খাবারে সোনা কি স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ

সোনা খেলে শরীরের ওপর কি কোনো প্রভাব পরবে?ছবি: পিক্সেলফিট/গেটি ইমেজ

অভিজাত রেস্তোরাঁগুলোর মেন্যুতে ইদানীং সোনায় মোড়ানো খাবার দেখা যায়। ঢাকার কিছু রেস্তোরাঁতেও সোনা মোড়ানো জিলাপি বিক্রি হতে দেখা যায়। দামি মিষ্টির ওপর সোনার পাতলা প্রলেপ এখন আভিজাত্যের নতুন ট্রেন্ড। তবে সোনার প্রতি মানুষের আকর্ষণ কেবল আজকের নয়। প্রাচীনকাল থেকেই সোনা আভিজাত্য ও ক্ষমতার চিহ্ন হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, গয়না হিসেবে যে সোনা গায়ে পরা হয়, তা কি সত্যিই খাওয়া যায়? যেখানে সোনার নিজস্ব কোনো স্বাদ বা গন্ধ নেই, সেখানে কেবল আভিজাত্য দেখানোর জন্য সোনা খাওয়ার কারণই-বা কী? খেলে শরীরের ওপর কি কোনো প্রভাব পরবে?

কয়েক শ বছর আগে থেকেই ইউরোপের বিভিন্ন পিঠাপুলি বা পেস্ট্রিতে এবং জাপানি গ্রিন টিতে সাজসজ্জার জন্য সোনার গুঁড়ো বা পাতলা পাত ব্যবহার করা হয়ে আসছে। এখন পর্যন্ত সোনা খেয়ে কারও মারা যাওয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অবশ্য মুভির কাল্পনিক গল্পের বিষয়টা ভিন্ন!

আরও পড়ুন
বিশেষজ্ঞদের মতে, খাবারের জন্য ব্যবহৃত সোনার পাতে অন্তত ৯০ শতাংশ খাঁটি সোনা থাকতে হবে। বাকি ১০ শতাংশ রুপার মতো নিরাপদ ধাতু হতে পারে।

খাবারের সোনা ও গয়নার সোনা কি এক

সোনা একটি নিষ্ক্রিয় ধাতু। মানে সোনা সাধারণ অবস্থায় বাতাস, পানি বা অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে না। আমরা গয়না হিসেবে যে সোনা ব্যবহার করি, খাবারে ব্যবহৃত সোনা তার চেয়ে আলাদা। গয়নার সোনায় অন্য ধাতু মেশানো থাকে, যা খেলে শরীরের জন্য বিষাক্ত হতে পারে। তবে খাবারে ব্যবহারের জন্য সোনা অবশ্যই ২৩ থেকে ২৪ ক্যারেটের হতে হবে।

ইউরোপে এই খাদ্যোপযোগী সোনাকে ‘ই-১৭৫’ বলা হয়। ইউরোপীয় খাদ্য সুরক্ষা প্রশাসন ১৯৭৫ সালে প্রথমবার ও পরে ২০১৬ সালে পুনরায় এই ধাতুর নিরাপত্তা পরীক্ষা করে।

সোনা কেক সাজানোর জন্যও ব্যবহৃত হয়
ছবি: উইকিপিডিয়া

এটি মূলত কেক, চকলেট বা দামি পানীয় সাজানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। এই সোনা পুরোপুরি স্বাদহীন এবং এর কোনো গন্ধ নেই। এটি একটি নিষ্ক্রিয় ধাতু। তাই খাওয়ার পর এটি শরীরে শোষিত হয় না। অর্থাৎ, হজম না হয়েই শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। সাধারণত ২৩ থেকে ২৪ ক্যারেট বিশুদ্ধতার সোনা অল্প পরিমাণে খাওয়া নিরাপদ হিসেবে স্বীকৃত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, খাবারের জন্য ব্যবহৃত সোনার পাতে অন্তত ৯০ শতাংশ খাঁটি সোনা থাকতে হবে। বাকি ১০ শতাংশ রুপার মতো নিরাপদ ধাতু হতে পারে। নিষ্ক্রিয় ধাতু হওয়ায় এটি হজম প্রক্রিয়ার সময় রাসায়নিকভাবে ভেঙে যায় না। খাওয়ার যোগ্য সোনা আমাদের রক্তেও মিশে যায় না। এটি পরিপাকতন্ত্রের ভেতর দিয়ে গিয়ে সরাসরি বর্জ্য হিসেবে শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। তবে এটি সোনা খাওয়ার পরিমাণ ও আকারের ওপরও নির্ভর করতে পারে।

আরও পড়ুন
ইউরোপে খাদ্যোপযোগী সোনাকে ই-১৭৫ বলা হয়। ইউরোপীয় খাদ্য সুরক্ষা প্রশাসন ১৯৭৫ সালে প্রথমবার ও পরে ২০১৬ সালে পুনরায় এই ধাতুর নিরাপত্তা পরীক্ষা করে।

