প্রাণীদেরও কি রসবোধ আছে
‘এমন কী জিনিস আছে যা খুব শক্ত?’ প্রশ্নটা ছুড়ে দিল এক অদ্ভূত ‘কমেডিয়ান’। এরপর নিজেই উত্তর দিল, ‘পাথর ও কাজ!’
শুনতে হয়তো খুব একটা ফাটাফাটি জোকস মনে হচ্ছে না, কিন্তু জোকসটা কে বলেছে জানলে আপনি অবাক হবেন। এটি কোনো মানুষের কাজ নয়, বরং কোকো নামে এক গরিলার বলা জোকস! হ্যাঁ, ২০১৮ সালে ৪৬ বছর বয়সে মারা যাওয়া এই বিখ্যাত ওয়েস্টার্ন লোল্যান্ড গরিলাটি সাইন ল্যাঙ্গুয়েজে কথা বলতে পারত। কোকো শুধু জোকস বলেই থামত না। সে প্রায়ই তার ট্রেনারের জুতোর ফিতে একটার সঙ্গে আরেকটা বেঁধে ইশারায় বলত, ‘এবার আমাকে ধরো!’ আবার মজার ছলে নিজের নামের মাঝখানে ডেভিল শব্দটি জুড়ে দিত সে। কী অদ্ভুত রসবোধ!
দশকের পর দশক ধরে মানুষদের নকল করতে করতে কোকো হয়তো মানুষের মতোই জোকস বলার শিল্পটা রপ্ত করে নিয়েছিল। কিন্তু এই ঘটনা একটি বড় প্রশ্নের জন্ম দেয়, মানুষ ছাড়া অন্য প্রাণীদের কি আসলেই রসবোধ আছে?
আসলে মানুষ এবং উচ্চস্তরের প্রাণীদের মনের মধ্যে যে বিশাল পার্থক্য দেখা যায়, তা আসলে মাত্রাগত, চরিত্রগত নয়। সোজা কথায়, আমাদের যদি রসবোধ থাকে, তবে অন্য প্রাণীদেরও অন্তত কিছুটা হলেও রসবোধ থাকা উচিত। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান এ বিষয়ে কী বলছে?
কোকো প্রায়ই তার ট্রেনারের জুতোর ফিতে একটার সঙ্গে আরেকটা বেঁধে ইশারায় বলত, ‘এবার আমাকে ধরো!’ আবার মজার ছলে নিজের নামের মাঝখানে ডেভিল শব্দটি জুড়ে দিত সে। কী অদ্ভুত রসবোধ!
কমেডিয়ান পোষা প্রাণী!
যাঁদের বাড়িতে কুকুর বা বিড়াল আছে, তাঁরা নিশ্চয়ই জানেন যে প্রাণীদেরও অদ্ভুত রসবোধ আছে। এই যেমন ধরুন, কুকুরের মালিকেরা প্রায়ই দেখেন, যখনই কুকুরটাকে বিছানায় যেতে বলা হয় বা তার লোম আঁচড়ানোর কথা ওঠে, ঠিক তখনই সে টেবিলের নিচে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে পড়ে! আপনি যত রেগে যান, সে তত মজা পায় এবং আনন্দে ঘেউ ঘেউ করে ওঠে!
ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডোর ইকোলজি অ্যান্ড ইভোলিউশনারি বায়োলজি বিভাগের ইমেরিটাস প্রফেসর মার্ক বেকফ তাঁর দ্য ইমোশনাল লাইভস অব অ্যানিমেলস বইয়ে ঠিক এ কথাই বলেছেন। তাঁর মতে, ‘প্রাণীরা শুধু মজা করতেই জানে না, তারা অন্যদের নিয়ে মজাও করতে পারে। তারা জোকস বোঝে এবং তারা শারীরিক কসরতনির্ভর কমেডি বেশ উপভোগ করে।’
বেকফ তাঁর নিজের কুকুর জেথ্রোর একটি মজার গল্প শুনিয়েছেন। জেথ্রো তার প্রিয় স্টাফড খেলনা খরগোশটা মুখে নিয়ে পুরো বাড়ি দৌড়ে বেড়াত। এরপর হঠাৎ থেমে ঘুরে দেখত কেউ তার কাণ্ডকারখানা দেখছে কি না! যদি দেখত কেউ তাকাচ্ছে, তবে সে আরও বেশি পাগলামি শুরু করত। তার এই কাণ্ড দেখে মানুষ হাসলে সে দারুণ খুশি হতো।
শুধু কুকুর নয়, এশিয়ান কালো ভাল্লুকেরাও নাকি লোভী ভাইবোনদের মতো অন্য ভাল্লুকের খাবার চুরি করে মজা পায়। এমনকি ম্যাক নামে একটি স্কারলেট ম্যাকাও (এক ধরনের টিয়া) পাখির গল্পও বেশ বিখ্যাত। পাখিটি নাকি খিলখিল করে হাসত, আশেপাশের সবাইকে জ্বালাতন করত এবং তোয়ালের ওপর বসে মানুষের ম্যাজিক কার্পেট খেলার সময় আনন্দে চিৎকার করে উঠত!
