মধ্যযুগে নির্মিত ইউরোপের গির্জাগুলোর জানালা খেয়াল করলে অদ্ভুত এক জিনিস দেখা যায়। প্রায় সব জানালার কাচই ওপরের অংশের তুলনায় নিচের দিকে যেন পুরু। এক সময় মনে করা হতো, কাঁচ কঠিন পদার্থ নয়, তাই এমন হয়েছে। এটা বরং বিশেষ ধরনের তরল। শতাব্দীর পর শতাব্দী পার করে এই তরল ধীরে ধীরে নিচের দিকে নেমে আসে অভিকর্ষ বলের কারণে। ফলে পুরু হয়ে ওঠে জানালার নিচের অংশ।
কিন্তু আসলেই কি কাঁচ তরল? আমরা তো একে কঠিন হিসেবেই দেখি। হাত থেকে ফেলে দিলে ভেঙ্গে যায়। তরলের মতো গড়িয়ে তো যায় না। শক্ত কাঁচ প্রচুর চাপ সহ্য করতে পারে। ফলে একে চট করে তরল ভাবাটাও কঠিন। আসলে কাঁচ কোন ধরনের পদার্থ?
যেকোনো কঠিন পদার্থে পরমাণুগুলো নির্দিষ্ট একটি অবস্থানে স্থির থাকে। অন্যদিকে, তরলে পরমাণুগুলো এলোমেলোভাবে থাকে এবং সহজে জায়গা বদলাতে পারে।
বিজ্ঞানীরা কাঁচকে কঠিন বা তরল কোনোটাই বলতে চান না। কাচের পরিচয় দেওয়া হয় ল্যাটিসহীন কঠিন পদার্থ (Amorphous Solid) বা অতিশীতল তরল হিসেবে। এ প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পেন স্টেট ইউনিভার্সিটির ম্যাটেরিয়াল সায়েন্টিস্ট জন মাউরো বলেন, ‘কাঁচ একেবারে খাঁটি তরলও নয়, আবার কঠিনও নয়—এর কিছু বৈশিষ্ট্য তরলের মতো, আবার কিছু কঠিনের মতো। এটি খুবই অনন্য এক পদার্থ।’
তাঁর ভাষায়, ‘প্রযুক্তিগত সংজ্ঞা অনুযায়ী, কাঁচ হচ্ছে এক ধরনের অপর্যাপ্ত, অ-স্ফটিক পদার্থ। এটা স্বল্প সময়ের জন্য কঠিন মনে হয়, কিন্তু ধীরে ধীরে তরলের দিকে যেতে থাকে।’
কথাটা একটু জটিল শোনালেও ধাপে ধাপে ব্যাখ্যাটা খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যায়, কেন কাঁচকে একদম কঠিন বা তরল বলা যায় না। প্রথমেই বুঝে নেওয়া দরকার, কাঁচ মানে শুধু জানালা বা বাসনকোসনের স্বচ্ছ পাতলা জিনিস নয়। কাঁচ অনেক রকমের হয়। এটি কিন্তু সবসময় স্বচ্ছও হয় না।
প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম অনেক ধরণের কাঁচ আছে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত বেশিরভাগ কাঁচ সোডা-লাইম সিলিকেট গ্লাস। এগুলো তৈরি হয় বালি, চুনাপাথর আর সোডা অ্যাশ গলিয়ে। এ জন্য প্রায় ১ হাজার ৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপ প্রয়োজন।
এছাড়া বিশেষ বৈশিষ্ট সমৃদ্ধ কাঁচ তৈরির জন্য বালি, চুনাপাথর আর সোডা অ্যাশের সঙ্গে যোগ করা হয় বিভিন্ন রাসায়নিক। তাপ সহনশীল পাইরেক্স কাঁচ বা শক্ত ও নমনীয় গরিলা গ্লাস এসবের উদাহরণ।
এসব কাঁচ রাসায়নিকভাবে আলাদা হলেও একটা জায়গায় মিল থাকে। সেটা হলো, কাচের ভেতরে অণু-পরমাণুর গঠন। আর এ গঠনই কাঁচের ভৌত অবস্থা নিয়ে বিতর্ক তৈরি করে।
