মানসিক ক্লান্তিতে কেন আমরা ভুল সিদ্ধান্ত নিই

মানসিকভাবে ক্লান্ত থাকা অবস্থায় মানুষ যখন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, তখন তার মস্তিষ্কের ভেতর ঠিক কী ঘটে?ছবি: ওসি স্পেশালিটি হেলথ অ্যান্ড হসপিটাল

সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে ঘরে ফেরার পর আপনার অবস্থাটা একবার মিলিয়ে নিন। সারা দিন হয়তো বাচ্চাদের সামলেছেন, তাদের সকালের নাশতা বানানো, দুই ভাইবোনের ঝগড়া মেটানো, হাজারো অদ্ভুত প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, আবার তারা যেন একঘেয়েমিতে না ভোগে সেদিকেও খেয়াল রাখা। দিন শেষে যখন একটু নিজের মতো বসার সুযোগ পেলেন, তখনই মাথায় এল রাতের খাবারের চিন্তা। ফ্রিজে কী কী আছে, রান্না করতে কতক্ষণ লাগবে, যা রাঁধবেন সেটা আদৌ বাচ্চারা খাবে কি না—এই সাধারণ চিন্তাগুলোও তখন পাহাড়সমান মনে হয়। মনে হয়, থাক, আজ আর রান্না করে কাজ নেই, বাইরে থেকে কিছু আনিয়ে নিই।

অথবা ধরুন আপনার অফিসের কথা। সারা দিন কম্পিউটারের সামনে বসে একের পর এক একঘেয়ে কাজ করেছেন। ছুটির পর বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার কথা থাকলেও, শরীর আর মন সায় দেয় না। মনে হয়, সোজা বাসায় গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। একজন নার্সের ক্ষেত্রেও ঠিক একই ব্যাপার ঘটে। টানা ডিউটির পর অতিরিক্ত একজন রোগীকে দেখার ইচ্ছা থাকলেও ক্লান্তির কারণে তিনি পিছিয়ে আসেন।

এই যে অনুভূতি, একেই বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় কগনিটিভ ফ্যাটিগ। বাংলায় বলতে পারেন মানসিক ক্লান্তি। যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটি এবং কেনেডি ক্রিগার ইনস্টিটিউটের একদল গবেষক সম্প্রতি এই বিষয়টি নিয়ে একটি যুগান্তকারী গবেষণা করেছেন। তারা দেখার চেষ্টা করেছেন, মানসিকভাবে ক্লান্ত থাকা অবস্থায় মানুষ যখন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, তখন তার মস্তিষ্কের ভেতর ঠিক কী ঘটে। এই মানসিক ক্লান্তি কিন্তু কেবল শারীরিক দুর্বলতা নয়। গবেষক দল প্রমাণ করেছেন, এটি আমাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং নতুন কোনো কাজে জোর খাটানোর ইচ্ছাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

আরও পড়ুন
অংশগ্রহণকারীরা মানসিকভাবে যত বেশি ক্লান্ত হচ্ছিলেন, তারা কঠিন কাজটির দিকে ততটাই কম ঝুঁকছিলেন। অথচ কঠিন কাজটি করলে তাদের আয় হতো কয়েক গুণ বেশি!

গবেষকরা ২৮ জন স্বেচ্ছাসেবকের ওপর একটি বিশেষ পরীক্ষা চালান। ফাংশনাল ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স ইমেজিং (fMRI) মেশিনের মাধ্যমে তাদের মস্তিষ্কের কার্যকলাপ সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা হয়। প্রথমে তাদের এমন কিছু কাজ দেওয়া হয় যাতে মস্তিষ্কের ওপর বেশ চাপ পড়ে। এরপর তাদের সামনে একটি সুযোগ দেওয়া হয়—তারা কি আরেকটু মানসিক পরিশ্রম করে কিছু টাকা আয় করতে চান, নাকি চান না?

মেশিনের ভেতরে থাকা অবস্থায় অংশগ্রহণকারীদের তাদের ওয়ার্কিং মেমরি পরীক্ষা করার জন্য কিছু প্রশ্ন করা হয়। তাদের বিভিন্ন অক্ষরের সারি মনে রাখতে বলা হয়। সেগুলো বিভিন্ন ধরনের ছিল। যেমন কিছু ছিল কঠিন সারি, আবার কিছু সহজ, কিছু আরও অনেক বেশি কঠিন। এই কাজগুলো করে যখন তারা বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়লেন, তখন তাদের সামনে দুটি বিকল্প রাখা হয়। প্রথমটি একটি সহজ মেমরি টেস্ট, যা ঠিকঠাক পারলে পাওয়া যাবে ১ ডলার। আর দ্বিতীয়টি বেশ কঠিন একটি টেস্ট, কিন্তু সফল হলে মিলবে ৮ ডলার।

ফলাফলে দেখা গেল এক অদ্ভুত বিষয়। অংশগ্রহণকারীরা মানসিকভাবে যত বেশি ক্লান্ত হচ্ছিলেন, তারা কঠিন কাজটির দিকে ততটাই কম ঝুঁকছিলেন। অথচ কঠিন কাজটি করলে তাদের আয় হতো কয়েক গুণ বেশি! এই পরীক্ষা থেকে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পেরেছেন, মানসিক ক্লান্তি কীভাবে আমাদের পুরস্কার বা লাভের চেয়ে পরিশ্রম কমানোকে বেশি গুরুত্ব দিতে বাধ্য করে।

