শহরের জীবন কি আমাদের অসুস্থ করে তুলছে
আমাদের পূর্বপুরুষেরা যে পৃথিবীতে বেঁচে ছিলেন, আজকের আধুনিক দুনিয়া তার চেয়ে যোজন যোজন দূরে। আধুনিক জীবন আমাদের আরাম-আয়েশ দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু অনেক গবেষক মনে করেন, আমাদের দেহ এই কংক্রিটের চার দেয়ালে আটকে থাকার জন্য তৈরি হয়নি।
দূষণ আর শহুরে কোলাহল যে আমাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের বারোটা বাজাচ্ছে, তা আমরা সবাই কমবেশি বুঝি। কিন্তু এই শহুরে জীবন আমাদের মলিকিউলার লেভেলে কী ক্ষতি করছে? এর উত্তর খুঁজতেই সুইজারল্যান্ডের জুরিখ ইউনিভার্সিটি এবং যুক্তরাজ্যের লোফবরো ইউনিভার্সিটির একদল বিজ্ঞানী মিলে তৈরি করেছেন হিউম্যান এভোলিউশনারি ইকোলজিক্যাল ফিজিওলজি বা হিপ রিসার্চ গ্রুপ। তাঁদের লক্ষ্য একটাই, শহর আর প্রকৃতি মানুষের দেহে কী কী পরিবর্তন আনে, তা মেপে দেখা।
আধুনিকতার ছোঁয়ায় মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে। জনসংখ্যা ৮০০ কোটি ছাড়িয়েছে। দেখে মনে হতে পারে, আমরা দিব্যি ভালোই আছি। কিন্তু ওপরের এই চকচকে আবরণের নিচেই লুকিয়ে আছে বিপদের সংকেত।
গবেষক দলের প্রধান কলিন শ একটি ভয়ংকর তথ্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘২০২৫ সালে এসে আমাদের গড় শুক্রাণুর সংখ্যা ১৯৫০ সালের তুলনায় ৬৭ শতাংশ কমে গেছে! পরিবেশের দূষণ, প্লাস্টিক আর কীটনাশকই এর জন্য দায়ী।’
আসলেই বনের পরিবেশ মানুষের মন ভালো করে দেয়। বিশেষ করে আলফা পাইনিন নামের এক রাসায়নিক নির্গত হয় গাছ থেকে। এই রাসায়নিক আমাদের বিষণ্নতা কমাতে সাহায্য করে।
শুধু তা-ই নয়, শহুরে জীবনে আমাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমছে। অটোইমিউন রোগ বাড়ছে। এমনকি শহরের মানুষের বুদ্ধিও গ্রামের মানুষের তুলনায় নাকি কমে যাচ্ছে। গবেষকদের মতে, আমরা হাজার হাজার বছর ধরে প্রকৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে বড় হয়েছি। কিন্তু মাত্র কয়েক শ বছরের মধ্যে সেই পরিবেশ আমরা ধ্বংস করে ফেলেছি। বানিয়েছি এমন এক কৃত্রিম জগৎ, যার সঙ্গে আমাদের শরীর তাল মেলাতে পারছে না। একেই বিজ্ঞানীরা বলছেন এনভায়রনমেন্টাল মিসম্যাচ।
গবেষকেরা দেখেছেন, শহরের মানুষ যদি বনের ভেতর এক বিকেল কাটিয়ে আসে, তবে তাদের শক্তি ও গতি দুটোই বেড়ে যায়! পিএইচডি গবেষক ম্যাট পুটল্যান্ড দেখেছেন, বনের মধ্যে দৌড়ালে মানুষ বেশি পথ দৌড়াতে পারে। এতে তারা আনন্দও পায় বেশি।
শুধু ব্যায়াম নয়, বনের ভেতর মাত্র তিন ঘণ্টা কাটিয়ে এলেই হার্ট রেট, ব্লাড প্রেসার আর স্ট্রেস হরমোন কমে যায়। সুইজারল্যান্ডের সুইস ফেডারাল ইনস্টিটিউট ফর স্নো অ্যান্ড অ্যাভাল্যাঞ্চ রিসার্চ সেন্টারের গবেষক জোরা ভ্যান ডার বি দেখেছেন, শহরের দূষণ আর শব্দ আমাদের শরীরে স্ট্রেস বাড়ায়। আর বনের পরিবেশ শরীরকে রিলাক্সেশন মোডে নিয়ে যায়।
আসলেই বনের পরিবেশ মানুষের মন ভালো করে দেয়। বিশেষ করে আলফা পাইনিন নামের এক রাসায়নিক নির্গত হয় গাছ থেকে। এই রাসায়নিক আমাদের বিষণ্নতা কমাতে সাহায্য করে। তাই শহরের ভেতরে বেশি বেশি গাছ লাগালে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য ভালো হতে পারে।
গবেষক জোরা ভ্যান ডার বি দেখেছেন, শহরের দূষণ আর শব্দ আমাদের শরীরে স্ট্রেস বাড়ায়। আর বনের পরিবেশ শরীরকে রিলাক্সেশন মোডে নিয়ে যায়।
এমনকি শুধু প্রকৃতির শব্দ শুনলেও লাভ হয়! চোখ বেঁধে কাউকে বনের শব্দ আর কাউকে শহরের শব্দ শুনিয়ে দেখা গেছে, যারা বনের শব্দ শুনেছে, তাদের মেজাজ আর মনোযোগ অনেক ভালো ছিল।
আমাদের শরীর সুস্থ থাকার জন্য নানা ধরনের অণুজীব দরকার। সুইজারল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব জুরিখের পিএইচডি গবেষক রনিয়া শ্মল দেখেছেন, শহরের চেয়ে বনের বাতাসে অণুজীবের বৈচিত্র্য অনেক বেশি। মাত্র এক ঘণ্টা পার্কে হাঁটলেই আমাদের ত্বক আর নাকে উপকারী জীবাণু প্রবেশ করে। এসব জীবাণু আমাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায়।
শহরে এই বৈচিত্র্য নেই বলেই সেখানকার মানুষের অ্যালার্জি ও অটোইমিউন রোগ বেশি হয়। সুইজারল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব জুরিখের আরেক গবেষক লিয়ান্ড্রা কইশ দেখিয়েছেন, পরিবেশ বদলালে আমাদের রক্তে থাকা ইমিউন কোষগুলোও আচরণ বদলে ফেলে।
কিন্তু এই সমস্যার সমাধান কী হতে পারে? আমরা তো আর বনে ফিরে যেতে পারব না। তাই শহরকেই বদলাতে হবে। গবেষকেরা চাইছেন, তাঁদের এই তথ্যগুলো কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতের শহরগুলোকে নতুনভাবে ডিজাইন করা হোক। বেশি করে গাছ লাগানো, দূষণ কমানো ও প্রকৃতির ছোঁয়া রেখে শহর নতুনভাবে ডিজাইন করা যেতে পারে।
শহর আমাদের দরকার। কিন্তু সেই শহর যেন আমাদের অসুস্থ না করে, সেটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।