আরবের মরুভূমির গুহায় মিলল ৪ হাজার বছরের পুরোনো চিতার মমি
সৌদি আরবের উত্তরের শুষ্ক পাহাড়ি অঞ্চলের গুহাগুলোতে গবেষকেরা যখন ঢুকছিলেন, তখন তাঁরা হয়তো ভাবতেও পারেননি কী অপেক্ষা করছে ভেতরে। হাজার বছরের ধুলা, পাথর ও অন্ধকারের মধ্যে লুকিয়ে ছিল এক বিস্ময়কর ইতিহাস। সেখানে পাওয়া গেল সাতটি প্রাকৃতিকভাবে মমি হয়ে যাওয়া চিতা, সঙ্গে আরও ৫৪টি চিতার কঙ্কাল।
বিষয়টি শুধু প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার নয়, বরং এটি বদলে দিতে পারে ভবিষ্যতের বন্য প্রাণী পুনর্বাসন পরিকল্পনাও। কারণ, এই চিতাগুলো বিজ্ঞানীদের সামনে খুলে দিয়েছে এমন এক অতীতের দরজা, যা আগে কেউ জানত না।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে কমিউনিকেশনস আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট সাময়িকীতে। সৌদি আরবের ন্যাশনাল সেন্টার ফর ওয়াইল্ডলাইফের গবেষক আহমেদ আল বৌগের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণা ইতিমধ্যে বন্য প্রাণী সংরক্ষণ জগতে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
গবেষকেরা সৌদি আরবের আরার শহরের কাছে প্রায় ১ হাজার ২১১ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে ১৩৪টি গুহা পরীক্ষা করেন। জায়গাটির আয়তন প্রায় নিউইয়র্ক শহরের সমান। এর মধ্যে পাঁচটি গুহায় পাওয়া যায় চিতার দেহাবশেষ। একটি গুহাতেই মিলেছে ৪১টি নমুনা।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, মরুভূমির শুষ্ক আবহাওয়া ও চুনাপাথরের গুহার ভেতরের বিশেষ পরিবেশ চিতাগুলোর দেহকে প্রাকৃতিকভাবেই সংরক্ষণ করে রেখেছে। সাধারণত মৃত প্রাণীর দেহ ব্যাকটেরিয়ার কারণে দ্রুত পচে যায়। কিন্তু গুহার গরম ও শুষ্ক মাইক্রোক্লাইমেট ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি অনেকটাই থামিয়ে দেয়। ফলে শত শত বছর ধরে চামড়া, টিস্যু, এমনকি কিছু অঙ্গও অক্ষত থেকে যায়।
গবেষকেরা সৌদি আরবের আরার শহরের কাছে প্রায় ১ হাজার ২১১ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে ১৩৪টি গুহা পরীক্ষা করেন। জায়গাটির আয়তন প্রায় নিউইয়র্ক শহরের সমান।
সবচেয়ে ভালোভাবে সংরক্ষিত মমিগুলোর সিটি স্ক্যান করে গবেষকেরা অবাক হয়ে যান। একটি চিতার খুলি খুলে দেখা যায়, ভেতরে এখনো শুকিয়ে যাওয়া মস্তিষ্ক রয়ে গেছে। মাথার খুলি, মেরুদণ্ড ও বুকের হাড়গুলোও প্রায় আগের অবস্থায় সংযুক্ত ছিল।
রেডিওকার্বন ডেটিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে গবেষকেরা জানতে পারেন, সবচেয়ে পুরোনো কঙ্কালগুলোর বয়স প্রায় ৪ হাজার বছর। সবচেয়ে নতুন মমিটি মাত্র ১৩০ বছর আগের। অর্থাৎ খুব বেশি দিন আগেও আরব উপদ্বীপে চিতা বিচরণ করত।
আসলে ১৯৭০-এর দশক পর্যন্তও সৌদি আরবে চিতা দেখা যাওয়ার তথ্য রয়েছে। এরপর ধীরে ধীরে অঞ্চলটি থেকে চিতা বিলুপ্ত হয়ে যায়। শিকার, আবাসস্থল ধ্বংস ও খাদ্যের সংকট—সব মিলিয়ে একসময় আরবের চিতারা হারিয়ে যায় ইতিহাসের অন্ধকারে।
গবেষণায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। বিশ্লেষণ করা ২০টি খুলির বেশির ভাগই ছিল ১৮ থেকে ২৪ মাস বয়সী তরুণ চিতার। এ ছাড়া পাওয়া গেছে ৯টি শাবকের দেহাবশেষও। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, গুহাগুলো হয়তো মা চিতাদের নিরাপদ আশ্রয় বা বাচ্চা লালন-পালনের জায়গা হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
তবে সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক সাফল্য এসেছে ডিএনএ বিশ্লেষণে। প্রথমবারের মতো প্রাকৃতিকভাবে মমি হয়ে যাওয়া বড় বিড়ালজাতীয় প্রাণী থেকে সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স বের করতে সক্ষম হয়েছেন গবেষকেরা। তিনটি নমুনা থেকে পাওয়া প্রাচীন ডিএনএ বিশ্লেষণ করে তাঁরা দেখতে পান, আরব উপদ্বীপে একসময় শুধু এক ধরনের নয়, বরং দুই ধরনের চিতা বাস করত।
