মানুষের ইন্দ্রিয় ৫টি নাকি ৩৩টি
ছোটবেলায় আমরা পড়েছি, মানুষের ইন্দ্রিয় পাঁচটি। চোখ, কান, নাক, জিভ ও ত্বক। ৩৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল এই ধারণাটি দিয়েছিলেন। আর তখন থেকে আজ পর্যন্ত পাঠ্যবইয়ে আমরা এটাই পড়ে আসছি। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, মানুষের ইন্দ্রিয় আসলে ৫টি নয়, বরং ৩৩টি পর্যন্ত হতে পারে! দৃষ্টি, স্পর্শ, ঘ্রাণ, শ্রবণ আর স্বাদের বাইরেও আমাদের শরীরে লুকিয়ে আছে অদ্ভুত সব ক্ষমতা। চলুন, সংক্ষেপে জেনে নেওয়া যাক আমাদের সেই অজানা সুপারপাওয়ারগুলো সম্পর্কে।
কখনো কি ভেবেছেন, আপনার পেট বা অন্ত্র আপনার মস্তিষ্কের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে পারে? আমাদের অন্ত্রে কোটি কোটি জীবাণু বা ব্যাকটেরিয়া বাস করে। এদের কাজ মূলত খাবার হজমে সাহায্য করা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে ডিউক ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা এক পিলে চমকানো তথ্য দিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, অন্ত্রের এই জীবাণুরা সরাসরি আমাদের মস্তিষ্কের সঙ্গে যোগাযোগ করে। এর নাম দেওয়া হয়েছে নিউরোবায়োটিক ইন্দ্রিয়।
ব্যাপারটা বেশ মজার। অন্ত্রে এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া খাবারের সময় ফ্ল্যাজেলিন প্রোটিন নির্গত করে। আমাদের অন্ত্রে থাকা নিউপড নামে কিছু বিশেষ কোষ সেই সংকেত চিনে নেয় এবং সোজা মস্তিষ্কে সিগন্যাল পাঠায়।
যুক্তরাষ্ট্রে ডিউক ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা বলছেন, অন্ত্রের এই জীবাণুরা সরাসরি আমাদের মস্তিষ্কের সঙ্গে যোগাযোগ করে। এর নাম দেওয়া হয়েছে নিউরোবায়োটিক ইন্দ্রিয়।
ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা করে দেখা গেছে, যেসব ইঁদুরের এই সিগন্যাল পাঠানোর ক্ষমতা নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে, তারা খাওয়া থামাতেই চায় না এবং দ্রুত মোটা হয়ে যায়। কে জানে, ভবিষ্যতে হয়তো এই ইন্দ্রিয় ব্যবহার করেই মানুষের ওজন কমানোর নতুন কোনো পথ বের হবে!
স্যান্ডপাইপার বা প্লোভারের মতো পাখিদের দেখেছেন কখনো? তারা বালির ওপর দিয়ে হাঁটার সময় বালিতে ঠোঁট ছুঁইয়েই বালির নিচের কম্পন বুঝতে পারে এবং মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা শিকার ধরে ফেলে। বিজ্ঞানীরা অবাক হয়ে দেখলেন, এই ক্ষমতা মানুষেরও আছে! একে বলা হচ্ছে রিমোট টাচ।
একটি পরীক্ষায় দেখা গেছে, বালির নিচে লুকানো কোনো বস্তুকে সরাসরি স্পর্শ করার আগেই মানুষ হাতের আঙুল দিয়ে বালির কম্পন অনুভব করে তা শনাক্ত করতে পারে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই কাজে মানুষ রোবটের চেয়েও ৩০ শতাংশ বেশি নিখুঁত! এই জ্ঞান কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে এমন রোবট বানানো যাবে, যারা মঙ্গল গ্রহের মাটি বা সমুদ্রের তলদেশের বিপজ্জনক জায়গায় খুব সূক্ষ্মভাবে কাজ করতে পারবে।
স্নায়ুবিজ্ঞানী কলিন ব্লেকমোর মনে করেন, আমাদের ইন্দ্রিয়গুলোকে আলাদা আলাদা করে দেখাটা ভুল। আসলে আমাদের সব ইন্দ্রিয় একটি দলের মতো কাজ করে। আপনি যখন মুভি দেখেন কিংবা মজার কোনো খাবার খান, তখন কি শুধু একটি ইন্দ্রিয় কাজ করে? মোটেও নয়। খাবারের স্বাদের সঙ্গে তার ঘ্রাণ, রং, এমনকি খাবারটি চিবানোর শব্দও প্রভাব ফেলে। অর্থাৎ, আমাদের মস্তিষ্ক সব ইন্দ্রিয়ের তথ্য মিলিয়ে একটা পূর্ণাঙ্গ ছবি তৈরি করে। কোনো ইন্দ্রিয়ই একা কাজ করে না।
স্নায়ুবিজ্ঞানী কলিন ব্লেকমোর মনে করেন, আমাদের ইন্দ্রিয়গুলোকে আলাদা আলাদা করে দেখাটা ভুল। আসলে আমাদের সব ইন্দ্রিয় একটি দলের মতো কাজ করে।
৩৩টি ইন্দ্রিয়ের কথা শুনে নিশ্চয়ই ভাবছেন, বাকিগুলো কী? এর মধ্যে অন্যতম হলো প্রোপ্রিওসেপশন। এটি আপনাকে বলে দেয় আপনার হাত-পা কোথায় আছে। সহজ কথায়, চোখ বন্ধ করেও আপনি নাকে আঙুল ছোঁয়াতে পারেন এই ইন্দ্রিয়ের কারণেই। আরও আছে ইকুলিব্রিওসেপশন। এটি আমাদের ভারসাম্য বজায় রাখে। থার্মোসেপশনের সাহায্যে আমরা তাপমাত্রা অনুভব করি।
তাই আমরা যে শুধু ৫টি ইন্দ্রিয়ের ওপর ভরসা করে চলি না, তা এখন পরিষ্কার। আমাদের শরীরের ভেতরে হয়তো আরও অনেক সুপারপাওয়ার লুকিয়ে আছে, যা আমরা এখনো ঠিকভাবে জানি না। বিজ্ঞানের জয়যাত্রায় হয়তো একদিন আমাদের এই ৩৩টি ইন্দ্রিয়ের রহস্য পুরোপুরি উন্মোচিত হবে।