আমরা কি সিমুলেশনের জগতে বাস করি

অনেকের মতেই আমরা এক বিশাল কৃত্রিম জগতের বাসিন্দাছবি: ইওনেরেন / গেটি ইমেজ

নিজের হাতের দিকে একবার তাকান। আঙুলগুলো দিব্যি দেখতে পাচ্ছেন, তাই না? এবার আয়না ছাড়া নিজের থুতনিটা দেখার চেষ্টা করুন তো। পারবেন না। অন্যের কথা শুনে বা আয়নায় দেখে আপনি বিশ্বাস করে নিয়েছেন যে আপনার একটা থুতনি আছে। কিন্তু আপনি যা দেখছেন বা জানছেন, তা-ই কি ধ্রুব সত্য?

একজন পদার্থবিজ্ঞানী হয়তো জটিল অঙ্ক ও ভারী ভারী যন্ত্র দিয়ে বাস্তবতা বোঝার চেষ্টা করেন। কিন্তু বিজ্ঞানও সব সময় ঠিক কথা বলে না। আমাদের ইন্দ্রিয় মাঝেমধ্যেই আমাদের ধোঁকা দেয়। ইলুয়েশনের ছবি দেখলে বুঝবেন, আমাদের চোখ বা মস্তিষ্ক সব সময় সত্যটা বলে না। তাই প্রশ্ন জাগে, আমরা কি আসলে কোনো সিমুলেশন বা কৃত্রিম জগতে বাস করছি?

ইলুয়েশনের ছবি দেখলে বোঝা যায়, আমাদের চোখ বা মস্তিষ্ক সব সময় সত্যটা বলে না
ছবি: শন গ্ল্যাডওয়েল / গেটি ইমেজ

এই সন্দেহ কিন্তু নতুন নয়। হাজার বছর আগে চীনা দার্শনিক জুয়াং-জি স্বপ্ন দেখেছিলেন, তিনি একটা প্রজাপতি হয়ে ফুলে ফুলে উড়ে বেড়াচ্ছেন। ঘুম ভাঙার পর তিনি গভীর চিন্তায় পড়ে গেলেন। ভাবলেন, ‘আমি কি সেই মানুষ যে প্রজাপতি হওয়ার স্বপ্ন দেখছিল? নাকি আমি আসলে একটা প্রজাপতি, যে এখন মানুষ হওয়ার স্বপ্ন দেখছে?’

গ্রিক দার্শনিক প্লেটোও ভেবেছিলেন, আমরা যা দেখি তা হয়তো আসল জিনিসের ছায়া মাত্র। আমাদের জীবনটা হয়তো দ্য ম্যাট্রিক্স মুভির মতো বিশাল কোনো ভিডিও গেম। এই গেমের রিমোট কন্ট্রোল আছে অন্য কারও হাতে।

আরও পড়ুন
হাজার বছর আগে চীনা দার্শনিক জুয়াং-জি স্বপ্ন দেখেছিলেন, তিনি একটা প্রজাপতি হয়ে ফুলে ফুলে উড়ে বেড়াচ্ছেন। ঘুম ভাঙার পর তিনি গভীর চিন্তায় পড়ে গেলেন।

এই দার্শনিক চিন্তাকেই বিজ্ঞানের মোড়কে আধুনিক যুগে সামনে আনেন যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ডের দার্শনিক নিক বোস্ট্রম। প্রায় ২০ বছর আগে তিনি সিমুলেশন হাইপোথিসিস দেন। তাঁর যুক্তিটা বেশ চমকপ্রদ।

ভেবে দেখুন, গত কয়েক বছরে ভিডিও গেম, ভার্চ্যুয়াল রিয়েলিটি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কতটা উন্নত হয়েছে। ভবিষ্যতে মানুষ হয়তো এমন শক্তিশালী কম্পিউটার বানাবে, যা দিয়ে তারা তাদের পূর্বপুরুষদের (মানে আমাদের) হুবহু সিমুলেশন তৈরি করতে পারবে। সেই সিমুলেটেড মানুষগুলোরও অনুভূতি থাকবে, তারা ভাববে তারাই আসল।

এখন পরিসংখ্যানের একটা খেলা খেলুন। আসল পৃথিবী মাত্র একটি। কিন্তু ভবিষ্যতের মানুষ হয়তো আমাদের সময়ের ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন সিমুলেশন চালাবে। এখন আপনি যদি নিজেকে প্রশ্ন করেন, ‘আমি কে?’