গবেষণা কী বলে

খাদ্য উপাদান হিসেবে সোনার ক্ষতিকর দিক নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণার পরিমাণ বেশ কম। ইউরোপীয় খাদ্য সুরক্ষা প্রশাসন জানিয়েছে, খাবারে ব্যবহৃত সোনার বিষাক্ততা বা বিশুদ্ধতা নিয়ে পর্যাপ্ত তথ্য নেই। এই তথ্যের অভাব দূর করতে গবেষকেরা দাঁতের চিকিৎসায় ব্যবহৃত সোনার ফিলিংয়ের তথ্য ব্যবহার করেছেন।

কয়েক দশক ধরে দাঁতে সোনার ব্যবহার থেকে দেখা গেছে, এটি শরীরে খুব একটা খারাপ প্রভাব ফেলে না। বড়জোর যাদের সোনার প্রতি অ্যালার্জি আছে, তাদের শরীরে র‍্যাশ বা ফুসকুড়ি হতে পারে। যাদের দাঁতে সোনার ফিলিং আছে, তাদের লালা পরীক্ষা করে দেখা গেছে, তারা অজান্তেই সোনার কণা গিলে ফেলছেন। এতে তাঁদের কোনো ক্ষতি হচ্ছে না।

কয়েক দশক ধরে দাঁতে সোনার ব্যবহার থেকে দেখা গেছে, এটি শরীরে খুব একটা খারাপ প্রভাব ফেলে না
ছবি: ডেন্টিস্ট বিউফোর্ট এসসি

ওষুধের ক্ষেত্রেও সোনার ব্যবহার বেশ পুরোনো। কিছু গবেষণা অনুযায়ী, এই ধাতুর প্রদাহ কমানোর ক্ষমতা রয়েছে। সোনা থেকে একমাত্র বিপদ হতে পারে যদি এর অতিক্ষুদ্র কণা, অর্থাৎ ন্যানোপার্টিকেল সরাসরি শরীরের কোষে ইনজেকশনের মাধ্যমে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু সাধারণ সোনার কণা কোষের দেয়াল ভেদ করার মতো অতটা ক্ষুদ্র নয়, তাই সেই ঝুঁকি নেই বললেই চলে। কিছু পানীয়তে সোনার ন্যানোপার্টিকেল থাকলেও তা মানুষের শরীরের কোনো ক্ষতি করে বলে প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

খাবারে সোনার ব্যবহার সম্পর্কে এতক্ষণ যা বলা হয়েছে, তার সবই মূলত ইউরোপীয় গবেষণার ওপর ভিত্তি করে। মজার ব্যাপার হলো, যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এ বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম তৈরি করেনি। কারণ, এ নিয়ে পর্যাপ্ত তদন্ত বা গবেষণা এখনো হয়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র সোনাকে বিষাক্ত কোনো পদার্থ হিসেবে চিহ্নিত করেনি। অর্থাৎ, সরাসরি বললে সোনা কোনো বিষ নয়।

আরও পড়ুন
সোনা থেকে একমাত্র বিপদ হতে পারে যদি এর অতিক্ষুদ্র কণা, অর্থাৎ ন্যানোপার্টিকেল সরাসরি শরীরের কোষে ইনজেকশনের মাধ্যমে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়।

তাহলে কি খাওয়া উচিত

সোনা বিষ না হলেও একে নিয়মিত খাবারের তালিকায় না রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ। পুষ্টিবিদেরা সতর্ক করেছেন, এ বিষয়ে যেহেতু গভীর ও পর্যাপ্ত গবেষণা নেই, তাই খুব বিশেষ কোনো উৎসব বা অনুষ্ঠান ছাড়া সোনা না খাওয়াই ভালো। বিশেষজ্ঞদের মতে, সোনা দিয়ে সাজানো খাবার জীবনে এক-আধবার শখের বশে খাওয়া যেতে পারে।

পুষ্টিবিদদের মতে, খুব বিশেষ কোনো উৎসব বা অনুষ্ঠান ছাড়া সোনা না খাওয়াই ভালো
ছবি: অ্যামাজন ডট ইন

শেষ কথা হলো, সোনা খেলে শরীরের ঠিক কী হয়, সে সম্পর্কে আমাদের কাছে খুব বেশি তথ্য নেই। শুধু এটুকুই জানা গেছে, এটি হজম হয় না এবং মলত্যাগের সময় শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। তবে এটি অন্যান্য খাবারের সঙ্গে মিশে থাকে বলে আলাদাভাবে চেনা কঠিন।

লেখক: প্রদায়ক, বিজ্ঞানচিন্তা

সূত্র: গোল্ডশেফ, উইকিপিডিয়া, ফুড অ্যান্ড ওয়াইন ডটকম

আরও পড়ুন