প্লাস্টিকের পাত্র গন্ধ হলেও কাচের পাত্র হয় না কেন

প্লাস্টিকের পাত্র ধোয়ার পরও গন্ধ বা দাগ থেকে যায়, কিন্তু কাচের পাত্রে থাকে না কেন?ছবি: সায়েন্স এবিসি

গত রাতে বেঁচে যাওয়া তরকারি প্লাস্টিকের পাত্রে করে ফ্রিজে রেখেছিলেন। সকালে পাত্রটি খালি করে সাবান দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে ফেললেন। দেখতে একদম পরিষ্কার! কিন্তু নাকের কাছে নিতেই হালকা তরকারির গন্ধ পেলেন। অথচ একই খাবার কাচের পাত্রে রাখলে এমনটা হয় না। কাচের পাত্র ধোয়ার পর গন্ধ বা দাগের কোনো চিহ্নই থাকে না। কিন্তু কেন এমন হয়? এর উত্তর লুকিয়ে আছে প্লাস্টিক ও কাচের অণুগঠনে। 

আরও পড়ুন
সাবান ও পানি পাত্রের পৃষ্ঠ বা ওপরের অংশ পরিষ্কার করে। কিন্তু গন্ধের অণু যদি প্লাস্টিকের গভীরে ঢুকে যায়, সেখানে পৌঁছানো সহজ নয়। ফলে পাত্র দেখতে পরিষ্কার হলেও হালকা গন্ধ থেকে যেতে পারে। 

প্লাস্টিকের গঠন ও অণুর খেলা 

অনেকে মনে করেন, প্লাস্টিকের গায়ে অসংখ্য ক্ষুদ্র ছিদ্র থাকে। তাই খাবারের গন্ধ ও রঙের অণু সেসব ছিদ্রে আটকে যায়। আসলে বিষয়টি এমন নয়। প্লাস্টিক মূলত পলিমার দিয়ে তৈরি। পলিমার হলো অনেক ছোট অণু পরপর যুক্ত হয়ে তৈরি হওয়া দীর্ঘ চেইন। এই চেইনগুলো অনেকটা জট পাকানো নুডলসের মতো। কোথাও এগুলো খুব আঁটসাঁটভাবে সাজানো, আবার কোথাও কিছুটা এলোমেলো ও আলগা অবস্থায় থাকে। প্লাস্টিকের এই আলগা অংশগুলোই খাবারের কিছু অণুকে ভেতরে ঢুকে পড়ার সুযোগ দেয়। অর্থাৎ গন্ধ বা দাগ কোনো ছিদ্রে আটকে থাকে না; বরং কিছু অণু প্লাস্টিকের ভেতরেই মিশে যায়। 

এখানে রসায়নের একটি সহজ নিয়ম কাজে লাগে—সমধর্মী দ্রাবকে সমধর্মী দ্রবীভূত হয়। সহজভাবে বললে, একই ধরনের বৈশিষ্ট্যের অণু একে অপরের সঙ্গে সহজে মিশতে পারে। বেশির ভাগ খাবারের পাত্র তৈরি হয় পলিইথিলিন বা পলিপ্রোপিলিনের মতো প্লাস্টিক দিয়ে। এগুলো তৈলাক্ত প্রকৃতির। অন্যদিকে খাবারের গন্ধ ও রঙের অনেক অণুও নন-পোলার। তাই এসব অণু প্লাস্টিকের সংস্পর্শে এলে শুধু পাত্রের পৃষ্ঠেই পড়ে থাকে না, প্লাস্টিকের ভেতরেও মিশে যেতে পারে।

বেশির ভাগ খাবারের পাত্র তৈরি হয় পলিইথিলিন বা পলিপ্রোপিলিনের মতো প্লাস্টিক দিয়ে। এগুলো তৈলাক্ত প্রকৃতির
ছবি: এআইয়ের সাহায্যে তৈরি

