাসে যদি বিনিয়োগ কমানো হয় এবং পূর্বাভাসের মান খারাপ হয়, তবে চরম আবহাওয়ায় মানুষের মৃত্যু আরও বাড়বে। অন্যদিকে, প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে পূর্বাভাস নিখুঁত করা গেলে, তা অর্থনীতিতেও বিশাল অবদান রাখবে। কারণ এটি সরাসরি অসংখ্য মানুষের জীবন বাঁচাবে।

আরও পড়ুন
গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রযুক্তিগত উন্নতির কারণে আবহাওয়ার পূর্বাভাস যদি আরও নিখুঁত হয়, তবে ২১০০ সাল নাগাদ চরম গরমের কারণে মৃত্যুর হার ১৮ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব!

এতক্ষণ তো যুক্তরাষ্ট্রের কথা বললাম, এবার আমাদের দেশের কথায় ফেরা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের ওই গবেষণায় গরমকে ফোকাস করা হলেও, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি আমাদের অতিবৃষ্টি, বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ের জন্য সমানভাবে সত্যি।

এই যে এখন বৃষ্টি হচ্ছে, এর সঠিক ও আগাম পূর্বাভাস জানা থাকলে আমাদের দেশের কৃষকেরা তাঁদের ফসলের ক্ষতি এড়াতে পারেন। উপকূলের জেলেরা আগেভাগেই জানতে পারেন কখন সমুদ্রে যাওয়া নিরাপদ নয়। পাহাড়ি এলাকার মানুষেরা ভূমিধসের আগেই নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে পারেন।

আবহাওয়ার সঠিক ও আগাম পূর্বাভাস জানা থাকলে আমাদের দেশের কৃষকেরা তাঁদের ফসলের ক্ষতি এড়াতে পারেন
ছবি: গেটি ইমেজ

এমনকি শহরের মানুষেরাও জলাবদ্ধতা বা ডেঙ্গুর মতো পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব থেকে বাঁচতে নিজেদের দৈনন্দিন কাজের পরিকল্পনা বদলাতে পারেন।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি চরম আবহাওয়া দেখা যায়। কখনো প্রচণ্ড তাপদাহ, আবার কখনো টানা বৃষ্টি। প্রকৃতিকে তো আর আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারব না। কিন্তু নিখুঁত পূর্বাভাসের মাধ্যমে আমরা আগে থেকেই সতর্ক হয়ে নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে পারি।

সূত্র: ইউনিভার্সিটি অব অ্যারিজোনা

আরও পড়ুন