আরও পড়ুন
মস্তিষ্কের মাঝামাঝি ডান দিকের অংশকে বলে রাইট ইন্টেরিয়র ইনসুলা। আর এই মাঝের অংশের কাজই হলো শরীর কেমন অনুভব করছে, তার হিসাব রাখা।

এখন প্রশ্ন হলো, ক্লান্ত মস্তিষ্কে এমন কী ঘটে যার কারণে আমাদের আচরণ এভাবে পাল্টে যায়? বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, আমাদের মস্তিষ্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এমন একটি নির্দিষ্ট সিস্টেম আছে, যা শরীর ও মনের ক্লান্তির মাত্রাকে হিসাবের মধ্যে রাখে।

অংশগ্রহণকারীরা যখন একের পর এক ক্লান্তিকর মেমরি টেস্ট দিচ্ছিলেন, তখন তাদের মস্তিষ্কের সামনের দিকের একটি অংশ থেকে মস্তিষ্কের মাঝামাঝি ডান দিকের একটি অংশে তীব্র সংকেত যেতে শুরু করে। মস্তিষ্কের এই সামনের দিকের অংশটিকে বলে ডরসোলেটারাল প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স। আর মস্তিষ্কের মাঝামাঝি ডান দিকের অংশকে বলে রাইট ইন্টেরিয়র ইনসুলা। এই মাঝের অংশের কাজই হলো শরীর কেমন অনুভব করছে, তার হিসাব রাখা।

বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, এই দুই অংশের মধ্যে আদান-প্রদান হওয়া সংকেতের ওপর ভিত্তি করেই ঠিক হয়, একজন মানুষ পুরস্কারের আশায় মানসিক পরিশ্রম করতে রাজি হবেন কি না। মানুষ যত বেশি মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ে, এই দুই অংশের মধ্যে যোগাযোগ আদান-প্রদান তত বেড়ে যায়। এই যোগাযোগ যত বাড়ে, মানুষ কঠিন কাজ থেকে ততটাই দূরে পালাতে চায়।

এই আবিষ্কার আমাদের দৈনন্দিন জীবনের মানসিক ক্লান্তি বুঝতে তো সাহায্য করবেই, পাশাপাশি এমন কিছু শারীরিক অবস্থা বুঝতেও সাহায্য করবে যেখানে ক্লান্তি খুব মারাত্মক রূপ নেয়। চরম মানসিক অবসাদ নিয়ে এখনো অনেক কিছুই আমাদের অজানা, তবে এই গবেষণা নতুন একটি পথ খুলে দিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ডিপ্রেশনে ভোগা কোনো মানুষ হয়তো মানসিক ক্লান্তির সময় সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে সিদ্ধান্ত নেন। ভবিষ্যতে মস্তিষ্কের এই নির্দিষ্ট পথগুলোকে লক্ষ্য করে নতুন ধরনের ওষুধ বা থেরাপি আবিষ্কার করাও হয়তো সম্ভব হবে।

আরও পড়ুন
অংশগ্রহণকারীরা যখন একের পর এক ক্লান্তিকর মেমরি টেস্ট দিচ্ছিলেন, তখন তাদের মস্তিষ্কের সামনের দিকের একটি অংশ থেকে মস্তিষ্কের মাঝামাঝি ডান দিকের একটি অংশে তীব্র সংকেত যেতে শুরু করে।

মস্তিষ্কের এই সিস্টেমটি মূলত আমাদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্যই কাজ করে। আমাদের শারীরিক ও মানসিক ব্যবস্থাগুলো যেন অতিরিক্ত চাপে ভেঙে না পড়ে, তাই ক্লান্তি সংকেতগুলো আমাদের থামিয়ে দেয়। ক্লান্তি বাড়লে নতুন কাজে শক্তি খরচ করার অনীহাও তাই বেড়ে যায়।

কিন্তু এত কিছুর পরও, ক্লান্ত থাকলেও নিজেকে সামনের দিকে ঠেলে দেওয়ার কিছু উপায় আছে। অনেক সময় দীর্ঘ কাজের পর আমাদের এমন কিছু কাজ করা দরকার, যা আসলে আমাদের মানসিক শক্তি ফিরিয়ে আনতে পারে। যেমন অফিসের পর একটু বাইরের খোলা হাওয়ায় হাঁটা। কিন্তু ওই যে ক্লান্তি! সেটা আমাদের এসব করতেও বাধা দেয়। দিন শেষে পরিবারের যত্ন নেওয়া বা নিজের জন্য স্বাস্থ্যকর খাবার বাছাই করার মতো কঠিন কাজগুলোও আমাদের করতে হয়।

ক্লান্তি বাড়লে নতুন কাজে শক্তি খরচ করার অনীহাও বেড়ে যায়
ছবি: আনস্প্ল্যাশ

গবেষণা বলছে, কোনো কাজের পেছনের গুরুত্ব যদি আপনি ঠিকমতো অনুধাবন করতে পারেন, তবে এই ক্লান্তিকেও হার মানানো সম্ভব। আপনি যে কাজটি করছেন, তা কেন আপনার বা আপনার প্রিয়জনের জন্য এতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেই চিন্তাধারাটি যদি নতুন করে নিজের মনের মধ্যে সাজিয়ে নিতে পারেন, তবে ওই বাড়তি পা ফেলার শক্তিটুকু আপনি ঠিকই পেয়ে যাবেন।

সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকান ও দ্য জার্নাল অব নিউরোসায়েন্স

আরও পড়ুন