রক্তের গ্রুপ মিলিয়ে দেখতে হয় কেন

মানুষের রক্ত শত শত পদ্ধতিতে শ্রেণীভুক্ত করা যেতে পারেছবি: অ্যাপোলো ২৪৭

বিভিন্ন গ্রুপের রক্তের উপাদানে পার্থক্য থাকে। এক গ্রুপের রক্তের উপাদান অন্য গ্রুপের রক্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। সে জন্য কারও শরীরে অন্য কোনো ব্যক্তির রক্ত দিতে হলে প্রথমে দাতা ও গ্রহিতার রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করে দেখতে হয়। যদি রক্তের গ্রুপে মিল না থাকে তাহলে রোগীর জীবন বিপন্ন হতে পারে। মানুষের রক্ত শত শত পদ্ধতিতে শ্রেণীভুক্ত করা যেতে পারে। এর মধ্যে এবিও পদ্ধতি (ABO System) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই পদ্ধতিতে শ্রেণীভুক্ত রক্ত থেকে বোঝা যায় কার শরীরে কোন গ্রুপের রক্ত নিরাপদ। এই পদ্ধতিতে মানুষের রক্ত চার গ্রুপে বিভক্ত। এ, বি, ও এবং এবি।

এ গ্রুপের রক্তের লোহিত কণিকায় একধরনের প্রোটিন থাকে, যার উপরিভাবে যে অ্যান্টিজেন থাকে তার নাম দেওয়া হয়েছে 'এ'। অ্যান্টিজেন হলো সেই পদার্থ, যা শরীরে রোগপ্রতিরোধক অ্যান্টিবডি তৈরির প্রণোদনা জোগায় এবং বিশেষভাবে তার সঙ্গে মিশে যায়। বি গ্রুপের রক্তে থাকে 'বি' অ্যান্টিজেন। ও গ্রুপের রক্তে এ বা বি- কোনো অ্যান্টিজেনই থাকে না। আর এবি গ্রুপের রক্তে দুই ধরনের অ্যান্টিজেনই থাকে।

এবিও পদ্ধতিতে মানুষের রক্ত চার গ্রুপে বিভক্ত। এ, বি, ও এবং এবি
ছবি: ই-এস্টিডটমাই

বিভিন্ন গ্রুপের রক্তের তরল অংশে (রক্তের সিরাম) বিপরীতধর্মী উপাদান থাকে বলে ওদের মধ্যে মিলমিশ হয় না। যেমন, এ গ্রুপের রক্তের লোহিত কণিকায় (এরিথ্রোসাইটস) এ-অ্যান্টিজেন থাকে এবং তার তরল অংশে থাকে এমন ধরনের অ্যান্টিজেন, যা বি গ্রুপের রক্তের উপাদান প্রতিরোধ করে।

আরও পড়ুন
অ্যান্টিজেন হলো সেই পদার্থ, যা শরীরে রোগপ্রতিরোধক অ্যান্টিবডি তৈরির প্রণোদনা জোগায় এবং বিশেষভাবে তার সঙ্গে মিশে যায়।

অন্য দিকে বি গ্রুপের রক্তে রয়েছে ঠিক বিপরীত কাঠামো। তাই এ দুই গ্রুপের রক্ত যদি একত্র হয়, তাহলে তাদের রক্তের সিরাম একে অপরকে 'বহিরাগত ক্ষতিকর' পদার্থ ভেবে আক্রমণ করে। তখন রক্তের অণুগুলো জমাট বেঁধে আঠালো দলা পাকানো ছোট ছোট গোলকে পরিণত হয়। এতে রক্ত প্রবাহে মারাত্মক বাধা সৃষ্টি হয়ে বিয়োগান্তক পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

ও গ্রুপের রক্তে যেহেতু এ অথবা বি-অ্যান্টিজেন থাকে না, তাই এই গ্রুপের রক্ত যেকোনো গ্রুপের রক্তের সঙ্গে অনায়াসে মিশতে পারে, কোনো ক্ষতি হয় না। এ জন্য যাদের রক্তে ও গ্রুপের রক্ত, তাদের বলা হয় 'ইউনিভার্সাল ডোনার' বা 'সর্বজনীন রক্তদাতা'।

যাদের রক্তে ও গ্রুপের রক্ত, তাদের বলা হয় ইউনিভার্সাল ডোনার
ছবি: গিভ ব্লাড

অনেক সময় অপারেশনের রোগীকে রক্ত দিতে হয়। কারণ, শরীরে কাটাছেঁড়ার জন্য বেশ কিছু রক্ত বেরিয়ে যায়। তখন বাইরে থেকে শরীরে রক্ত না দিলে রোগীর জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে। আবার কোনো দুর্ঘটনায় শরীর ক্ষতবিক্ষত হলেও রক্তের প্রয়োজন। তখন হয়তো পরীক্ষা করে রক্তের গ্রুপ বের করার সময়ও থাকে না। তাই আজকাল সবার পেশাগত পরিচয়পত্রে (আইডি কার্ড) তাঁর রক্তের গ্রুপ লেখা থাকে। জাতীয় পরিচয়পত্রেও তা লেখা থাকে। গুরুতর দুর্ঘটনায় তাঁকে তাৎক্ষণিক রক্তদান সম্ভব হয়।

আরও পড়ুন
ও গ্রুপের রক্তে যেহেতু এ অথবা বি-অ্যান্টিজেন থাকে না, তাই এই গ্রুপের রক্ত যেকোনো গ্রুপের রক্তের সঙ্গে অনায়াসে মিশতে পারে, কোনো ক্ষতি হয় না।

অন্য প্রাণীর রক্তেরও কি এ ধরনের গ্রুপ থাকে?

এ বিষয়ে বিজ্ঞানীদের গবেষণা চলছে। সাধারণভাবে বলা যায়, মানুষের মতো অন্তত স্তন্যপায়ী প্রাণীর রক্তের গ্রুপের ভিন্নতা রয়েছে। কারণ, মানুষের মতো অন্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর রক্তের অ্যান্টিজেন ভিন্ন ভিন্ন হবেই। এ কারণে তাদের রক্তের গ্রুপের বিভিন্নতা থাকে। যেমন কুকুর, বিড়াল প্রভৃতি প্রাণীর রক্তের বিভিন্ন গ্রুপ থাকে। বিড়াল-জাতীয় প্রাণীর রক্তের গ্রুপ এ, বি, এবি হতে পারে। কুকুর-জাতীয় প্রাণীর রক্তের গ্রুপ ডিইএ (ডগ এরিথ্রোসাইট অ্যান্টিজেন) দিয়ে প্রকাশ করা হয়। যেমন, ডিইএ-১.১, ডিইএ-১.২, ডিইএ-৩ প্রভৃতি। প্রাণীদেহে কখনো রক্ত দিতে হলে, মানুষের রক্তের মতোই পরীক্ষা করে দেখতে হয় দাতার রক্ত একই কি না। যদি রক্তের গ্রুপ একই না হয়, তাহলে দেহে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।

আরও পড়ুন