চাপে থাকলে নাক ঠান্ডা হয়ে যায়, বলছে গবেষণা

ডান পাশের থার্মাল ছবিতে দেখা যাচ্ছে নাকের তাপমাত্রা কমে যাচ্ছে। কারণ মানসিক চাপ আমাদের রক্ত প্রবাহে প্রভাব ফেলে।ছবি: বিবিসি

হঠাৎ তিনজন অচেনা মানুষের সামনে দাঁড় করিয়ে আপনাকে বলা হলো, ‘আপনার স্বপ্নের চাকরি নিয়ে পাঁচ মিনিটের একটা বক্তৃতা দিন!’ নিশ্চয়ই একটু ভড়কে যাবেন। এরপর যদি আপনাকে আবার ১৭-এর ঘরের নামতা পেছন থেকে পড়তে বলা হয়, তাহলে কেমন লাগবে? হয়তো আপনি গুণে গুণে বলতে পারবেন, কিন্তু নিজের মধ্যে প্রচণ্ড চাপ অনুভব করবেন। সেই মূহূর্তে যদি আপনার সামনে একটা থার্মাল ক্যামেরা সেট করা থাকে, তাহলে আপনার স্ট্রেস পুরোটা তাতে ধরা পড়বে।

যুক্তরাজ্যের সাসেক্স ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানীরা এমন একটা পরীক্ষার আয়োজন করেছিলেন। তাঁরা থার্মাল ক্যামেরা ব্যবহার করে স্ট্রেস নিয়ে গবেষণা করছেন। বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন, মানুষ যখন তীব্র মানসিক চাপে থাকে, তখন তার মুখে রক্ত প্রবাহের ধরনে পরিবর্তন আসে। বিশেষ করে, নাকের তাপমাত্রা দ্রুত কমে যায়। অর্থাৎ, ঠান্ডা হয়ে যায় নাক। এই ‘নাক ঠান্ডা’ দেখেই বোঝা যায়, একজন মানুষ কতটা চাপে আছেন।

পরীক্ষাটি ইচ্ছে করেই এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যাতে ক্যামেরার সামনের মানুষটি চমকে যায়। ধরে নিই, ক্যামেরার সামনে ‘ক’ নামে একজন মানুষ ছিলেন। সে জানত না, তার জন্য কী অপেক্ষা করছে। প্রথমে তাকে একটি ঘরে বসিয়ে হেডফোনে ‘হোয়াইট নয়েজ’ (এক ধরনের শব্দ) শুনতে দেওয়া হয়। বেশ শান্ত পরিবেশ। কিন্তু এরপরই ঘরে ঢুকলেন তিনজন অচেনা লোক। তাঁরা ‘ক’ নামে ব্যক্তির দিকে নীরবে তাকিয়ে রইলেন। তারপর জানালেন, তাকে তিন মিনিট সময় দেওয়া হলো ‘স্বপ্নের চাকরি’ নিয়ে পাঁচ মিনিটের একটি বক্তৃতা তৈরির জন্য।

আরও পড়ুন
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটা আমাদের শরীরের একটা প্রাচীন আত্মরক্ষার কৌশল। যখন আমরা বিপদ বা চাপের মুখে পড়ি, তখন আমাদের স্নায়ুতন্ত্র নাক থেকে রক্ত সরিয়ে চোখ ও কানের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে পাঠিয়ে দেয়।

‘ক’ ঘাড়ের কাছে চাপ অনুভব করছিলেন। থার্মাল ক্যামেরায় দেখা গেল, তার মুখ গরম হলেও নাকটা দ্রুত ঠান্ডা হয়ে নীল হয়ে যাচ্ছে! নাকের তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমে গিয়েছিল। এই গবেষণায় অংশ নেওয়া অন্য ২৯ জন স্বেচ্ছাসেবীর ক্ষেত্রে এই তাপমাত্রা ৩-৬ ডিগ্রি পর্যন্ত কমেছিল।

আমরা যখন তীব্র মানসিক চাপের মধ্যে থাকি, তখন মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই নাকের তাপমাত্রা এভাবে কমে যায়। একে বলে ‘ন্যাসাল ডিপ’।
ছবি: বিবিসি নিউজ

