পরমাণুর গঠন কেমন

পরমাণু জিনিসটা আসলে কি?ছবি: ইলেকট্রিক্যাল একাডেমিয়া

তুমি অনেক ছোট বেলা থেকেই বিভিন্নভাবে পরমাণু, পারমাণবিক শক্তি, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পারমাণবিক যুগ এই শব্দগুলোর সঙ্গে পরিচিত...।

তুমি হয় তো জানো যে, পরমাণু একটি অতি ক্ষুদ্র কণিকা- যা দ্বারা তৈরি আমাদের এই বিশ্বের সকল কিছু; শ্বাসপ্রশাসের জন্য বাতাস, পানীয় জল, মাটি, খাদ্য দ্রব্য, হাঁড়ি-পাতিল বাসন-কোসন, খেলনাসামগ্রী, পোশাক, বই, গাড়ি, বাড়ি, পাহাড়, মেঘ, চন্দ্র, সূর্য, তারা... সকল জীবজন্তু এমন কি তুমি, আমি ও সকল মানুষ।

তারপরও প্রশ্ন থেকে যায়, পরমাণু জিনিসটা আসলে কি? এটি দেখতে কেমন? এর ভিতরে কি থাকে?

তিনটি শব্দ আমাদের মনে রাখতে হবে- যেমন 'প্রোটন', 'নিউট্রন' এবং 'ইলেকট্রন' এগুলো হচ্ছে সেই সকল ক্ষুদ্র কণিকা যা দ্বারা তৈরি হয় প্রতিটি পরমাণু।

এই কণিকাগুলো এতোই ছোট যে, আমাদের পক্ষে এগুলোর আকার কল্পনা করা কঠিন। তারপরও চেষ্টা করে দেখা যাক। কল্পনা কর যে, হঠাৎ করেই পরমাণুর কণিকাগুলো আকারে অনেক অনেক গুণ বৃদ্ধি পেয়ে এমন আকার ধারণ করল যে, সব চেয়ে ছোট পরমাণুটি তোমার জ্যাকেটের বোতামের সমান হয়ে গেল। অনুরূপভাবে কল্পনা করা যাক যে, ছোট একটি বিড়াল ছানা পরমাণু কণিকাগুলোর মতোই অত গুণ বড় হয়ে উঠল। কি হবে তাহলে? পৃথিবী ও সূর্যের মাঝে যে বিশাল স্থান রয়েছে তার মধ্যেও এই বিড়ালটির জায়গা হবে না। এই বিশালকায় বিড়ালটির কাছে সূর্যকে একটি মটর দানার মতোই মনে হবে।

আরও পড়ুন
হাইড্রোজেনের পরমাণুর নিউক্লিয়াসে যদি একটি নিউট্রন যুক্ত হয় তবে আমরা যে পরমাণুটি পাব তাকে বিজ্ঞানিরা নাম দিয়েছেন ডিউটেরিয়াম। এটি ভারী হাইড্রোজেন হিসেবেও পরিচিত।

এসব অলিক কল্পনা ছাড়। প্রোটন, নিউট্রন, ইলেকট্রন এবং বিড়াল ছানাটি যেমন ছিল তেমনই থাক।

পরমাণুতে যে সকল কণিকাগুলো রয়েছে তার মধ্যে প্রোটনের ওজন ইলেকট্রনের চাইতে ২,০০০ গুণ বেশি। অতএব, খুব স্বাভাবিক যে, পরমাণুর কেন্দ্রেই প্রোটনের অবস্থান। হালকা ইলেকট্রনগুলো এই প্রোটনের চারদিকে ঘুরতে থাকে, অনেকটা পৃথিবীকে ঘিরে যেমন করে উপগ্রহ আবর্তিত হয়। পরমাণুর কেন্দ্রে যা থাকে পদার্থবিদদের ভাষায় তা হচ্ছে পরমাণুর নিউক্লিয়াস।

১৯১১ সালে স্বনামধন্য ইংরেজ পদার্থবিদ আর্নেস্ট রাদারফোর্ড হঠাৎ চিৎকার করে বলে উঠলেন 'এখন আমি জানি, পরমাণু দেখতে কেমন!'

কী দিয়ে তৈরি হয় একটি সাধারণ পরমাণু? এটিতে থাকে শুধুমাত্র একটি প্রোটন ও একটি ইলেকট্রন- কোন নিউট্রন থাকে না। এটিই হচ্ছে সব চেয়ে হালকা গ্যাস হাইড্রোজেনের পরমাণু। এখনকি তুমি বুঝতে পারছ কেন হাইড্রোজেন এতটা হালকা? হাইড্রোজেন বাতাসের চেয়ে ১৫ গুণ হালকা- যার ফলে হাইড্রোজেন ভর্তি বেলুন অতি সহজে বাতাসে ভেসে বেড়াতে পারে।

এখন প্রশ্ন হলো নিউট্রনের অবস্থান কোথায় এবং এর প্রয়োজনই বা কি?

