উষ্ণ লেবু পানি কি স্বাস্থ্যের জন্য ভালো

লেবু পানি শরীরকে হাইড্রেট করেছবি: প্রথম আলো

গরম পানির সঙ্গে লেবু মিশিয়ে খাওয়ার উপকারিতা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় রিলসের অভাব নেই। স্ক্রল করলেই দেখা যায় ইনফ্লুয়েন্সাররা এক হাতে লেবু ও অন্য হাতে ধোঁয়া ওঠা মগ নিয়ে বলছেন, ‘মাত্র এক সপ্তাহ এই পানীয় নিয়মিত খেলে ওজন কমে যাবে!’ শরীর বিষমুক্ত হওয়া, হজম ভালো হওয়া, ত্বক মসৃণ হওয়া থেকে শুরু করে এর নাকি হাজারো গুণ। এটি নাকি শক্তি বাড়ায়, এমনকি মনোযোগও বৃদ্ধি করে। কিন্তু বিজ্ঞান কী বলে? এই দাবিগুলো কতটা সত্য?

নিউইয়র্ক টাইমস-এ প্রকাশিত এক প্রশ্নোত্তরমূলক প্রতিবেদনে পুষ্টিবিদ ও গবেষকেরা এই বিষয়ে তাঁদের মতামত দিয়েছেন। তাঁদের মতে, গরম পানিতে লেবু চিপে খাওয়া খারাপ কিছু না। তবে একে অলৌকিক পানীয় বা সব সমস্যার সমাধান ভাবার কোনো কারণ নেই। দিনের শুরুতে লেবু পানি খাওয়ার সবচেয়ে বড় উপকারিতা হলো, এটি শরীরকে হাইড্রেট করে।

লেবুর রস পাকস্থলীর অ্যাসিড নিঃসরণ একটু বাড়িয়ে দেয়
ছবি: ক্যাডিলা ফার্মাসিউটিক্যালস

রাতে দীর্ঘ সময় কিছু না খেয়ে থাকার পর সকালে তরল গ্রহণ করা শরীরের জন্য জরুরি। শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, হাড়ের সংযোগগুলো নমনীয় রাখা এবং ঘাম ও প্রস্রাবের মাধ্যমে বর্জ্য বের করে দেওয়ার কাজে পানির ভূমিকা অপরিহার্য। পর্যাপ্ত পানি খেলে ত্বক ভালো থাকে, মন ফুরফুরে থাকে এবং চিন্তাভাবনা পরিষ্কার হয়। তবে এখানে একটা বড় ‘কিন্তু’ আছে। এই হাইড্রেশন বা আর্দ্রতা কিন্তু লেবুর জন্য হয় না। সাধারণ পানি, হারবাল চা, এমনকি কফি দিয়েও একই কাজ করা যায়। লেবু যোগ করলে আলাদা কোনো জাদু ঘটে না।

আরও পড়ুন
পুষ্টিবিদ ও গবেষকদের মতে, গরম পানিতে লেবু চিপে খাওয়া খারাপ কিছু না। তবে একে অলৌকিক পানীয় বা সব সমস্যার সমাধান ভাবার কোনো কারণ নেই।

হজমের ক্ষেত্রেও বিষয়টা প্রায় একই। ঠিকঠাক হজম হওয়ার জন্য দরকার তরল। তাতে লেবু থাকুক আর না থাকুক। এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা দিনে আট কাপের বেশি পানি পান করেন, তাঁদের কোষ্ঠকাঠিন্যের ঝুঁকি অনেক কম। হজমে লেবু পানির সহায়তা নিয়ে সরাসরি বড় কোনো গবেষণা নেই। ছোট একটি গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, লেবুর রস পাকস্থলীর অ্যাসিড নিঃসরণ একটু বাড়িয়ে দেয়। ফলে খাবার ভাঙার গতি বাড়তে পারে। তবে গবেষণাটি খুব ছোট হওয়ায় একে বড় প্রমাণ ধরার সুযোগ নেই।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক মানুষের পাকস্থলীতে অ্যাসিড কমে যায়। এতে বুকজ্বালা বা অ্যাসিড রিফ্লাক্সের সমস্যা হতে পারে। তাত্ত্বিকভাবে লেবুর অ্যাসিড এতে সামান্য সহায়তা করতে পারে। কিন্তু বাস্তবে একটি লেবু থেকে পাওয়া অ্যাসিডের পরিমাণ খুবই সামান্য। তাই এতে বড় কোনো পরিবর্তন হওয়ার প্রমাণ নেই।

