হাজার বছর পরও সোনা কেন চকচক করে

স্বর্ণ বছরের পর বছর ধরে একই রকমভাবে দ্যুতি ছড়ায় কীভাবে?ছবি: দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া

গয়নার জগতে স্বর্ণের জুড়ি মেলা ভার। রুপার গয়না কিছুদিন পরই কালো হয়ে যায়। তামার জিনিস কালচে বা সবুজাভ বর্ণ ধারণ করে। আর লোহার তৈরি জিনিসে ঠিকঠাকমতো গ্যালভানাইজ বা দস্তার প্রলেপ দেওয়া না থাকলে কয়েক দিনেই মরিচা পড়ে যায়। কিন্তু স্বর্ণ? সে তো বছরের পর বছর ধরে একই রকম দ্যুতি ছড়ায়। এ জন্যই সেই আদিকাল থেকেই মানুষের কাছে স্বর্ণ এত জনপ্রিয়। অত্যন্ত গরিব মানুষের মুখেও আক্ষেপ শোনা যায়, ‘মেয়েকে একটু সোনা না দিলে কি হয়!’

স্বর্ণের জৌলুশ দেখে আমাদের চোখ যতই চকচক করুক না কেন, গবেষকেরা এতে মোটেই খুশি নন। এত মূল্যবান একটি ধাতু, কিন্তু এর রাসায়নিক ব্যবহার এত কম কেন? এই প্রশ্ন অনেক দিন ধরেই ঘুরপাক খাচ্ছিল বিজ্ঞানীদের মনে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের তুলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় বিষয়টি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বিজ্ঞানী ম্যাথু মন্টেমোর ও তাঁর সহযোগীরা স্বর্ণের বাইরের পৃষ্ঠের পুনর্গঠন নিয়ে গবেষণা করছিলেন। বিজ্ঞানের পরিভাষায় একে বলা হয় গোল্ড সারফেস রিকনস্ট্রাকশন। এটি আসলে কী? তা জানার আগে হলুদ রঙের এই ধাতুর কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।

আরও পড়ুন
স্বর্ণের টুকরোকে কাটলে এর সদ্য উন্মুক্ত তলে থাকা পরমাণুগুলো অতি দ্রুত ষড়ভুজাকার জ্যামিতিক গঠনে নিজেদের পুনর্বিন্যস্ত করে নেয়। এ অবস্থায় পরমাণুগুলো সর্বনিম্ন শক্তিস্তরে অবস্থান করে।

স্বর্ণ রাসায়নিকভাবে একটি নিষ্ক্রিয় পদার্থ। এটি বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন অণু, বিশেষ করে অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে না। স্বর্ণের এই গুণের জন্যই এর এত চাহিদা। কিন্তু এর এই রাসায়নিক সীমাবদ্ধতাই গবেষকদের চিন্তার কারণ। বিজ্ঞানীরা ভাবছেন, স্বর্ণের নিষ্ক্রিয়তাকে যদি কোনোভাবে কমানো যায়, তবে এটি শিল্পক্ষেত্রে খুব ভালো অনুঘটক বা বিক্রিয়া ত্বরান্বিতকারী হিসেবে কাজ করতে পারবে। সে জন্য বিজ্ঞানীদের সবার আগে স্বর্ণের এই নিষ্ক্রিয়তার রহস্য জানতে হবে।

স্বর্ণ রাসায়নিকভাবে একটি নিষ্ক্রিয় পদার্থ
ছবি: রয়টার্স

স্বর্ণের পরমাণুগুলো যখন স্বাভাবিক বা উন্মুক্ত অবস্থায় থাকে, তখন তারা সাধারণত চারকোনা বা বর্গাকার জ্যামিতিক বিন্যাসে সজ্জিত থাকে। বিজ্ঞানী মন্টেমোর ও তাঁর দল কম্পিউটার সিমুলেশনের মাধ্যমে দেখান, স্বর্ণ যদি এই চারকোনা বিন্যাস ধরে রাখত, তবে তা মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বাতাসের অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে কালচে হয়ে যেত। অর্থাৎ এর জারণ ঘটত। কিন্তু একটি স্বর্ণের টুকরোকে কাটলে এর সদ্য উন্মুক্ত তলে থাকা পরমাণুগুলো অতি দ্রুত ষড়ভুজাকার জ্যামিতিক গঠনে নিজেদের পুনর্বিন্যস্ত করে নেয়। এ অবস্থায় পরমাণুগুলো সর্বনিম্ন শক্তিস্তরে অবস্থান করে। ফলে তাদের আর নতুন করে পুনর্বিন্যস্ত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা থাকে না এবং এরা অক্সিজেনের সঙ্গেও কোনো বিক্রিয়া করে না।