ধরুন, তরকারির গন্ধযুক্ত কোনো অণু প্লাস্টিকের দেয়ালে এসে পড়ল। অণুটি প্রথমে পৃষ্ঠে আটকে যায়। এরপর প্লাস্টিকের শৃঙ্খলগুলোর মাঝের আলগা অংশে ঢুকে পড়ে। শৃঙ্খলগুলো সব সময় সামান্য নড়াচড়া করে। ফলে অণুটি এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে যেতে ধীরে ধীরে প্লাস্টিকের কিছুটা গভীরে ঢুকে যেতে পারে। এ কারণেই পাত্র ধোয়ার সময় সমস্যা হয়। সাবান ও পানি মূলত পাত্রের পৃষ্ঠ বা ওপরের অংশ পরিষ্কার করে। কিন্তু গন্ধের অণু যদি প্লাস্টিকের গভীরে ঢুকে যায়, সেখানে পৌঁছানো সহজ নয়। ফলে পাত্র দেখতে পরিষ্কার হলেও হালকা গন্ধ থেকে যেতে পারে। 

আরও পড়ুন
একই ধরনের বৈশিষ্ট্যের অণু একে অপরের সঙ্গে সহজে মিশতে পারে। বেশির ভাগ খাবারের পাত্র তৈরি হয় পলিইথিলিন বা পলিপ্রোপিলিনের মতো প্লাস্টিক দিয়ে। এগুলো তৈলাক্ত প্রকৃতির।

টমেটো সস ও হলুদের দাগ 

তরকারির গন্ধের মতোই টমেটো সস বা হলুদের দাগের পেছনেও রয়েছে অণুর এই একই আচরণ। টমেটোর লাল রঙের জন্য দায়ী লাইকোপিন একটি তৈলাক্ত প্রকৃতির অণু। প্লাস্টিকও তৈলাক্ত প্রকৃতির হওয়ায় লাইকোপিন প্লাস্টিকের ভেতরে মিশে যেতে পারে। হলুদের হলুদ রঙের জন্য দায়ী কারকিউমিনও একইভাবে প্লাস্টিকের সঙ্গে মিশে দাগ তৈরি করতে পারে। 

তাই টমেটো সস রাখা প্লাস্টিকের পাত্রে অনেক সময় কমলা বা লালচে দাগ থেকে যায়। শুধু বেশি জোরে ঘষলেই যে দাগ উঠে যাবে, এমন নয়। কারণ, দাগের অণুর কিছু অংশ তখন পাত্রের ভেতরেই মিশে গেছে। 

টমেটোর লাল রঙের জন্য দায়ী লাইকোপিন একটি তৈলাক্ত প্রকৃতির অণু। প্লাস্টিকও তৈলাক্ত প্রকৃতির হওয়ায় লাইকোপিন প্লাস্টিকের ভেতরে মিশে যেতে পারে
ছবি: এআইয়ের সাহায্যে তৈরি

কাচের পাত্রের সুবিধা 

এবার আসা যাক কাচের পাত্রে। কাচও তো কঠিন পদার্থ। তাহলে খাবারের অণু কাচের ভেতরে ঢুকে যায় না কেন? কাচ মূলত সিলিকা দিয়ে তৈরি। এতে সিলিকন ও অক্সিজেন পরমাণু শক্তভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি ত্রিমাত্রিক জালিকা তৈরি করে। প্লাস্টিকের মতো এখানে লম্বা, আলগা ও নড়াচড়া করা পলিমার শৃঙ্খল নেই। ফলে খাবারের গন্ধ বা রঙের অণুর কাচের ভেতরে মিশে যাওয়ার সুযোগ খুব কম। অণুগুলো মূলত কাচের পৃষ্ঠেই থাকে। তাই সাবান ও পানি দিয়ে পাত্র ধুলেই সেগুলো সহজে পরিষ্কার হয়ে যায়। 

এ কারণেই কাচের পাত্রে টমেটো সস বা তরকারি রাখলেও সাধারণত প্লাস্টিকের মতো গন্ধ ও দাগ থেকে যায় না। স্টেইনলেস স্টিলও একই কারণে খাবারের গন্ধ ও উপাদানের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে কম মিথস্ক্রিয়া করে। 

আরও পড়ুন
প্লাস্টিকও তৈলাক্ত প্রকৃতির হওয়ায় লাইকোপিন প্লাস্টিকের ভেতরে মিশে যেতে পারে। হলুদের হলুদ রঙের জন্য দায়ী কারকিউমিনও একইভাবে প্লাস্টিকের সঙ্গে মিশে দাগ তৈরি করতে পারে। 

