প্লাস্টিকে খাবার মোড়ালে কি খাবারের ক্ষতি হয়
খাবার ভালো রাখতে এখন সবখানেই প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয়। বাজারের সবজি, কাঁচা মাংস কিংবা রান্না করা খাবার আমরা প্লাস্টিকের প্যাকেটে মুড়ে রাখি। এতে জীবাণু ও বাতাস থেকে খাবার কিছুটা সুরক্ষিত থাকে। খাবারের পানিও সহজে শুকায় না। ফলে খাবার বেশিক্ষণ ভালো থাকে। কিন্তু এই প্লাস্টিকই কি খাবারের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে? উত্তর হলো, কিছু ক্ষেত্রে পারে। বিশেষ করে প্লাস্টিকের সঙ্গে খাবারের দীর্ঘ সময় সংস্পর্শ থাকলে হতে পারে কিছু সমস্যাও। তাছাড়া উচ্চ তাপমাত্রায় খাবারে মিশে যেতে পারে প্লাস্টিকের কিছু রাসায়নিক উপাদান। তবে সব ধরনের প্লাস্টিকের মোড়ক খাবারের জন্য সমান ঝুঁকিপূর্ণ নয়।
তাপের প্রতি আচরণের ওপর ভিত্তি করে প্লাস্টিককে থার্মোপ্লাস্টিক ও থার্মোসেট, দুই ভাগে ভাগ করা যায়। থার্মোপ্লাস্টিক তাপে গলে যায়, ঠান্ডা হলে শক্ত হয়। এদের বারবার গলিয়ে নতুন আকার দেওয়া যায়। অন্যদিকে, থার্মোসেট একবার উত্তপ্ত হলে স্থায়ী আকার ধারণ করে। এগুলো অনেক শক্ত ও তাপপ্রতিরোধী হয়। নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, খাবার মোড়ানোর জন্য থার্মোপ্লাস্টিকই সবচেয়ে পছন্দের পলিমার!
আগে খাবার মোড়ানোর জন্য পলিভিনাইল ক্লোরাইড বা পিভিসি ব্যবহার করা হতো। পিভিসি এক ধরনের থার্মোপ্লাস্টিক। তবে এটি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। তাই এখন এর বদলে অন্য পলিমার বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে।
তাপের প্রতি আচরণের ওপর ভিত্তি করে প্লাস্টিককে থার্মোপ্লাস্টিক ও থার্মোসেট, দুই ভাগে ভাগ করা যায়। থার্মোপ্লাস্টিক তাপে গলে যায়, ঠান্ডা হলে শক্ত হয়। এদের বারবার গলিয়ে নতুন আকার দেওয়া যায়।
খাবার মোড়ানোর জন্য বর্তমানে লো-ডেনসিটি পলিইথিলিন বা এলডিপিই বেশ জনপ্রিয়। এটি হালকা ও নমনীয়। এটি বাতাস ও জীবাণুর চলাচল ঠেকাতে পারে। খাবার থেকে পানি বেরিয়ে যাওয়াও কমায়। ফলে খাবার দ্রুত শুকিয়ে যায় না। ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে প্লাস্টিককে সাধারণত সাতটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে এলডিপিই হলো ৪ নম্বর শ্রেণির প্লাস্টিক।
প্লাস্টিক আর খাবারের মধ্যে সব সময়ই কিছু না কিছু আদান-প্রদান ঘটে। বিজ্ঞানীরা এই আদান-প্রদানকে প্রধানত তিনভাবে ব্যাখ্যা করেন। এগুলো হলো—শোষণ, মাইগ্রেশন ও পারমিয়েশন। শোষণ হলো খাবারের কোনো উপাদান প্লাস্টিকের মধ্যে ঢুকে পড়া। যেমন, খাবারের পানি অনেক সময় প্লাস্টিক শুষে নিতে পারে। আবার কিছু প্লাস্টিক খুব সহজেই চর্বির সঙ্গে মিশে যায়। তাই চর্বিযুক্ত খাবার রাখলে সেই চর্বিও প্লাস্টিকে ঢুকে যেতে পারে। এতে খাবারের স্বাদ ও গঠনে পরিবর্তন আসে।
অন্যদিকে মাইগ্রেশন হলো প্লাস্টিকের উপাদান খাবারে চলে যাওয়া। প্লাস্টিক তৈরির সময় বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ যোগ করা হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব রাসায়নিকের কিছু অংশ প্লাস্টিক থেকে বেরিয়ে খাবারে মিশতে পারে। প্লাস্টিকের খুব ক্ষুদ্র অংশও অনেক সময় খাবারে চলে আসে। বিশেষ করে তাপমাত্রা বাড়লে এই প্রক্রিয়া আরও দ্রুত হয়। মাইক্রোওয়েভ ওভেনে সাধারণ প্লাস্টিকে মোড়ানো খাবার গরম করা একেবারেই ঠিক নয়। তবে প্লাস্টিক যদি ওভেনে ব্যবহারের উপযোগী হয়, তাহলে ভিন্ন কথা। কারণ তাপের প্রভাবে প্লাস্টিক থেকে রাসায়নিক পদার্থ খাবারে মিশে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
প্লাস্টিক আর খাবারের মধ্যে সব সময়ই কিছু না কিছু আদান-প্রদান ঘটে। বিজ্ঞানীরা এই আদান-প্রদানকে প্রধানত তিনভাবে ব্যাখ্যা করেন। এগুলো হলো—শোষণ, মাইগ্রেশন ও পারমিয়েশন।
