পোকামাকড় কেন সমুদ্রে বাস করতে পারে না
মশা, মাছি, পিঁপড়া বা তেলাপোকার রাজত্ব প্রায় সবখানে। আমাদের চারপাশের এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে এদের রাজত্ব নেই। মাটি, আকাশ, মিঠা পানির খালবিল কিংবা দুর্গম জঙ্গল; সব জায়গায় এরা দিব্যি মানিয়ে নিয়েছে। পৃথিবীর এত এত জায়গায় যাদের অবাধ বিচরণ, সেই পোকামাকড়দের একটি জায়গায় আপনি কখনোই খুঁজে পাবেন না। সেটি হলো সমুদ্র! আমাদের এই গ্রহের তিন-চতুর্থাংশ জুড়েই সমুদ্রের বিশাল জলরাশি। অথচ সেখানে পোকামাকড়ের কোনো অস্তিত্ব নেই। এত দিন কেউ নিশ্চিত করে জানত না এর পেছনের আসল কারণ কী। তবে সাম্প্রতিক একটি গবেষণা এই রহস্য সমাধানে এক নতুন পথের সন্ধান দিয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীদের মধ্যে একটি জনপ্রিয় ধারণা ছিল, সমুদ্রের গভীরের প্রচণ্ড জলের চাপে পোকামাকড়ের শ্বাসতন্ত্র হয়তো টিকে থাকতে পারে না। শ্বাসতন্ত্র হয়তো চুপসে যায়। কিন্তু নতুন এই গবেষণাপত্রটি এই পুরোনো তত্ত্বটিকে পুরোপুরি বাতিল করে দিয়েছে।
গবেষকেরা প্রমাণ হিসেবে হাজির করেছেন আফ্রিকার মালাউই হ্রদের চাওবোরাস এডুলিস (Chaoborus edulis) নামে একধরনের মাছির লার্ভা। তাঁরা দেখেছেন, শিকারি মাছের হাত থেকে নিজেদের বাঁচাতে এই লার্ভাগুলো হ্রদের প্রায় ২৫০ মিটার গভীরে অনায়াসে ডুব দিতে পারে! ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলম্বিয়ার প্রাণিবিদ্যার সহযোগী অধ্যাপক ও এই গবেষণার সহ-লেখক ফিলিপ ম্যাথিউস ব্যাপারটি নিয়ে বেশ অবাক। তাঁর মতে, একটি খুদে পতঙ্গ জলের এত গভীরে গিয়ে টিকে থাকতে পারে, তা বিজ্ঞানীদের কল্পনারও বাইরে ছিল।
গবেষকেরা দেখেছেন, শিকারি মাছের হাত থেকে নিজেদের বাঁচাতে আফ্রিকার মালাউই হ্রদের চাওবোরাস এডুলিস মাছির লার্ভাগুলো হ্রদের প্রায় ২৫০ মিটার গভীরে অনায়াসে ডুব দিতে পারে!
বিজ্ঞানীরা সোনার প্রযুক্তি ব্যবহার করে হ্রদের পানিতে লার্ভাগুলোর গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। তাঁরা দেখতে পান, লার্ভাগুলোর জীবনচক্র বেশ অদ্ভুত। রাতের অন্ধকারে যখন মাছের ভয় কম থাকে, তখন এরা নিশ্চিন্তে পানির ওপরের দিকে ভেসে বেড়ায়। কিন্তু দিনের আলো ফুটতেই যখন শিকারি মাছের আনাগোনা বাড়ে, তখন এরা নিজেদের বাঁচাতে ২৫৮ মিটার গভীর পর্যন্ত ডুব দেয়।
কিন্তু এত গভীরে জলের প্রচণ্ড চাপে এরা বাঁচে কীভাবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিজ্ঞানীরা কিছু লার্ভা হ্রদ থেকে তাদের গবেষণাগারে নিয়ে আসেন। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বেরিয়ে আসে একটি চমকপ্রদ তথ্য। পোকামাকড়ের শ্বাসযন্ত্র মূলত রেসিলিন নামে একধরনের বিশেষ প্রোটিন দিয়ে তৈরি।
অন্যান্য পোকামাকড়ের শরীরে এই প্রোটিনটি সাধারণত শক্তি সঞ্চয় করা বা বাইরের খোলসকে রক্ষা করার মতো নিষ্ক্রিয় কাজ করে। কিন্তু এই হ্রদের মাছিগুলোর ক্ষেত্রে ব্যাপারটি সম্পূর্ণ আলাদা। এদের শরীরের রেসিলিন প্রোটিনটি জলের চাপের সঙ্গে তাল মিলিয়ে খুব সুন্দরভাবে সংকুচিত ও প্রসারিত হতে পারে। ফলে গভীর জলের প্রচণ্ড চাপেও এদের বাতাসের থলি চুপসে যায় না।
কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অন্টারিওর জীববিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক নাতাশা মাত্রে এই গবেষণাটিকে আক্ষরিক অর্থেই ‘অসাধারণ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, একটি প্রাণীর জৈব রসায়ন কীভাবে তার শারীরিক কাঠামোকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং সেই কাঠামো কীভাবে তাকে ওই নির্দিষ্ট পরিবেশে টিকিয়ে রাখে—এই গবেষণাটিতে তার এক অপূর্ব সমন্বয় তুলে ধরা হয়েছে।
হ্রদের মাছিগুলোর শরীরের রেসিলিন প্রোটিনটি জলের চাপের সঙ্গে তাল মিলিয়ে খুব সুন্দরভাবে সংকুচিত ও প্রসারিত হতে পারে। ফলে গভীর জলের প্রচণ্ড চাপেও এদের বাতাসের থলি চুপসে যায় না।
তবে এত চমৎকার একটি আবিষ্কারের পরও মূল প্রশ্নটা কিন্তু থেকেই যাচ্ছে। জলের চাপই যদি মূল বাধা না হয়, তবে ঠিক কোন কারণে সমুদ্রের লোনা জলে কোনো পোকামাকড় স্থায়ীভাবে বাসা বাঁধতে পারে না? ফিলিপ ম্যাথিউস বলেন, ‘আমরা অন্তত এইটুকু প্রমাণ করতে পেরেছি যে, জলের চাপ কোনো অলঙ্ঘনীয় বাধা নয়। কিন্তু সমুদ্রের বিশাল ও রহস্যময় পরিবেশে ঠিক কোন জিনিসটা তাদের ঢুকতে বাধা দিচ্ছে, সেই প্রশ্নটি এখনো অমীমাংসিতই রয়ে গেল।’
হয়তো অদূর ভবিষ্যতে নতুন কোনো গবেষণায় বেরিয়ে আসবে এই অজানা রহস্যের উত্তর!