আরও পড়ুন
পরমাণুর নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকা ইলেকট্রনগুলো নিজেদের মধ্যে কীভাবে মিথস্ক্রিয়া করছে কিংবা পরমাণুগুলো কোন শক্তিস্তরে রয়েছে, তা ডিএফটি তত্ত্ব প্রয়োগ করে নিখুঁতভাবে গণনা করা যায়।

সাধারণত কোনো ধাতুর গায়ে মরিচা পড়ার প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপটি শুরু হয় বাতাস থেকে। বাতাসে থাকা অক্সিজেনের অণুকে ভেঙে দুটি আলাদা অক্সিজেন পরমাণুতে রূপান্তরিত করার মাধ্যমেই মরিচা ধরার শুরু হয়। মন্টেমোরের গবেষণা অনুযায়ী, স্বর্ণের চারকোনা বিন্যাসটি অক্সিজেনের অণুকে ভাঙতে সাহায্য করে। কিন্তু স্বর্ণের পৃষ্ঠদেশে থাকা পরমাণুগুলো যখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে ষড়ভুজাকার নকশায় পুনর্বিন্যস্ত হয়ে যায়, তখন সেখানে অক্সিজেনের অণুকে ভাঙার জন্য তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি শক্তির দরকার হয়। অর্থাৎ শক্তির বাধা বা এনার্জি ব্যারিয়ার বহুগুণ বেড়ে যায়। ফলে অক্সিজেনের অণুগুলো আর ভাঙতে পারে না এবং রাসায়নিক বিক্রিয়াটিও সেখানেই থমকে যায়।

এ কাজে কীভাবে সফলতা পেলেন তুলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা?

পরমাণুর ভেতরে থাকা ইলেকট্রনের আচরণ পরখ করে দেখাই ছিল মন্টেমোর ও তাঁর দলের প্রধান কাজ। সাধারণ অণুবীক্ষণ যন্ত্র বা মাইক্রোস্কোপের সাহায্যে এই সূক্ষ্ম কণাদের গতিবিধি বোঝা সম্ভব নয়। সে জন্য এই কাজে তাঁরা সুপার কম্পিউটারের সাহায্যে সিমুলেশন পদ্ধতির সাহায্য নেন। এ ক্ষেত্রে ডেনসিটি ফাংশনাল থিওরি বা ডিএফটি নামে একটি শক্তিশালী কোয়ান্টাম মেকানিক্যাল সিমুলেশন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। পরমাণুর নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকা ইলেকট্রনগুলো নিজেদের মধ্যে কীভাবে মিথস্ক্রিয়া করছে কিংবা পরমাণুগুলো কোন শক্তিস্তরে রয়েছে, তা এই ডিএফটি তত্ত্ব প্রয়োগ করে নিখুঁতভাবে গণনা করা যায়।

আরও পড়ুন
স্বর্ণের পৃষ্ঠদেশে থাকা পরমাণুগুলো যখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে ষড়ভুজাকার নকশায় পুনর্বিন্যস্ত হয়ে যায়, তখন সেখানে অক্সিজেনের অণুকে ভাঙার জন্য তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি শক্তির দরকার হয়।

গবেষকেরা স্বর্ণের দুটি প্রধান কেলাসাকার বা স্ফটিকাকার পৃষ্ঠের ত্রিমাত্রিক ডিজিটাল মডেল তৈরি করেন। পৃষ্ঠ দুটির নাম দেওয়া হয় এইউ (১০০) ও এইউ (১১০)। এর মধ্যে এইউ (১০০) পৃষ্ঠে স্বর্ণের পরমাণুগুলো ষড়ভুজাকার বিন্যাসে সজ্জিত থাকে। অন্যদিকে এইউ (১১০) পৃষ্ঠটি তুলনামূলক কম স্থিতিশীল ও উচ্চ শক্তিবিশিষ্ট, যেখানে স্বর্ণের পরমাণুগুলো বর্গাকার লাইনে সাজানো থাকে।