নাক কেন ঠান্ডা হয়ে যায়

বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটা আমাদের শরীরের একটা প্রাচীন আত্মরক্ষার কৌশল। যখন আমরা বিপদ বা চাপের মুখে পড়ি, তখন আমাদের স্নায়ুতন্ত্র নাক থেকে রক্ত সরিয়ে চোখ ও কানের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে পাঠিয়ে দেয়। যাতে আমরা বিপদটা আরও ভালোভাবে দেখতে ও শুনতে পাই। তবে ভালো খবর হলো, স্বেচ্ছাসেবীদের বেশিরভাগই দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিলেন। কয়েক মিনিটের মধ্যেই নাক আবার আগের মতো গরম হয়ে ওঠে।

এতক্ষণ আমরা যাকে ‘ক’ নামে জেনেছি, তিনি ছিলেন একজন সাংবাদিক। এই গবেষণার প্রধান গবেষক অধ্যাপক জিলিয়ান ফরেস্টার তাঁর ব্যাপারে বললেন, ‘আপনি একজন সাংবাদিক, তাই আপনি হয়তো এই ধরনের চাপ সামলাতে অন্যদের চেয়ে বেশি অভ্যস্ত। কিন্তু আপনার মতো অভ্যস্ত মানুষের শরীরেও এই জৈবিক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এর মানে হলো, নাক ঠান্ডা হয়ে যাওয়া স্ট্রেস পরিমাপের একটি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য উপায়।’

আরও পড়ুন
‘আমরা নিজেদের বোঝার জন্য শত শত বছর ধরে প্রাইমেটদের নিয়ে গবেষণা করেছি। এখন সময় এসেছে আমাদের সেই জ্ঞান দিয়ে তাদের ভালো থাকার জন্য কিছু ফিরিয়ে দেওয়ার।’
ম্যারিয়েন পেইসলি, গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্স, যুক্তরাজ্য

এই আবিষ্কারের সুবিধা কী

বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই আবিষ্কার স্ট্রেস কমাতে দারুণ কাজে আসতে পারে। কারও নাক ঠান্ডা হওয়ার পর কতটা দ্রুত আবার গরম হচ্ছে, তা দেখে বোঝা যাবে সে কতটা ভালোভাবে স্ট্রেস সামলাতে পারে। কারও নাক যদি গরম হতে অনেক বেশি সময় লাগে, তবে তা ভবিষ্যতে দুশ্চিন্তা বা বিষণ্ণতার ঝুঁকি নির্দেশ করতে পারে। যেহেতু এই পদ্ধতিতে শরীরে কিছু স্পর্শ করাতে হয় না, তাই এটি শিশু বা যারা কথা বলতে পারে না, তাদের স্ট্রেস মাপার জন্যও খুব দরকারি।

অভয়ারণ্যে থাকা শিম্পাঞ্জি এবং গরিলাদের হয়তো কোনো ভয়ঙ্কর বা মর্মান্তিক পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।
ছবি: ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্স

তবে এই গবেষণার সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হলো, এটি শুধু মানুষের ওপর নয়, শিম্পাঞ্জি ও গরিলার মতো অন্যান্য প্রাইমেটদের ওপরও এই পদ্ধতি কাজ করে। গবেষকেরা এখন এটি বিভিন্ন অভয়ারণ্যে থাকা শিম্পাঞ্জি ও গরিলাদের ওপর ব্যবহার করছেন। এই প্রাণীগুলো হয়তো ভয়ঙ্কর কোনো অতীত থেকে উদ্ধার পেয়েছে এবং ওরা নিজেদের অনুভূতি লুকিয়ে রাখতে পটু। বড় শিম্পাঞ্জিদের যখন ছোট শিম্পাঞ্জিদের খেলার ভিডিও দেখানো হয়, তখন ওরা শান্ত হয়ে যায়। থার্মাল ক্যামেরায় দেখা গেছে, ভিডিও দেখার সময় ওদের নাক আবার গরম হয়ে উঠছে! অর্থাৎ, বাচ্চার খেলা দেখাটা হলো ওই ভয়ঙ্কর ইন্টারভিউ বা অঙ্ক কষার ঠিক উল্টো ঘটনা।

যুক্তরাজ্যের সাসেক্স ইউনিভার্সিটির গবেষক ম্যারিয়েন পেইসলি বলেন, ‘আমরা নিজেদের বোঝার জন্য শত শত বছর ধরে প্রাইমেটদের নিয়ে গবেষণা করেছি। এখন সময় এসেছে আমাদের সেই জ্ঞান দিয়ে তাদের ভালো থাকার জন্য কিছু ফিরিয়ে দেওয়ার।’

লেখক: সহকারী শিক্ষক, গণিত বিভাগ, পদ্মা ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, শরীয়তপুর

সূত্র: বিবিসি

আরও পড়ুন