খাদ্যশিল্পে প্রভাব 

প্লাস্টিকের এই বৈশিষ্ট্য শুধু আমাদের রান্নাঘরের সমস্যা নয়। খাদ্যশিল্পেও এটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোনো খাবার বা পানীয়ের সুগন্ধি ও স্বাদের কিছু অণু প্লাস্টিকের প্যাকেজিংয়ে মিশে গেলে খাবারের স্বাদ ও গন্ধ কিছুটা বদলে যেতে পারে। এই ঘটনাকে বলা হয় ফ্লেভার স্কাল্পিং।

কমলার গন্ধের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান লিমোনিন প্লাস্টিকের প্যাকেজিংয়ে মিশে যেতে পারে। ফলে রস থেকে কিছু সুগন্ধি অণু হারিয়ে যায়
ছবি: এআইয়ের সাহায্যে তৈরি

কমলার রস এর একটি ভালো উদাহরণ। কমলার গন্ধের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান লিমোনিন প্লাস্টিকের প্যাকেজিংয়ে মিশে যেতে পারে। ফলে রস থেকে কিছু সুগন্ধি অণু হারিয়ে যায় এবং এর স্বাদ বা গন্ধ আগের তুলনায় কিছুটা কম তীব্র মনে হতে পারে। তাই খাদ্যশিল্পে খাবারের জন্য উপযুক্ত প্লাস্টিক বেছে নেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। 

আরও পড়ুন
কোনো খাবার বা পানীয়ের সুগন্ধি ও স্বাদের কিছু অণু প্লাস্টিকের প্যাকেজিংয়ে মিশে গেলে খাবারের স্বাদ ও গন্ধ কিছুটা বদলে যেতে পারে। এই ঘটনাকে বলা হয় ফ্লেভার স্কাল্পিং।

গন্ধ ও দাগ দূর করার উপায় 

একবার গন্ধ বা রঙের অণু প্লাস্টিকের ভেতরে ঢুকে গেলে শুধু সাবান দিয়ে ঘষে তা পুরোপুরি দূর করা কঠিন। তবে সময় ও তাপ কিছুটা সাহায্য করতে পারে। পাত্র খোলা রেখে দিলে ভেতরে থাকা কিছু অণু ধীরে ধীরে আবার বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে।

টমেটোর দাগের ক্ষেত্রে সূর্যের আলোও কাজে লাগতে পারে। এতে দাগের রঙের জন্য দায়ী অণুগুলো ধীরে ধীরে ভেঙে গিয়ে বিবর্ণ হয়ে যায়। অর্থাৎ সূর্যের আলো সব সময় দাগের অণুকে প্লাস্টিক থেকে বের করে দেয় না; বরং রঙের অণুকে পরিবর্তন করে দাগটিকে কম দৃশ্যমান করে তোলে। 

তবে সবচেয়ে সহজ সমাধান হলো, তীব্র গন্ধ বা রংযুক্ত খাবার দীর্ঘ সময় রাখার জন্য কাচের পাত্র ব্যবহার করা। তাহলে প্লাস্টিকের পাত্রে গন্ধ ও দাগ থেকে যায়, কিন্তু কাচের পাত্রে থাকে না। এর মূল কারণ কী দাঁড়াল?

তীব্র গন্ধ বা রংযুক্ত খাবার দীর্ঘ সময় রাখার জন্য কাচের পাত্র ব্যবহার করা উচিত
ছবি: পেক্সেলস

প্লাস্টিকের পলিমার শৃঙ্খলের কিছু অংশে খাবারের তৈলাক্ত অণু ঢুকে গিয়ে মিশে যেতে পারে। সাবান-পানি পাত্রের পৃষ্ঠ পরিষ্কার করলেও ভেতরে ঢুকে যাওয়া অণু সহজে বের করতে পারে না। অন্যদিকে কাচের শক্ত সিলিকা-জালিকায় সেই অণুগুলোর ঢুকে যাওয়ার সুযোগ খুব কম। তাই তারা পৃষ্ঠেই থাকে এবং ধোয়ার সময় সহজেই চলে যায়। এককথায় বলতে গেলে, প্লাস্টিক খাবারের গন্ধ ও রং কিছুটা ধরে রাখে, আর কাচ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তা ধরে রাখে না।

লেখক: শিক্ষার্থী, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্র: সায়েন্স এবিসি

আরও পড়ুন