এলিমেন্টস নিয়ে আয়োজিত হলো বিজ্ঞান বক্তৃতা
‘মহাবিশ্বের জ্যামিতি: এলিমেন্টস, নন-ইউক্লীডিয় জ্যামিতি এবং রিলেটিভিটি’ শিরোনামে আয়োজিত হলো বিজ্ঞান বক্তৃতা। ১ আগস্ট, শনিবার বিকেলে কারওয়ান বাজারের প্রগতি ভবনে প্রথম আলো কনফারেন্স রুমে এ বক্তৃতার আয়োজন করা হয়। চলে প্রায় সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত। দেশের জনপ্রিয় বিজ্ঞানবিষয়ক ম্যাগাজিন বিজ্ঞানচিন্তা এ বক্তৃতার আয়োজন করে।
আয়োজনে প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন লেখক ও বিজ্ঞানবক্তা আসিফ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) তড়িৎকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও লেখক ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী, সরকারি হরগঙ্গা কলেজের শিক্ষক সফিক ইসলাম, বিজ্ঞানচিন্তার নির্বাহী সম্পাদক আবুল বাসারসহ আরও অনেকে।
শুরুতে সূচনা বক্তব্য দেন বিজ্ঞানচিন্তার নির্বাহী সম্পাদক আবুল বাসার। তিনি বলেন, ‘তরুণ পাঠকদের বিজ্ঞানমনস্ক করতে আমরা ১০ বছর আগে বিজ্ঞানচিন্তা শুরু করেছিলাম। এই আয়োজনও সেই ধারাবাহিকতারই অংশ। আমরা চাই, তরুণরা বিজ্ঞানমনস্ক হোক, যৌক্তিকভাবে চিন্তা করুক।’
এরপর সরকারি হরগঙ্গা কলেজের শিক্ষক ও লেখক সফিক ইসলাম শুভেচ্ছা বক্তব্যে বলেন, ‘এলিমেন্টস-এর মতো এমন একটি পৃথিবী বিখ্যাত বই দীর্ঘদিন বাংলা ভাষায় অনুবাদ না হওয়াটা খুবই দূর্ভাগ্যজনক ব্যাপার ছিল। কিন্তু আশার কথা হলো, সেই দূর্ভাগ্য থেকে আসিফ ভাই আমাদের মুক্তি দিয়েছেন। সে জন্য আসিফ ভাইসহ বিজ্ঞানচিন্তাকে ধন্যবাদ জানাই এমন একটি আয়োজন করার জন্য।’
বিজ্ঞানবক্তা ও লেখক আসিফ বলেন, ‘সংগ্রাম ছাড়া পৃথিবীতে কোনো কিছু অর্জন করা সম্ভব নয়। এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সত্য। আপনারা নিশ্চয়ই কোপার্নিকাস, গ্যালেলিও, নিউটন, আইনস্টাইনের নাম শুনেছেন। এলিমেন্টস না প্রকাশিত হলে ওনারা বিজ্ঞানী হিসেবে কোনো আবিষ্কার করতে পারতেন কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। আইনস্টাইন বলেছিলেন, এলিমেন্টস না পড়ে কারো পক্ষে পদার্থবিজ্ঞান পড়া সম্ভব নয়।’
এরপর তিনি এলিমেন্টস বই সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করে। প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে আগত দর্শকদের এলিমেন্টস বইয়ের যাত্রার কথা বলেন। কীভাবে ইউক্লিড এই বইটি লিখলেন, কেন লিখলেন; এসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
ইউক্লিডের পাঁচটি স্বীকার্য ও পাঁচটি সাধারণ ধারণার ভিত্তিতে প্রথম খণ্ডে ৪৮টি উপপাদ্য নির্মিত হয়েছে বলে উল্লেখ করেন এই বিজ্ঞানবক্তা। তিনি বলেন, এই পদ্ধতি দেখায়, কীভাবে অল্প কয়েকটি মৌলিক নীতি থেকে বিস্তৃত জ্ঞানব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে। একটি উপপাদ্য আগের উপপাদ্যের ওপর নির্ভর করে গড়ে ওঠে; ফলে যৌক্তিক ধারাবাহিকতা ভেঙে গেলে পুরো কাঠামোই দুর্বল হয়ে পড়ে।
