জীবাণু ধ্বংসে কোনটি বেশি উপকারী, সাবান নাকি হ্যান্ড স্যানিটাইজার

সর্দি, কাশি, জ্বর ও ফ্লুর মতো অনাহুত অতিথিদের হাত থেকে বাঁচতে আমাদের প্রধান ঢাল দুটি—সাবান ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার। কিন্তু আমরা অনেকেই দ্বিধায় থাকি, কোনটি বেশি কার্যকর?

ভাইরাসের হাত থেকে বাঁচতে আমাদের প্রধান ঢাল দুটি—সাবান ও হ্যান্ড স্যানিটাইজারছবি: শাটারস্টোক ডটকম

আপনার হাতে হয়তো লাখ লাখ অদৃশ্য জীবাণু ওত পেতে আছে। এদের দমন করতে কোনটি ব্যবহার করবেন? আধুনিক হ্যান্ড স্যানিটাইজার নাকি আদি আমলের সাবান। চলুন বিশ্লেষণ করা যাক।

হ্যান্ড স্যানিটাইজার কীভাবে কাজ করে

হ্যান্ড স্যানিটাইজারের মূল শক্তি অ্যালকোহল। রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র বা সিডিসির মতে, ৬০ থেকে ৯৫ শতাংশ অ্যালকোহল সমৃদ্ধ স্যানিটাইজারগুলোই জীবাণু ধ্বংসে সবচেয়ে ভালো। এটি কাজ করে অনেকটা মরণ কামড়ের মতো। ব্যাকটেরিয়ার কোষের পর্দা ছিঁড়ে ফেলে বা তাদের প্রোটিন তৈরির প্রক্রিয়াকে ভণ্ডুল করে দেয় এই অ্যালকোহল। ভাইরাসের ক্ষেত্রে এটি তাদের বাইরের রক্ষাকবচ বা এনভেলপ ভেঙে দেয়। ফলে ভাইরাসের ভেতরের যন্ত্রপাতি বিকল হয়ে পড়ে এবং সে আর বংশবৃদ্ধি করতে পারে না। ২০২০ সালের করোনা মহামারির সময় আমরা এই কারণেই স্যানিটাইজারের পেছনে ছুটেছিলাম।

হ্যান্ড স্যানিটাইজার জীবাণুদের বিরুদ্ধে অনেকটা মরণ কামড়ের মতো কাজ করে
ছবি: মেরিটেক

তবে বাজারে কিছু অ্যালকোহলমুক্ত স্যানিটাইজার পাওয়া যায়। এতে ক্লোরহেক্সিডিনের মতো অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল উপাদান থাকে। তবে এগুলোর ব্যবহার মূলত স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র বা হাসপাতালেই সীমাবদ্ধ। বিজ্ঞানীদের মতে, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য স্যানিটাইজারে অন্তত ৬০ শতাংশ অ্যালকোহল থাকা জরুরি।

কিন্তু একটা সমস্যা আছে। সব ভাইরাসের কিন্তু এমন রক্ষাকবচ থাকে না। যেমন, নোরোভাইরাস বা শীতকালীন বমির ভাইরাস। স্যানিটাইজার এসব শক্ত চামড়ার ভাইরাসের কাছে হার মেনে যায়। তখনই আমাদের ফিরে যেতে হয় সেই পুরোনো আমলের সাবানের কাছে।

আরও পড়ুন
হ্যান্ড স্যানিটাইজারের মূল শক্তি অ্যালকোহল। রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র বা সিডিসির মতে, ৬০ থেকে ৯৫ শতাংশ অ্যালকোহল সমৃদ্ধ স্যানিটাইজারগুলোই জীবাণু ধ্বংসে সবচেয়ে ভালো।

সাবান যেভাবে কাজ করে

সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধোয়াকে বলতে পারেন জীবাণুর ওপর সম্মিলিত আক্রমণ। সাবানের অণুগুলোর গঠন বেশ মজার। এদের একটি মাথা ও একটি লেজ থাকে। বিজ্ঞানের ভাষায় মাথাটিকে বলা হয় হাইড্রোফিলিক (পানিপ্রেমী) এবং লেজটিকে বলা হয় হাইড্রোফোবিক (জলভীতি)।