হাইড্রোজেনের পরমাণুর নিউক্লিয়াসে যদি একটি নিউট্রন যুক্ত হয় তবে আমরা যে পরমাণুটি পাব তাকে বিজ্ঞানিরা নাম দিয়েছেন ডিউটেরিয়াম। এটি ভারী হাইড্রোজেন হিসেবেও পরিচিত। এখন আমরা পরমাণুতে এক সাথে তিনটি কণিকা পেলাম-প্রোটন, নিউট্রন ও ইলেকট্রন।

আরও পড়ুন
হালকা ইলেকট্রনগুলো এই প্রোটনের চারদিকে ঘুরতে থাকে, অনেকটা পৃথিবীকে ঘিরে যেমন করে উপগ্রহ আবর্তিত হয়। পরমাণুর কেন্দ্রে যা থাকে পদার্থবিদদের ভাষায় তা হচ্ছে পরমাণুর নিউক্লিয়াস।

হালকা হাইড্রোজেন পরমাণুর নিউক্লিয়াসে প্রোটনের সঙ্গে একটি নিউট্রন যুক্ত হওয়ার ফলে এটির ভর কি পরিমাণ বৃদ্ধি পেল? চলো হিসাব করে দেখা যাক। নিউট্রনের ভর প্রোটনের ভরের প্রায় সমান। এর ফলে নিউক্লিয়াস ও পুরো পরমাণুর ভর দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে (ইলেকট্রনের ভর এতটাই কম যে- তা হিসাব না করলেও চলে)। হাইড্রোজেন পরমাণুকে আরো ভারী করে তোলা সম্ভব। ডিউটেরিয়ামের নিউক্লিয়াসে অবস্থিত একটি প্রোটন ও একটি নিউট্রনের সঙ্গে যদি আরো একটি নিউট্রন যুক্ত করা হয়, তবে আমরা পাব অতি ভারী হাইড্রোজেন বা বিজ্ঞানিদের ভাষায় ট্রিটিয়াম।

ট্রিটিয়ামের পরমাণু হালকা হাইড্রোজেন পরমাণুর চাইতে তিনগুণ ভারী। তারপরও অতি ভারী ট্রিটিয়াম বাতাসের চেয়ে পাঁচগুণ হালকা।

আমরা দেখতে পেলাম যে, হালকা হাইড্রোজেনের অপেক্ষাকৃত ভারী দুটি সমগোত্রীয় প্রকারভেদ রয়েছে-ডিউটেরিয়াম ও ট্রিটিয়াম।

কিন্তু আসলেই কি এগুলো একই রকম? হালকা হাইড্রোজেনের নিউক্লিয়াসে রয়েছে একটি প্রোটন, ডিউটেরিয়ামে একটি প্রোটন ও একটি নিউট্রন এবং ট্রিটিয়ামে একটি প্রোটন এবং দুইটি নিউট্রন। এতদসত্ত্বেও কেন আমরা ডিউটেরিয়াম এবং ট্রিটিয়ামকে হাইড্রোজেন হিসেবে অভিহিত করে থাকি? চলো ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করা যাক।

আরও পড়ুন
ডিউটেরিয়ামের নিউক্লিয়াসে অবস্থিত একটি প্রোটন ও একটি নিউট্রনের সঙ্গে যদি আরো একটি নিউট্রন যুক্ত করা হয়, তবে আমরা পাব অতি ভারী হাইড্রোজেন বা বিজ্ঞানিদের ভাষায় ট্রিটিয়াম।

হাইড্রোজেন সহজ দাহ্য। দহনের ফলে হাইড্রোজেনের পরমাণু অক্সিজেনের পরমাণুর সঙ্গে যুক্ত হয়ে উৎপন্ন হয় পানি। ডিউটেরিয়ামও সহজ দাহ্য, অক্সিজেনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ফলে পানি তৈরি হয়। ডিউটেরিয়ামের দহনের ফলে যে পানি উৎপন্ন হয় তা ভারী পানি হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এটিকে সাধারণ পানির থেকে আলাদা করে চিহ্নিত করা কঠিন। ট্রিটিয়াম ও অক্সিজেনের বিক্রিয়ার ফলে যে অতি ভারী পানি উৎপন্ন হয় তাও সাধারণ পানির মতোই। প্রতিটি গ্লাসের পানিতে সামান্য কিছু পরিমাণ হলেও ভারী পানি ও অতি ভারী পানি থাকে।

শুধুমাত্র অক্সিজেন নয়, অন্যান্য পদার্থের সঙ্গেও হাইড্রোজেনের তিনটি প্রকারভেদ- হালকা, ভারী ও অতি ভারী একই রকম আচরণ করে।

দেখা যাচ্ছে যে, পরমাণুর নিউক্লিয়াসে নিউট্রন যুক্ত হওয়ার ফলে শুধু ভরই বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু এর আচরণে কোন প্রভাব পড়েনি এবং অন্যান্য পদার্থের পরমাণুর সঙ্গেও একই রকম আচরণ করছে।

সাধারণত যে কোন একটি পদার্থের সকল পরমাণুর গঠন একই রকম এবং অন্য পদার্থের পরমাণুর গঠন থেকে আলাদা। তবে একই পদার্থের বিভিন্ন পরমাণুর গঠনও আলাদা হতে পারে। গঠনের পার্থক্য গড়ে দেয় শুধু নিউট্রনের সংখ্যা। কোন একটি পদার্থের ভিন্ন সংখ্যক নিউট্রন ধারণকারী পরমাণুগুলোকে পদার্থবিদরা নাম দিয়েছেন 'আইসোটোপ'।

কৃতজ্ঞতা: রুশ রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি কর্পোরেশন- রোসাটম

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ

বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন এনআইএইপি- এএসই, রাশিয়া এবং

পরমাণু শক্তি তথ্য কেন্দ্র, ঢাকা

আরও পড়ুন