লেবুতে প্রচুর ভিটামিন সি থাকে
ফাইল ছবি

রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার কথা ভাবলে উষ্ণ লেবু পানি পান করা কিছুটা যৌক্তিক। লেবুতে প্রচুর ভিটামিন সি থাকে। বড় একটি লেবুর অর্ধেক রস খেলে প্রতিদিনের দরকারি ভিটামিনের প্রায় এক-চতুর্থাংশ ভিটামিন সি পাওয়া যায়। ভিটামিন সি শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে ও ক্ষত সারাতে কাজে লাগে। কারণ এটি একটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। তবে এখানেও কথা আছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, বেশি ভিটামিন সি খেলেই যে সর্দি কম হবে বা দ্রুত সেরে যাবে, এমন নয়। বহু গবেষণার পর্যালোচনায় বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, উচ্চমাত্রার ভিটামিন সি সাপ্লিমেন্টও সাধারণ মানুষের সর্দি-কাশির তীব্রতা বা আক্রান্ত হওয়ার সময় খুব একটা কমাতে পারে না। তাছাড়া ভিটামিন সির ঘাটতি উন্নত দেশগুলোতে তুলনামূলকভাবে বিরল, তবু সেসব দেশের মানুষের সর্দি-কাশি হয়।

আরও পড়ুন
লেবুতে প্রচুর ভিটামিন সি থাকে। বড় একটি লেবুর অর্ধেক রস খেলে প্রতিদিনের দরকারি ভিটামিনের প্রায় এক-চতুর্থাংশ ভিটামিন সি পাওয়া যায়।

তবে ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে তাপমাত্রা গেলে ভিটামিন সি দ্রুত নষ্ট হতে শুরু করে। ফুটন্ত পানিতে লেবুর রস দিলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে এর বেশিরভাগ ভিটামিন সি নষ্ট হয়ে যায়।

ওজন কমানোর জাদুকরী টোটকা হিসেবে এর প্রচার থাকলেও প্রমাণ খুব কম। কেউ যদি চিনিসহ কফি বা সফট ড্রিঙ্কের বদলে গরম লেবু পানি খায়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই কম ক্যালোরি গ্রহণ করা হবে, যা ওজন কমাতে সাহায্য করে। কিন্তু লেবু পানি নিজে থেকেই মেটাবলিজম বাড়িয়ে চর্বি গলায়, এমন কোনো শক্ত প্রমাণ নেই।

সাইট্রাস বা টক জাতীয় ফল
ছবি: দ্য ইকোনমিক টাইমস

কিছু গবেষণায় বলা হয়, সাইট্রাস বা টক ফল রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে পারে। কিন্তু এই প্রমাণগুলো এখনো বেশ দুর্বল।

আসল কথা হলো, গরম লেবু পানি অবশ্যই একটি ভালো পানীয়। এতে ক্যালোরি কম থাকে এবং চিনি মেশানো পানীয়ের তুলনায় এটি নিঃসন্দেহে ভালো বিকল্প। সকালে গরম পানির সঙ্গে লেবুর টক স্বাদ অনেকের কাছে সতেজ লাগতে পারে। দিন শুরুর জন্য এটা ভালো হতে পারে। কিন্তু এটিকে ডিটক্স, ওজন কমানোর গোপন চাবিকাঠি ভাবলে ভুল হবে। গরম লেবু পানিতে কোনো ক্ষতি নেই, তবে এতে অলৌকিকও কিছু নেই।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, কিশোর আলো

সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস

আরও পড়ুন