ভিডিও গেমের জগত এখন কল্পনার সীমানা ছাড়িয়ে গেছে
ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স

পরিসংখ্যান বলবে, আপনার আসল মানুষ হওয়ার চেয়ে সিমুলেটেড মানুষ হওয়ার সম্ভাবনাই কোটি গুণ বেশি! ইলন মাস্ক থেকে শুরু করে নীল ডিগ্রাস টাইসনের মতো বিজ্ঞানীরাও এই যুক্তিতে বেশ নড়েচড়ে বসেছেন। টাইসন অবশ্য এখন বলেন, সম্ভাবনাটা ফিফটি-ফিফটি।

আমরা যদি সত্যিই কোনো গেমের চরিত্র হই, তবে তার কোনো প্রমাণ কি আছে? বিজ্ঞানীরা কিছু অদ্ভুত মিল খুঁজে পেয়েছেন। ভিডিও গেমে যেমন জুম করলে ফেটে যায় বা পিক্সেল দেখা যায়, আমাদের মহাবিশ্বেও তেমনি একটা নির্দিষ্ট সীমার নিচে (পরমাণুর চেয়েও ছোট) পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র আর কাজ করে না। আমরা মহাবিশ্বের একটা নির্দিষ্ট দূরত্বের বেশি দেখতে পাই না। হয়তো প্রায় ৫০০ কোটি আলোকবর্ষ পর্যন্ত আমরা দেখতে পাই। আলো এর চেয়ে বেশি পথ পাড়ি দিয়ে আমাদের কাছে পৌঁছাতে পারেনি। এটা কি ভিডিও গেমের স্ক্রিনের সীমানা?

আরও পড়ুন
ভবিষ্যতে মানুষ হয়তো এমন শক্তিশালী কম্পিউটার বানাবে, যা দিয়ে তারা তাদের পূর্বপুরুষদের হুবহু সিমুলেশন তৈরি করতে পারবে। সেই সিমুলেটেড মানুষগুলোরও অনুভূতি থাকবে।

অনেকেই মাঝেমধ্যে চাবি রেখে ভুলে যান বা চশমাটা কপালের রেখে খুঁজতে থাকেন। মাঝেমধ্যে মনে হয় এমন ঘটনা আগে ঘটেছে। একে বলে দেজা ভ্যু। এগুলো কি সফটওয়্যারের গ্লিচ বা ত্রুটি হতে পারে?

একই মুহূর্ত, একই দৃশ্য—মনে হয় আগেও একবার ঘটেছিল, একে বলে দেজা ভ্যু
ছবি: মেডিকেল নিউজ টুডে

অবশ্য এর সহজ ব্যাখ্যাও আছে। হয়তো আপনি আসলেই ভুলোমনের মানুষ, তাই চাবি খুঁজে পাচ্ছেন না। আবার এমনও হতে পারে, মানুষ কোনো দিনই এত শক্তিশালী কম্পিউটার বানাতে পারবে না যা দিয়ে পুরো পৃথিবী সিমুলেট করা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক জেব রক্লিন বলেন, ‘বোস্ট্রমের এই তত্ত্ব কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নয়, বরং একটি শক্তিশালী যৌক্তিক ধাঁধা।’

লেখক: ফ্রন্টেন্ড ডেভলপার, সফটভেঞ্চ

সূত্র: দ্য কনভারসেশন

আরও পড়ুন