তাত্ত্বিকভাবে বিজ্ঞানীরা অক্সিজেনের অণুকে এই দুটি আলাদা পৃষ্ঠে ফেলে পরীক্ষা করেন। তাঁরা গণনা করে দেখান, অক্সিজেনের অণুটি যখন এইউ (১১০) পৃষ্ঠের কাছে আসে, তখন সেটি খুব সহজেই দুটি আলাদা অক্সিজেন পরমাণুতে ভেঙে যায়। কিন্তু যখনই অক্সিজেনের অণুটি ষড়ভুজাকার নকশাবিশিষ্ট স্বর্ণের পৃষ্ঠের এইউ (১০০)-এর ওপর পড়ে, তখন কম্পিউটারের গ্রাফে দেখা যায়, অক্সিজেন ভাঙার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তির দেয়াল হঠাৎ বহুগুণ বেড়ে গেছে।

এই তাত্ত্বিক সিমুলেশন থেকে তাঁরা আরও দেখান, অক্সিজেনের অণুটি যদি কোনোভাবে ওই ষড়ভুজাকার স্বর্ণের বিন্যাসকে ভাঙতে চায়, তবে স্বর্ণকে প্রথমে জোর করে তার আগের চারকোনা বিন্যাসে ফিরিয়ে আনতে হবে। এই পরিবর্তনের জন্য যে বিপুল পরিমাণ শক্তির প্রয়োজন, তা সাধারণ কক্ষ তাপমাত্রায় বাতাসে থাকা অক্সিজেনের থাকে না। সে জন্য অক্সিজেনের অণু  স্বর্ণের সঙ্গে বিক্রিয়া করতে পারে না। স্বর্ণের এই প্রাকৃতিক ও স্বতঃস্ফূর্ত পুনর্বিন্যাস আদতে একপ্রকার নিখুঁত অ্যাটমিক বর্ম বা পারমাণবিক ঢাল হিসেবে কাজ করে।

আরও পড়ুন
বিজ্ঞানীরা দেখান যে, অক্সিজেনের অণুটি যদি কোনোভাবে ওই ষড়ভুজাকার স্বর্ণের বিন্যাসকে ভাঙতে চায়, তবে স্বর্ণকে প্রথমে জোর করে তার আগের চারকোনা বিন্যাসে ফিরিয়ে আনতে হবে।

বিজ্ঞানী মন্টেমোর ও তাঁর দল গণনা করে দেখেছেন, সারফেস রিকনস্ট্রাকশন বা পৃষ্ঠতল পুনর্গঠনের এই চমৎকার আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থার কারণে স্বর্ণের অক্সিডেশন বা কালচে হওয়ার গতি ১ লাখ কোটি গুণ পর্যন্ত কমে যায়। এ কারণেই হাজার বছর ধরে মাটির নিচে বা সাগরের তলদেশে পড়ে থাকা স্বর্ণের গয়না আজও একই রকম চকচকে থাকে।

এই আবিষ্কার যে শুধু স্বর্ণের রহস্যই উন্মোচন করেছে, তা নয়; বরং এটি রসায়নশিল্পে এক বড় বিপ্লব ঘটাতে পারে। স্বর্ণকে বিভিন্ন শিল্পকারখানায় অনুঘটক হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। ফলে রাসায়নিক বিক্রিয়ার গতি অনেক ত্বরান্বিত হবে। মন্টেমোরের এই মডেল ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা এখন কৃত্রিমভাবে স্বর্ণের পৃষ্ঠের নকশা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। এটি পরিবেশবান্ধব শক্তি উৎপাদন ও নতুন নতুন রাসায়নিক পদার্থের, বিশেষত স্মার্ট মেটেরিয়ালস বা বুদ্ধিমান বস্তু তৈরিতে বেশ সহায়ক হবে।

স্মার্ট মেটেরিয়ালস হলো এমন কিছু বিশেষ পদার্থ, যা তাপমাত্রা, চাপ বা বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রের মতো বাইরের পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের বৈশিষ্ট্য বদলাতে পারে। এটি সম্ভব হলে হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল বা পরিবেশবান্ধব শক্তির জগতে এক নতুন যুগের সূচনা হবে।

লেখক: পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, পশ্চিমবঙ্গ বিচার সহায়ক বিজ্ঞান পরীক্ষাগার, কলকাতা, ভারত

সূত্র: ফিজিক্যাল রিভিউ লেটার্স

আরও পড়ুন