প্রফেসর মার্ক বেকফের মতে, ‘প্রাণীরা শুধু মজা করতেই জানে না, তারা অন্যদের নিয়ে মজাও করতে পারে। তারা জোকস বোঝে এবং তারা শারীরিক কসরতনির্ভর কমেডি বেশ উপভোগ করে।’
গ্রেট এপসের কমেডি শো
২০২৫ সালে ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির গবেষক ইসাবেল লউমারের নেতৃত্বে একদল বিজ্ঞানী ওরাংওটাং, শিম্পাঞ্জি, বোনোবো এবং গরিলার ওপর একটি গবেষণা চালান। তাঁরা দেখেন, মানবশিশুরা যেমন ৮ মাস বয়স থেকেই অন্যদের সঙ্গে দুষ্টুমি শুরু করে, ঠিক তেমনি এই বানরেরাও ইচ্ছে করে অন্যকে জ্বালাতন করে মজা পায়।
গবেষকেরা দেখেছেন, বানরেরা খেলার ছলে একে অপরকে খোঁচা দেয়, মারে, লুকিয়ে থাকে এবং চুল ধরে টানে। ওরাংওটাংরা তো রীতিমতো একে অপরের চুল ধরে টানাটানি করে! এই আচরণগুলো কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং পুরোপুরি ইচ্ছাকৃত এবং অন্যকে রাগিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে করা।
২০০৯ সালে পোর্টসমাউথ ইউনিভার্সিটির গবেষক মেরিনা ডাভিলারস আরেকটি গবেষণায় দেখিয়েছেন, শিম্পাঞ্জি ও বোনোবোদের সুড়সুড়ি দিলে তারা শব্দ করে হাসে। ওরাংওটাংয়ের হাসির শব্দও আগে রেকর্ড করা হয়েছে। এগুলো প্রমাণ করে, বানরদেরও হাসার ক্ষমতা আছে।
গবেষকেরা দেখেছেন, বানরেরা খেলার ছলে একে অপরকে খোঁচা দেয়, মারে, লুকিয়ে থাকে এবং চুল ধরে টানে। ওরাংওটাংরা তো রীতিমতো একে অপরের চুল ধরে টানাটানি করে!
ইঁদুর ও ডলফিনের স্ট্যান্ড-আপ কমেডি!
শুধু বানর নয়, ইঁদুরের মতো ক্ষুদ্র প্রাণীরও রসবোধ আছে। আপনি শুনলে অবাক হবেন, ইঁদুরদের নিয়ে খেলার সময় বা সুড়সুড়ি দিলে তারা আনন্দে কিচিরমিচির শব্দ করে! এমনকি সুড়সুড়ি পাওয়ার লোভে ইঁদুররা লুকোচুরি খেলাও শিখে ফেলেছে! অন্যদিকে বটলনোজ ডলফিনরা একে অপরের সঙ্গে খেলার সময় এমন শব্দ করে যে মনে হয় তারা হাসছে।
এগুলো কি আসলেই রসবোধ
এখন প্রশ্ন হলো, বানরের দুষ্টুমি বা ইঁদুরের কিচিরমিচির কি আসলেই রসবোধ, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে? অনেক সংশয়বাদীর মতে, এসব হয়তো প্রাণীদের সহজাত প্রবৃত্তি বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে করা। মারামারি এড়ানো বা মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্যও প্রাণীরা এরকম শব্দ করতে পারে।
কিন্তু প্রফেসর বেকফ বলছেন, ‘যারা বলেন প্রাণীরা এগুলো উপভোগ করে না, তারা আসলে প্রাণীদের আবেগ নিয়ে হওয়া কয়েক দশকের গবেষণাকেই অস্বীকার করছেন।’
মানুষের মতো প্রাণীদের রসবোধও হয়তো সমাজবদ্ধ হয়ে থাকার কাজে লাগে। মজা করা, হাসাহাসি করা এবং একে অপরকে জ্বালাতন করার মাধ্যমে হয়তো তারা নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক আরও মজবুত করে এবং মারামারি বা সংঘাত এড়িয়ে চলে।
প্রাণীদের এই রসবোধ আমাদের অনেক কিছু শেখাতে পারে। আমরা যেমন জটিল চিন্তা করতে পারি, প্রাণীদেরও তেমন গভীর আবেগের জগৎ আছে। তারা শুধুই রোবটের মতো জীবন কাটায় না; বরং তারাও চারপাশের পরিবেশ নিয়ে ভাবে, মজা পায় এবং সেই অনুযায়ী আচরণ করে।