রেডিওকার্বন ডেটিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে গবেষকেরা জানতে পারেন, সবচেয়ে পুরোনো কঙ্কালগুলোর বয়স প্রায় ৪ হাজার বছর। সবচেয়ে নতুন মমিটি মাত্র ১৩০ বছর আগের।
এত দিন বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, এই অঞ্চলে শুধু এশীয় চিতা বাস করত। বর্তমানে এশীয় চিতা পৃথিবীর সবচেয়ে বিপন্ন বড় স্তন্যপায়ী প্রাণীগুলোর একটি। এখন এদের সংখ্যা ৩০-এরও কম এবং তারা মূলত ইরানের কিছু এলাকায় টিকে আছে। কিন্তু নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, সবচেয়ে কম বয়সী নমুনাটি এশীয় চিতার সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও আরও পুরোনো দুটি নমুনা পশ্চিম আফ্রিকার চিতার সঙ্গে জিনগতভাবে মিল রয়েছে।
এই তথ্যটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সৌদি আরব যদি ভবিষ্যতে আবার চিতা ফিরিয়ে আনতে চায়, তাহলে শুধু ইরানের অতি সংকটাপন্ন এশীয় চিতার ওপর নির্ভর করতে হবে না। পশ্চিম আফ্রিকার চিতাকেও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। এখানেই আসে রিওয়াইল্ডিং বা পুনরায় বন্য পরিবেশে প্রাণী ফিরিয়ে আনার ধারণা।
রিওয়াইল্ডিং মানে হলো কোনো অঞ্চলে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া প্রাণীকে আবার সেখানে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা। তবে এটি খুব সহজ কাজ নয়। শুধু প্রাণী ছেড়ে দিলেই হয় না; প্রয়োজন উপযুক্ত আবাসস্থল, পর্যাপ্ত খাদ্য, নিরাপত্তা এবং জিনগত বৈচিত্র্য। এই গবেষণা সেই জিনগত বৈচিত্র্যের ব্যাপারটিকেই নতুনভাবে সামনে এনেছে।
যদি একটিমাত্র ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী থেকে প্রাণী আনা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে ইনব্রিডিং বা ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের মধ্যে প্রজননের ঝুঁকি বাড়ে। এতে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যেতে পারে। কিন্তু দুই ভিন্ন উপপ্রজাতির ঐতিহাসিক উপস্থিতির প্রমাণ থাকলে পুনর্বাসন পরিকল্পনায় আরও বেশি জিনগত বৈচিত্র্য রাখা সম্ভব।
নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, সবচেয়ে কম বয়সী নমুনাটি এশীয় চিতার সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও আরও পুরোনো দুটি নমুনা পশ্চিম আফ্রিকার চিতার সঙ্গে জিনগতভাবে মিল রয়েছে।
সৌদি আরব অবশ্য এর আগেও কিছু সফল পুনর্বাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। তারা অ্যারাবিয়ান ওরিক্স এবং স্যান্ড গ্যাজেলের মতো প্রাণীকে আবার প্রকৃতিতে ফিরিয়ে আনতে পেরেছে। ফলে চিতা পুনঃপ্রবর্তনের স্বপ্নটিও এখন আর একেবারে অসম্ভব মনে হচ্ছে না। তবে বিজ্ঞানীরা এখনো সতর্ক। কারণ চিতা শুধু দ্রুতগতির প্রাণীই নয়, তারা খুব সংবেদনশীলও। এদের জন্য বড় এলাকা প্রয়োজন, পর্যাপ্ত শিকার প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রয়োজন মানুষের সঙ্গে সংঘাত কমানো। তার ওপর বর্তমান পৃথিবীতে জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়ণ ও অবৈধ শিকারের মতো সমস্যা তো রয়েছেই।
এরপরও সৌদি আরবের গুহাগুলো থেকে উঠে আসা এই মমিগুলো যেন অতীতের এক নীরব বার্তা বহন করছে। হাজার বছর আগে যে প্রাণীরা মরুভূমির এই ভূখণ্ডে ছুটে বেড়াত, তারা হয়তো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। তাদের স্মৃতি, তাদের জিন, এমনকি তাদের শরীরও এখনো রয়ে গেছে পাথরের অন্ধকার গুহায়। সেই নিঃশব্দ সাক্ষীরাই হয়তো একদিন পথ দেখাবে!