জন পার্কারের মতে, প্রায়োগিক দিক থেকে কাঁচকে কঠিন পদার্থই বলা উচিত। অন্তত আমরা যখন থেকে কাঁচ ব্যবহার করা শিখেছি, তখন থেকে আজকের সময়ের হিসেবে কাঁচকে তরল বলা যায় না।
যেকোনো কঠিন পদার্থে পরমাণুগুলো নির্দিষ্ট একটি অবস্থানে স্থির থাকে। অন্যদিকে, তরলে পরমাণুগুলো এলোমেলোভাবে থাকে এবং সহজে জায়গা বদলাতে পারে। অর্থাৎ তরলে পরমাণু একে অন্যের সঙ্গে কঠিন পদার্থের মতো শক্তভাবে লেগে থাকে না।
আমরা সাধারণত কঠিন বলতে বুঝি স্ফটিকজাত পদার্থ। যেমন লবণ। এর ভেতরে পরমাণুরা সুশৃঙ্খল ও নিয়মিতভাবে সাজানো থাকে। গলনাঙ্কের নিচে এটি সবচেয়ে স্থিতিশীল অবস্থায় থাকে, আর গলনাঙ্কের ওপরে হয়ে ওঠে তরল। এই অবস্থায় এটি থাকে সবচেয়ে স্থিতিশীল। যেকোনো পদার্থ তার স্থিতিশীল অবস্থাই পছন্দ করে। একে বলে ‘ইকুইলিব্রিয়াম’। কিন্তু কাঁচ ব্যতিক্রম। কারণ, এটি কখনোই পুরোপুরি স্থিতিশীল হয় না।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব শেফিল্ডের কাঁচ গবেষণা কেন্দ্রের গবেষক জন পার্কার বলেন, ‘কাঁচ তৈরি হয় বিভিন্ন উপাদান গলিয়ে। এটি অত্যন্ত ঘন তরলে পরিণত হয় যা সিরাপের মতো এবং সহজে প্রবাহিত হয় না। তারপর একে ঠান্ডা করা হয়। কিন্তু তখন ঘনত্ব এত বেশি থাকে যে পরমাণুগুলো আর নিজে সুশৃঙ্খলভাবে সাজতে পারে না, বিশৃঙ্খলভাবেই থেকে যায়।’
ফলে গঠনের দিক থেকে এটি দেখতে কঠিন মনে হলেও এর ভেতরের অণুগুলো থাকে একদম এলোমেলোভাবে। অর্থাৎ তরলের বৈশিষ্ট্যের মতো।
অধ্যপক মাউরো বলেন, ‘এ অবস্থাকে বলে ‘মেটা-স্টেবল ইকুইলিব্রিয়াম’। মানে, এটা আপাতদৃষ্টিতে কঠিন মনে হয়, কারণ আমরা যখন এটাকে দেখি বা ছুঁই, তখন যতটা সময়ের মধ্যে প্রতিক্রিয়া হওয়ার কথা, তার চেয়েও ধীরে এর গঠন বদলায়। তরলের দিকে ধীরে ধীরে ফিরে যেতে পারে, কিন্তু সেটা এত ধীরে ঘটে যে আমাদের চোখে ধরা পড়ে না।’
প্রযুক্তিগত সংজ্ঞা অনুযায়ী, কাঁচ হচ্ছে এক ধরনের অপর্যাপ্ত, অ-স্ফটিক পদার্থ। এটা স্বল্প সময়ের জন্য কঠিন মনে হয়, কিন্তু ধীরে ধীরে তরলের দিকে যেতে থাকে।
বাস্তবে কাঁচের ভেতরে এই পরিবর্তন অনেক ধীরে হয়। পরিবর্তন হতে কোটি কোটি বছরও লেগে যেতে পারে। ফলে আমাদের দৈনন্দিন ব্যবহারে এটি পুরোপুরি কঠিনের মতোই আচরণ করে।
জন পার্কারের মতে, প্রায়োগিক দিক থেকে কাঁচকে কঠিন পদার্থই বলা উচিত। অন্তত আমরা যখন থেকে কাঁচ ব্যবহার করা শিখেছি, তখন থেকে আজকের সময়ের হিসেবে কাঁচকে তরল বলা যায় না।
তাহলে সেই মধ্যযুগীয় জানালাগুলোর নিচে পুরু আর ওপরে পাতলা হওয়ার ব্যাখ্যা কী? আসলে হাজার বছর আগে একদম সমান মোটা কাঁচ তৈরি করা যেত না। তাই কিছুটা পুরু দিক নিচে রেখে জানালায় বসানো হতো। সময়ের পরিক্রমায় মাত্র হাজার বছরের মধ্যে যে মহাকর্ষে টানে কাঁচ নিচের দিকে এসে জমেছে, তা ঠিক নয়।