এরপর নন-ইউক্লীডিয় জ্যামিতি এবং রিলেটিভিটি নিয়ে আলোচনা করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) তড়িৎকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও লেখক ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী। তিনি শুরুতে এলিমেন্টস বইটি অনুবাদের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেন। ইতিহাসে যারা এলিমেন্টস নিয়ে কাজ করেছেন, তাঁদের নিয়েও ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করেন তিনি।
ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী বলেন, ‘এলিমেন্টস বইয়ে যা যা আছে, সব কিন্তু ইউক্লিডের লেখা নয়। তিনি আসলে একজন সংগ্রাহক। তাঁর আগে আরও অনেকে জ্যামিতির এসব সূত্র নিয়ে কাজ করেছেন। ইউক্লিড মূলত সেই সবকিছু এক সুতায় গেঁথেছেন। অনেকগুলো হয়তো তিনি নিজেই প্রমাণ করেছিলেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘গণিতবিদেরা যে সব বিমূর্ত কাজ করেন, সেগুলো সৃজনশীলতার একটা উপায় হিসেবে করেন। ওনারা যে অনেক অ্যাপ্লিকেশন ভেবে করেন তা কিন্তু নয়। অনেক পরে তা হয়তো একটা অ্যাপ্লিকেশন হয়।’
মহাবিশ্বের জ্যামিতির প্রসঙ্গ তুলে বুয়েটের এই অধ্যাপক বলেন, ‘আধুনিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী বৃহৎ পরিসরে মহাবিশ্ব প্রায় সমতল (ফ্ল্যাট) বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড বিকিরণ ও ব্যারিয়ন অ্যাকুস্টিক অসিলেশনের মতো পর্যবেক্ষণ থেকে বিজ্ঞানীরা এ বিষয়ে ধারণা পেয়েছেন। তবে এ আলোচনা তুলে ধরে তিনি দেশে মৌলিক গণিতচর্চার দুর্বলতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, গণিত, জ্যামিতি ও বীজগণিত নিয়ে গবেষণার আগ্রহ কমে যাচ্ছে; ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে থেকে নতুন রিম্যান বা বোলিয়াই তৈরি করতে হলে মৌলিক গণিতশিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।‘
এরপর শুরু হয় প্রশ্নোত্তর পর্ব। উপস্থিত দর্শকেরা নানা মজার মজার প্রশ্ন করেন। যেমন একজন দর্শক জানতে চান, এই মূহূর্তে আলোচকেরা এমন কী জিনিস নিয়ে চিন্তা করছেন, যা এখনো সমাধান হয়নি। সেগুলো সমাধান করার পথ হিসেবে সম্ভাব্য কী ভাবছেন। একজন প্রশ্ন করেন, বিন্দুর তো দৈর্ঘ্য, প্রস্থ বা আয়তন নেই; তাহলে বিন্দু বলতে আমরা আসলে কী বুঝি? দর্শকদের এমন নানা প্রশ্নের উত্তর দেন আলোচকেরা।
এরপর শুরু হয় পাঠকদের জন্য কুইজ প্রতিযোগিতা। সঠিক উত্তরদাতাদের পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হয় আকর্ষণীয় পুরস্কার।
সবশেষে অতিথি ও দর্শকদের নিয়ে একসঙ্গে ফটোসেশন হয়। তারপর পাঠক-লেখক-শ্রোতাদের হাসি আলাপের মাধ্যমে শেষ হয় এই মিলনমেলা।
এ অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বিজ্ঞানচিন্তার সহসম্পাদক কাজী আকাশ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বিজ্ঞানচিন্তার সম্পাদনা দলের সদস্য উচ্ছ্বাস তৌসিফ।