প্রচণ্ড শীতে কি সত্যিই গাছ ফেটে যায়

গাছ ফাটার বিষয়টাকে বলে পোলার ভর্টেক্সছবি: ডিপোজিট ফটো

যেসব দেশে প্রচণ্ড শীত পড়ে, সেখানকার মানুষ এক অদ্ভুত ভয়ের মধ্যে আছে। এক তো হাড়কাঁপানো শীত, তার ওপর আবহাওয়াবিদরা সতর্ক করে দিয়েছেন, মেরু অঞ্চলের হিমশীতল ঝড় ধেয়ে আসছে। তাপমাত্রা নামতে পারে মাইনাস ২৫ ডিগ্রিতে! এর মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে এক আজব খবর, প্রচণ্ড ঠান্ডায় নাকি গাছ বোমার মতো বিস্ফোরিত হতে পারে! ব্যাপারটা কি গুজব, নাকি সত্যি? চলুন, জানা যাক।

প্রচণ্ড শীতে গাছ ফেটে যেতে পারে
ছবি: এক্স ডটকম

গাছ ফাটার এই বিষয়টাকে বলে পোলার ভর্টেক্স। এটি হলো পৃথিবীর দুই মেরু অঞ্চলের ওপর ঘুরতে থাকা এক বিশাল বাতাসের কুণ্ডলী। সাধারণত এটি মেরু অঞ্চলের ওপরেই থাকে। কিন্তু মাঝেমধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বা বাতাসের চাপে এটি নিজের জায়গা থেকে সরে নিচে নেমে আসে। তখন মেরু অঞ্চলের সেই হাড়জমানো ঠান্ডা বাতাস ছড়িয়ে পড়ে লোকালয়ে। এখন যুক্তরাষ্ট্রে ঠিক এটাই হচ্ছে। উত্তর মেরু থেকে নেমে আসা এই হিমশীতল বাতাসের কারণেই তাপমাত্রা হিমাঙ্কের অনেক নিচে নেমে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন
গাছ ফাটার বিষয়টাকে বলে পোলার ভর্টেক্স। এটি হলো পৃথিবীর দুই মেরু অঞ্চলের ওপর ঘুরতে থাকা এক বিশাল বাতাসের কুণ্ডলী। সাধারণত এটি মেরু অঞ্চলের ওপরেই থাকে।

গাছ কি আসলেই ফাটে?

হ্যাঁ, গাছ ফাটতে পারে। তবে ইন্টারনেটে যেভাবে বলা হচ্ছে বোমার মতো দপ করে ফেটে যাবে, ব্যাপারটা ঠিক তেমন নয়। একে বিস্ফোরণ না বলে জোরে শব্দ করে ফেটে যাওয়া বলাই ভালো। শত শত বছর ধরে মানুষ এই ঘটনার সাক্ষী। ১৮ শতকের স্কটিশ উদ্ভিদবিদ জন ক্লডিয়াস লিখেছিলেন, ১৬৮৩ সালের এক প্রচণ্ড শীতে ওক ও ওয়ালনাট গাছের কাণ্ড এমনভাবে ফেটে গিয়েছিল, দেখে মনে হচ্ছিল কেউ গুলি ছুড়ছে! এমনকি আমেরিকার আদিবাসী লাকোটা সম্প্রদায়ের মানুষ শীতকালের একটি নির্দিষ্ট মাসকে ডাকে চানাপোপা উই নামে। এর অর্থ শীতে গাছ ফেটে যাওয়ার চাঁদ।

এর পেছনে আছে পদার্থবিজ্ঞানের খুব সহজ এক সূত্র। আমরা জানি, পানি জমে বরফ হলে আয়তনে বাড়ে। গাছের ভেতরে থাকে রস। তাপমাত্রা যখন হিমাঙ্কের নিচে নামে, তখন গাছের ভেতরের এই রস জমতে শুরু করে।

বাইরের বাকলের সংকোচন আর ভেতরের রসের প্রসারণের চাপে টিকতে না পেরে গাছ বিকট শব্দে ফেটে যায়
ছবি: রেডিট

কিন্তু যদি তাপমাত্রা মাইনাস ২০ ডিগ্রিরও নিচে নেমে যায়, তখন ঘটে বিপদ। প্রচণ্ড ঠান্ডায় গাছের বাইরের বাকল বা ছাল সংকুচিত হয়ে ছোট হতে চায়। কিন্তু ভেতরে জমে যাওয়া রস তখনো প্রসারিত হয়ে জায়গা দখল করে আছে। বাইরের বাকলের এই সংকোচন এবং ভেতরের রসের প্রসারণের কারণে গাছের বাকল আর চাপ ধরে রাখতে পারে না। ধড়াস করে বিকট শব্দে তা ফেটে যায়। অনেকটা ডিপ ফ্রিজে কাচের বোতলে পানি রেখে দিলে যেমন ফেটে যায়, ঠিক তেমনি। সাধারণত ম্যাপল, ওক, আপেল বা উইলো গাছে এটা বেশি হয়। তাপমাত্রা খুব দ্রুত কমে গেলে এই শব্দ শোনা যেতে পারে।

গাছ ফাটলে বিকট শব্দ হতে পারে, শুনে মনে হতে পারে গুলি ফুটছে। কিন্তু এতে মানুষের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। গাছটির হয়তো কিছুটা ক্ষতি হয়, কিন্তু বসন্ত এলে বেশির ভাগ গাছই আবার নিজেকে সারিয়ে নেয়। তাই গাছ ফেটে যাওয়ার খবরে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। বরং ভয় পাওয়া উচিত বেশি ঠান্ডাকে। কারণ, ওই ঠান্ডায় হাইপোথার্মিয়া হওয়ার ঝুঁকি গাছের ফেটে যাওয়ার চেয়ে অনেক বেশি।

লেখক: প্রাক্তন শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, ঢাকা

সূত্র: পপুলার সায়েন্স

আরও পড়ুন