একুশে ২১
রসায়ন যেখানে পানির মতো সহজ
একবিংশ শতাব্দী এখনও চলছে, কিন্তু এই সময়টাই আমাদের ভাবনার ভাষা বদলে দিচ্ছে। আগে যেসব প্রশ্নের উত্তর সহজ মনে হতো, সেগুলো এখন নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। মানুষ, জীবন, প্রকৃতি ও মহাবিশ্ব যেন ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। এই বদলের পেছনে আছে কিছু শক্তিশালী ধারণা। সেগুলো শুধু ল্যাবরেটরিতে সীমাবদ্ধ নয়, আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও প্রভাব ফেলছে। নিউ সায়েন্টিস্ট-এ প্রকাশিত তেমন ২১টি ধারণার সঙ্গে আমরা ধীরে ধীরে পরিচিত হব। সেগুলো একবিংশ শতাব্দীর চিন্তাজগৎকে নতুন পথে নিয়ে গেছে।
দ্বিতীয় পর্বে থাকছে ক্লিক কেমিস্ট্রি
রসায়ন মানেই কি শুধু গবেষণাগারের ধীরগতির কাজ? নানা রাসায়নিক মিশিয়ে আবার বহুকষ্টে তা আলাদা করা? না। ২০০১ সালে ব্যারি শার্পলেস ও তাঁর সহকর্মীরা নতুন একটি ধারণা নিয়ে আসেন। তাঁরা এর নাম দেন ক্লিক কেমিস্ট্রি। নামটি শার্পলেসের স্ত্রী জ্যানেট ডিউজারের দেওয়া। শব্দটি দিয়ে এমন বিক্রিয়া বোঝানো হয়েছে, যা দ্রুত ও ধারাবাহিকভাবে সফল হয়। শুনতে খুব সাধারণ মনে হলেও ঠিক এটাই ক্লিক রসায়নের অসাধারণত্ব। শার্পলেস এবং তাঁর সহকর্মী হার্টমুথ সি কোল্ব ও এম. জি. ফিন এই নতুন বিক্রিয়াগুলোকে স্প্রিং-লোডেড হিসেবে অভিহিত করেন।
ধারণাটি হলো, বিভিন্ন ধরনের কিছু প্রাথমিক রাসায়নিক পদার্থের সঙ্গে অণুগুলোকে জুড়ে দেওয়া। ঠিক ধাঁধা বা পাজলের মতো। আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটি বিষয়টিকে ব্যাগের ফিতার উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করেছে। ব্যাগের দুই প্রান্তের ফিতা যেমন কাছাকাছি আনলেই ক্লিক করে আটকে যায়, এখানেও ঠিক তাই ঘটে। মাঝখানের টুকরোগুলো কী, তা খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। আসল কথা হলো সংযোগ তৈরি করা। রসায়নের মতো জটিল বিষয়ে এই ক্লিক ধারণাটি ভীষণ সহজ হয়ে ধরা দিয়েছে।
রসায়নের ভাষায়, এ ধরনের রাসায়নিক বিক্রিয়ায় নির্দিষ্ট জোড়া বিকারক শুধু একে অপরের সঙ্গেই বিক্রিয়া করে। গবেষকেরা এখানে প্রথাগত কার্বন-কার্বন বন্ধন তৈরির পথে হাঁটেননি। তাঁরা কার্বন ও অক্সিজেন বা নাইট্রোজেনের মতো ভিন্নধর্মী পরমাণুর সংযোগ ঘটিয়েছেন। সবচেয়ে পরিচিত ক্লিক বিক্রিয়াটি দুটি উপাদানকে জুড়ে দিয়ে একটি রিং তৈরি করে। এই কাঠামোটি প্রোটিনের মতো বড় জৈব অণুর সঙ্গে সহজেই খাপ খাইয়ে নিতে পারে। ফলে ওষুধ তৈরিতে এটি বিশেষভাবে কার্যকর।
ক্লিক কেমিস্ট্রি নামটি শার্পলেসের স্ত্রী জ্যানেট ডিউজারের দেওয়া। শব্দটি দিয়ে এমন বিক্রিয়া বোঝানো হয়েছে, যা দ্রুত ও ধারাবাহিকভাবে সফল হয়।
শার্পলেসের পাশাপাশি কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নবিদ মর্টেন মেলডালও স্বতন্ত্রভাবে এটি নিয়ে কাজ করছিলেন। তাঁদের এই আবিষ্কার ব্যবহার করেই তৈরি হয়েছে খিঁচুনি-নিয়ন্ত্রক ওষুধ রুফিনামাইড। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নবিদ টম ব্রাউনের মতে, এই বিক্রিয়াটি সহজ, সুনির্দিষ্ট এবং প্রায় যেকোনো দ্রাবকে কাজ করে।
শুরুর দিকে ক্লিক বিক্রিয়ায় তামার ব্যবহার ছিল। কিন্তু জীবকোষের জন্য এটা বিষাক্ত। এই সমস্যার সমাধান করেন স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নবিদ ক্যারোলিন বার্তোজ্জি। তিনি এমন একধরনের ক্লিক বিক্রিয়া উদ্ভাবন করেন, যা কোনো বিষাক্ত অনুঘটক ছাড়াই কাজ করে। ফলে জীবন্ত কোষের ক্ষতি না করেই এর ভেতরে রসায়নের প্রয়োগ সম্ভব হয়। ব্রিটেনের এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নবিদ অ্যালিসন হালম মনে করেন, ক্লিক রসায়ন একটি মহান আইডিয়া।
এর ফলে জীববিজ্ঞানীরা এখন ইচ্ছেমতো প্রোটিন ও অন্যান্য জৈব যন্ত্রাংশ জুড়ে দিতে পারেন এবং সেগুলোতে ফ্লুরোসেন্ট ট্যাগ লাগিয়ে কোষের ভেতরের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। এটি জীববিজ্ঞানীদের জন্য রসায়নকে অনেক সহজ করে দিয়েছে। নির্দিষ্ট ও নির্ভরযোগ্য রাসায়নিক বন্ধন তৈরির এই যুগান্তকারী কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২২ সালে শার্পলেস, মেলডাল এবং বার্তোজ্জি রসায়নে নোবেল পেয়েছেন।