আপনি যখন সাবান দিয়ে হাত ঘষেন, তখন এই হাইড্রোফোবিক লেজগুলো ত্বকের জীবাণু, তেল বা চর্বিকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে। এরা অনেকটা সাঁড়াশির মতো কাজ করে জীবাণুর গঠনকে অস্থিতিশীল করে তোলে। একই সঙ্গে ঘর্ষণের ফলে ত্বকের সঙ্গে জীবাণুর যে বন্ধন থাকে, তা আলগা হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত পানির তোড়ে সেই সব জীবাণু নর্দমায় গিয়ে পড়ে। অনেকে মনে করেন, অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল সাবান ছাড়া হয়তো জীবাণু মরবে না। কিন্তু সত্য হলো, বাজারের সাধারণ যেকোনো সাবানই এই কাজ করতে সক্ষম।

আরও পড়ুন
সাবানের অণুগুলোর গঠন বেশ মজার। এদের একটি মাথা ও একটি লেজ থাকে। বিজ্ঞানের ভাষায় মাথাটিকে বলা হয় হাইড্রোফিলিক এবং লেজটিকে বলা হয় হাইড্রোফোবিক।

তাহলে কোনটি সেরা

জীবাণুর লড়াইয়ে তাহলে কে জিতল? সাবান নাকি হ্যান্ড স্যানিটাইজার? সোজা উত্তর হলো, সাবান ও পানিই সেরা। আর স্যানিটাইজার হলো বড়জোর আপনার পকেটে থাকা একটি জরুরি ব্যাকআপ। কারণ স্যানিটাইজার সব ধরনের ভাইরাস মারতে পারে না, কিন্তু সাবান পারে।

জীবাণুর লড়াইয়ে সাবান আর হ্যান্ড স্যানিটাইজারের মধ্যে সাবানই সেরা
ছবি: সংগৃহীত

আবার আপনার হাত যদি ধুলোবালি বা ময়লায় নোংরা হয়ে থাকে, তবে স্যানিটাইজার কাজ করবে না। কিন্তু সাবান সেখানে শতভাগ সফল। সাবান সস্তা এবং এটি কেবল জীবাণু মারে না, হাত থেকে তাদের ধুয়ে সরিয়েও দেয়।

 

সূত্র: আইএফএল সায়েন্স

টীকা

১. নোরোভাইরাস এমন এক ধরনের অতি সংক্রামক, যা পাকস্থলী এবং অন্ত্রের প্রদাহ সৃষ্টি করে। একে সাধারণত স্টমাক ফ্লু বলে। এর বৈজ্ঞানিক নাম Norovirus। এই ভাইরাসের প্রকোপ শীতকালে বেশি দেখা যায় বলে একে শীতকালীন বমির ভাইরাস বলা হয়।

২. হাইড্রোফিলিক শব্দটি  দুটি গ্রিক শব্দ থেকে এসেছে। হাইড্রো মানে পানি, এবং ফিলিক মানে প্রিয় বা আকর্ষণ। অর্থাৎ যেসব পদার্থ খুব সহজেই পানির সঙ্গে মিশে যায় বা পানি শুষে নেয়, তাদের হাইড্রোফিলিক বলা হয়। যেমন: লবণ বা চিনি।

৩. হাইড্রোফোবিক হলো হাইড্রোফিলিকের ঠিক উল্টো। এর সহজ মানে হলো জলভীতি। অর্থাৎ পানিকে দূরে ঠেলে দেয়। হাইড্রো মানে পানি আর ফোবিক মানে ভয় বা বিকর্ষণ। যেসব পদার্থ পানির সঙ্গে মিশতে চায় না এবং পানি থেকে দূরে থাকতে চায়, তাদের হাইড্রোফোবিক বলা হয়। যেমন: তেল, চর্বি বা মোম।

আরও পড়ুন