আরেকটি প্রক্রিয়া হলো পারমিয়েশন। এর মাধ্যমে প্লাস্টিকের ভেতর দিয়ে গ্যাস বা তরল এক দিক থেকে অন্য দিকে যেতে পারে। বাইরে থেকে অক্সিজেন খাবারে ঢুকতে পারে। আবার খাবারের ভেতরের কিছু উপাদান বাইরেও বেরিয়ে যেতে পারে। বাতাসে থাকা অক্সিজেন ঢুকে গেলে চর্বিযুক্ত খাবার নষ্ট হওয়ার একটি প্রক্রিয়া শুরু হয়। একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে র্যান্সিডিটি। ফলে খাবারে বাজে গন্ধ ও বিস্বাদ তৈরি হয়। কখনো কখনো ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থও তৈরি হতে পারে।
প্লাস্টিক তৈরির সময় ব্যবহৃত বিভিন্ন রাসায়নিক নিয়ে বিজ্ঞানীদের উদ্বেগ আছে। যেমন, প্লাস্টিসাইজার নামে কিছু রাসায়নিক পদার্থ প্লাস্টিককে নমনীয় বা নরম করতে সাহায্য করে। পিভিসির তৈরি প্লাস্টিক মোড়কে এ ধরনের পদার্থ ব্যবহৃত হতে পারে। এর মধ্যে ডিইএইচএ নামের একটি প্লাস্টিসাইজার রয়েছে। এটি দীর্ঘ সময় খাবারের সংস্পর্শে থাকলে খাবারে মিশে যেতে পারে। বেশি তাপমাত্রায় রাখলেও একই ঘটনা ঘটে। তবে বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত এলডিপিই মোড়কে সাধারণত এমন প্লাস্টিসাইজারের প্রয়োজন হয় না। কারণ, এই প্লাস্টিকটি এমনিতেই যথেষ্ট নমনীয়।
বাতাসে থাকা অক্সিজেন ঢুকে গেলে চর্বিযুক্ত খাবার নষ্ট হওয়ার একটি প্রক্রিয়া শুরু হয়। একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে র্যান্সিডিটি। ফলে খাবারে বাজে গন্ধ ও বিস্বাদ তৈরি হয়।
পলিইথিলিন আবার চর্বির প্রতি বেশ আকর্ষণীয়। তাই চর্বিযুক্ত খাবারের সংস্পর্শে এলে খাবারের চর্বি প্লাস্টিকের ভেতরে শোষিত হতে পারে। এতে খাবারের স্বাদ বা গঠনে পরিবর্তন আসে। প্লাস্টিকে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্টও বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এসব রাসায়নিক প্লাস্টিককে অক্সিজেনের কারণে নষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করে। কিন্তু তাপমাত্রা বাড়লে বা খাবারে চর্বির পরিমাণ বেশি থাকলে অন্য সমস্যা দেখা দেয়। তখন এসব রাসায়নিকের কিছু অংশ প্লাস্টিক থেকে বেরিয়ে সোজা খাবারে চলে আসতে পারে।
খাবার ও প্লাস্টিকের মধ্যে সরাসরি সংস্পর্শ কমানোর জন্য প্লাস্টিকের ওপর জৈব আবরণ ব্যবহারের বিষয়ে গবেষণা চলছে। তবে সব ধরনের জৈব আবরণ সমান কার্যকর নয়। কিছু জৈব আবরণের উপাদানও অস্থিতিশীল হয়ে খাবারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এসব বিষয় নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো কাজ করছে। উদাহরণ হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কথা বলা যায়। তারা ২০২৫ সাল থেকে খাবারের সংস্পর্শে আসা উপকরণে বিসফেনল-এ বা বিপিএ এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত কয়েকটি রাসায়নিক নিষিদ্ধ করেছে। এর আগেও ইউরোপীয় খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ বিপিএ-এর গ্রহণযোগ্য দৈনিক মাত্রা অনেক কমিয়ে দিয়েছিল।
তাপমাত্রা বাড়লে বা খাবারে চর্বির পরিমাণ বেশি থাকলে অন্য সমস্যা দেখা দেয়। তখন এসব রাসায়নিকের কিছু অংশ প্লাস্টিক থেকে বেরিয়ে সোজা খাবারে চলে আসতে পারে।
তবে প্লাস্টিকের মোড়ককে একেবারে খারাপ বলারও কোনো সুযোগ নেই। এটি খাবারকে জীবাণু, বাতাস ও অতিরিক্ত আর্দ্রতা থেকে রক্ষা করে। খাবারের সংরক্ষণকাল বাড়াতে সাহায্য করে। ফলে খাবার নষ্ট হওয়ার পরিমাণ কমে, খাদ্য অপচয়ও রোধ করা যায়। তাই আসল বিষয়টি হলো, আমরা প্লাস্টিক কীভাবে ব্যবহার করছি। সবচেয়ে সহজ নিয়ম হলো, খাবার ও প্লাস্টিকের মধ্যে সরাসরি সংস্পর্শ কমানো। প্লাস্টিক মোড়ক দিয়ে খাবার ঢাকার সময় সামান্য ফাঁকা জায়গা রাখা ভালো।
বিশেষ করে চর্বিযুক্ত বা গরম খাবারের সঙ্গে প্লাস্টিকের সরাসরি সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে হবে। খাবার গরম করার সময়ও বাড়তি সতর্কতা দরকার। প্লাস্টিকে মোড়ানো খাবার সরাসরি মাইক্রোওয়েভ ওভেনে দেওয়া উচিত নয়। মাইক্রোওয়েভ ওভেনে ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত প্লাস্টিক হলেই কেবল তা ব্যবহার করা যাবে। সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি হলো, খাবারটি কাচ বা উপযুক্ত সিরামিকের পাত্রে নিয়ে তারপর গরম করা।